চট্টগ্রাম, , সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮

উভয় পক্ষে উৎকণ্ঠা

প্রকাশ: ২০১৮-০১-৩০ ০০:১৮:৪৫ || আপডেট: ২০১৮-০১-৩০ ১৪:৫৭:১৮

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ের তারিখ ঘোষণার পর বিএনপির পাশাপাশি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মধ্যেও উৎকন্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। এমন কি এই উত্তাপ সারাদেশে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। রাজনীতিতে কি ঘটতে যাচ্ছে এই প্রশ্ন ভেসে বেড়াচ্ছে শহরের অফিস টেবিল থেকে গ্রামের চা-স্টলেও। আর চায়ের আড্ডায় সাধারণ মানুষের আলোচনা রীতিমত টিভির টকশোর আইনজীবী-বিশ্লেষক-বিশেষজ্ঞদেরও হার মানিয়ে দিচ্ছে।

প্রসঙ্গত, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় রায় আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করা হবে বলে বকশিবাজারে ঢাকা আলিয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. আখতারুজ্জামান গত বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণার দিন ধার্য্য করেন।

এই মামলার এজাহার থেকে জানা গেছে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় একটি মামলা করে দুদক। মামলায় অন্য আসামি মাগুরার সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাজা হবে, না বেকসুর খালাস পাবেন, তা নিয়ে সারা দেশের বিএনপি-আওয়ামী লীগ উভয় দলের নেতা-কর্মীদের জিজ্ঞাসার শেষ নেই। সাধারণ জনগণসহ সকল মহলের আলোচনা-সমালোচনা ও দৃষ্টি এখন এই রায় ঘিরে আবর্তিত হয়ে পড়েছে।

এদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল বলেছেন, তারা যেসব তথ্য-প্রমাণ ও যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন তাতে খালেদা জিয়ার সাজা হবে।

অন্যদিকে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলছেন, এ মামলায় তিনি সম্পূর্ণভাবে খালাস পাবেন। কেননা, দুদক যেসব যুক্তি ও তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করেছে সেসবের কোনো ভিত্তি নেই। এমনকি এই মামলায় উপস্থাপন করা হয়েছে তা ‘ঘষা-মাজা কাগজ-পত্র’ বলে অভিযোগ করে আসছেন।

একই বিষয়ে খালেদা জিয়ার আরেক আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, নিরপেক্ষভাবে বিচার করা হলে খালেদা জিয়া সম্পূর্ণভাবে খালাস পাবেন। তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে কিংবা নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কয়েক দিন ধরেই এ নিয়ে আলোচনার ঝড় বইছে। রায়ে নেতিবাচক কিছু হলে হরতালসহ কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিএনপি নেতারা। তবে মানসিকভাবে অনেক শক্ত অবস্থানে রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। জেলকে তিনি ভয় পান না বলে ঘনিষ্ঠজনদের এরই মধ্যে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।

বিএনপি নেতারা জোর গলায় বলছেন, সরকার প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে এ মামলা রায় তড়িত করেছে। তারা এও বলছেন, সরকারের হস্তক্ষেপ না হলে এমামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

এপ্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচন ও রাজনীতি থেকে সরানোর চক্রান্ত চলছে। কার্যত, সরকার জিয়া পরিবারকে রাজনীতির বাইরে রাখতে চায়। তাই মিথ্যা অভিযোগের মামলায় তড়িঘড়ি করে রায় দেওয়া হচ্ছে।

মির্জা ফখরুল আরো বলেন, ‘রায় কী হবে তা সরকার আগেই ঠিক করে রেখেছে। দেশে যে আইনের শাসন নেই, ন্যায়বিচার সুদূরপরাহত সেটাই প্রমাণিত হচ্ছে। বিচার হবে— প্রধানমন্ত্রী যা চাইবেন তাই। এখন পর্যন্ত তারা (এরশাদ-রাঙ্গা-ইনু) যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা আদালত অবমাননার শামিল, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।’

অন্যদিকে ‘বিএনপি চেয়ারপরসন বেগম খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের পর সন্ত্রাসী কার্যক্রম করলে, তা জনগণ প্রতিরোধ করবে’ এই বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরো বলেন, যদি এই রায় নিয়ে দেশে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়, দেশে সন্ত্রাসের কার্যকলাপ করা হয় তাহলে জনগণকে সাথে নিয়ে আমরা তা প্রতিরোধ গড়ে তুলব। বেগম খালেদা জিয়ার মামলার রায় নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে বিএনপি।

এরমধ্যে ১৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় কক্সবাজারের চকরিয়ায় জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে মতবিনিময় সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেছিলেন, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে যেতে হবে।

এছাড়া ২১ জানুয়ারি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মামলার রায় আগামী দুই তিন মাসের মধ্যে হবে। রায়ে তিনি সাজাও পেতে পারেন আবার বেকসুর খালাসও পেতে পারেন। তবে আমার ধারণা তার সাজা হবে। খালেদা জিয়ার সাজা হলে একদিনের জন্য হলেও তাকে জেলে যেতে হবে।

অন্যদিকে ২৫ জানুয়ারি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাজা হলে দেশে আগুন জ্বলবে। তিনি আরো বলেন, কারাগারে পাঠানো এত সহজ হবে না। তাকে কারাগারে পাঠাতে হলে তাদের লাশের ওপর পাঠাতে হবে।

এছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, দলের চেয়ারপারসনের মামলায় ‘নেতিবাচক’ কোনো রায় হলে তার পরিণতি ‘ভয়াবহ’ হবে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ বলেছেন, খালেদা জিয়ার মামলার রায় নিয়ে দেশে আবার জ্বালাও-পোড়াও হলে বিএনপিই তাতে পুড়ে ‘ছারখার হয়ে যাবে’। তিনি আরো বলেন, ‘একটি চক্র’ দেশকে অস্থিতিশীল করার ‘ষড়যন্ত্র’ করছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও বলেছেন, রায় ঘিরে কেউ ‘বিশৃঙ্খলা বা ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের’ চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নেবে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও মাঠের বিরোধী দল বিএনপি নেতাদের পাল্টাপাল্টি এই বক্তব্যের মধ্যেই শনিবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের নিয়ে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এই জরুরি বৈঠক ডেকেছিলেন। রায়ের পর কি কি ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে সে সব বিষয় বৈঠকে চূড়ান্ত হয়।

এছাড়া রবিবার রাতে ২০ দলীয় জোটের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সভায় বেগম জিয়ার মামলার বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর এই মর্মে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে- বেগম জিয়ার কিছু হলে সরকার পতনের একদফা আন্দোলনে যাবে জোট। এ বিষয়ে সবাই একমত হয়ে সম্মতি দিয়েছেন।

আবার ৩ ফ্রেরুয়ারি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা ডেকেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। একের পর এক বৈঠক হচ্ছে সেই ৮ ফ্রেরুয়ারির জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ের তারিখ ঘোষণার পর থেকে। রায়ে সাজা হলে করণীয় কি হবে, মূলত সেই কর্মপন্থা নির্ধারণ ঘিরে।

এদিকে দুই পক্ষের হুঁশিয়ারি-পাল্টা হুঁশিয়ারির মধ্যে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি এই রায় ঘিরে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা করা যাবে না। জনগণের ক্ষতি হলে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এছাড়া দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আইনজীবীরাও নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এ ধরনের মামলার ‘রায়কে’ অত্যন্ত স্পর্শকাতর মনে করছেন। তাদের আশঙ্কা, এ মামলায় যে রায়ই হোক না কেন, সেটা রাজনীতির মাঠে সংঘাত উস্কে দিবে। কারণ বিএনপি আগেই ঘোষণা দিয়েছে ‘নো খালেদা জিয়া, নো ইলেকশন’।

২০ দলের শরিক জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) ইতোমধ্যে দলীয় এক সভায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, জোটনেত্রী খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে কারাগারে নেয়া হলে তারা দলে দলে স্বেচ্ছায় কারাবরণ করবেন।

খালেদা জিয়ার এ মামলার রায় কী হতে পারে, তা নিয়ে এখন বিএনপির অভ্যন্তরে বিভিন্ন জল্পনা কল্পনা চলছে। তেমনি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা প্রকাশ্যে কর্মীদের প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দিয়ে বক্তব্য রাখছেন।

রাজনীতির বাহিরে বুদ্ধিজীবী থেকে নিরক্ষর, শহর থেকে গ্রাম সবখানে সকল শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষের মধ্যেও নানারকম আলোচনা চলছে। তবে সবাই প্রায় একমত যে, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে সাজা হলে সংঘাতের দিকে ধাবিত হবে দেশের পরিস্থিতি। উভয় দলের নেতাদের হুঁশিয়ারি-পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বক্তব্য দেওয়ায়, সেই সংঘাতের ধারণাকে আরো শক্ত ভিত্তির পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।

তবে সচেতন মানুষ উভয় দলের নেতাদের বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যকে, উভয় পক্ষের তীব্র উৎকন্ঠার বহিঃপ্রকাশ হিসাবেই দেখছে। এই উৎকন্ঠার মাঝে ভেসে বেড়াচ্ছে সহিংস হানাহানির স্মৃতি। আপাতত মনে হচ্ছে কেউ কাউকে ছাড় দিবে না। এই উৎকন্ঠা থেকে ঘটে যেতে পারে কোন অকল্পনীয় ও অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা। ফলে ৮ ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে দেশবাসী চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন।