চট্টগ্রাম, , বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

“বড়দিন”-যীশু খ্রীষ্টের জন্মদিন, মুক্তিদাতার আগমন!

প্রকাশ: ২০১৭-১২-২৫ ০৯:২৯:৪৮ || আপডেট: ২০১৭-১২-২৫ ০৯:২৯:৪৮

নোয়েল গোনছালবেছ

ডিসেম্বর মাস আসলেই খ্রীষ্টবিশ্বাসীদের সকলক্ষেত্রে উৎসব উৎসব আমেজ শুরু হয়। ইংরেজী পঞ্জিকা অনুসারে ডিসেম্বর মাসের ২৫ তারিখ খ্রীষ্ট বিশ্বাসীরা বড়দিন বা যীশু খ্রীষ্টের জন্মদিন হিসেবে বিশ্বব্যাপি পালন করে থাকে। যুগের পরিবর্তনে, সভ্যতার উন্নয়নে, সম্প্রীতির বিকাশে শুধুমাত্র খ্রীষ্টবিশ্বাসীরা কেন দেশের, রাষ্ট্রের ও সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের মনে দোলা দেয় এই আনন্দঘন বড়দিন।

বিজয়ের আনন্দের পাশাপাশি এ মাসে বড়দিনও যেন নবজয়রূপে নতুনভাবে খ্রীষ্টের জন্মদিনের আনন্দ নিয়ে হাজির হয় বাঙ্গালীর ঘরে ঘরে। প্রকৃত রহস্যউদঘাটন করলে দেখা যায়, এই দিনই শিশুযীশু পৃথিবীতে সরাসরি এলেন মা মারিয়ার মাধ্যমে যেখানে যোশেফ তার পিতার দায়িত্ব পালন করে সচিত্তে। পবিত্রআত্মার শক্তি, দান ও অনুপ্রেরণায় মারিয়ার গর্ভজাত যীশু প্রায় ২০০০ বছর আগে ইস্রায়েলের বেথেলহেমে এক জীর্ণ গোসালায় রাত্রি দ্বিপ্রহরে জন্ম নেয়। বার্তাবহ তারাটিও তখন আকাশে উদিত হয় ও পথ পন্ডিতদের পথ দেখায়। তাই খ্রীষ্টের জম্মদিনে আগাম বার্তা হিসেবে বর্নিল তারায় খচিত হয়, যার আবেশ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে।

খ্রীষ্টযীশু মানুষেষ মতো শরীর নিয়েই জন্মলাভ করে। এমনকি তার জীবদ্দশায় অতি দীনবেশে ধনী-দরিদ্র সকল মানুষের সাথে একাত্ম হয়েছেন। তিনি জন্মনিয়েছেন, ক্রশমৃত্যু বরণ করেছেন ও মৃত্যুর ৩য় দিন পর স্বশরীরে পুনুরুথান করেছেন যার প্রতিটি ভাবার্থ “মানব মুক্তির জন্য”। ন্যায্যতা, প্রেম, দয়া, ক্ষমা, সেবা ও ভালোবাসার তরে তিনি কাজ করেছেন নিরলসভাবে। যার আর্দশে ন্যায় ও শান্তির সমাজ তৈরী হয়েছে। মানুষ মানুষের জন্য কল্যাণকর চিন্তা, মনন ও নব সৃষ্টির আহবান করে। মানুষকে পাপ হতে উদ্বার করতে গিয়েই নিজ প্রাণ ক্রুশে বির্সজন দিয়েছেন। এ যেন এক বিশাল মহানুভবতা যার নিগুঢ়তত্ব চিন্তা করা দুষ্কর ও আশাতীত!

খ্রীষ্ট আগমনের প্রস্তুতি হিসেবে প্রতিটি খ্রীষ্টভক্ত বড়দিন আসার প্রায় ৪ সপ্তাহ পূর্ব হতেই নিজেকে প্রস্তুত করে। ধ্যানে, মনে, অর্চনা ও সংগীতের মাধ্যমে আগমনী সংবাদ প্রচার ও প্রস্তুতি কার্যক্রম চালায়। মহানসৃষ্টিকর্তার কাছে পাপস্বীকার আরাধ্য করে নিজের মনপ্রাণকে নতুনত্ব দেয়ার আপ্রান চেষ্ঠা থাকে সকলের। ছোট্ট শিশু যীশুকে হৃদয় মন্দিরে স্থান করে দিয়ে কতই না প্রস্তুুতি। আধ্যাত্মিক প্রস্তুুতির অংশ হিসেবে প্রতিটি মিশায় অংশগ্রহণ, গুনর্কীতণ, পাপস্বীকার, ক্ষমা প্রার্থনাও উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে আধুনিকাতার ছোয়াঁয় খ্রীষ্টান পরিবার গুলোতে বিভিন্ন সাজ সজ্জাও দৃষ্টি কাড়ে। আসন্ন বড়দিনের শুভেচ্ছা কার্ড বিতরণের মাধ্যমেই শুরু করে খ্রীষ্টবিশ্বাসী ভক্ত জনগন যীশুর আগমনী প্রচার। সাধারণত ২০-২৪ ডিসেম্বর তারিখের রাত পর্যন্তই পিঠা ও মুখরোচক বিভিন্ন খাবারের ধুম চলে। গ্রামে গ্রামে বড়দিন উপলক্ষে পুরো মাস জুড়ে প্রস্তুতি নিয়েই বিভিন্ন প্রকার পিঠা তৈরীর কাজ চলে। তার মধ্যে বিভিক্ষা বা বিয়ে পিঠা, পুলি, বিন্নি ভাতসহ পিঠা, বিন্নি পুলি, পাটিসাপটা, চিতই, পাকন, ডনেশ, দোদল, পাপঢ়, দুধ চিতল, ঝাই, খোলা ঝাই, চুটকি প্রভৃতি পিঠা উল্লেখ যোগ্য। রাষ্ট্রিয় পর্যায় হতে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠাানে ও বাড়ীতে বাড়ীতে ভিন্ন রকমের কেক দিয়ে আপ্যায়ন চলে।

এমনিকি বড়দিন উদযাপন পর্ব শেষ হলে, ডিসেম্বর ২৫ তারিখের পর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্তই বড়দিন পুনমিলনী অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান/প্রতিযোগীতার আয়োজন করে বিভিন্ন সংগঠন। প্রবীন, নবীন ও শিশু সকলেই এই আনন্দে আত্মহারা হয়ে বড়দিনের আনন্দ অনুষ্ঠান স্বার্থক করে তুলে।

বড়দিনের প্রাধন ধর্মীয় আর্কষণ বড়দিনের মহা-খ্রীষ্টজাগ। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ২৪ ডিসেম্বর রাত ১২টায় এবং ২৫ ডিসেম্বর এর সকালে বিভিন্ন গীর্জায় এই মহা-খ্রীষ্টজাগ অর্পন করা হয়। প্রতিটি খ্রীষ্টভক্ত নিজ পরিবারসহ খ্রীষ্টজাগে ও প্রভুর ভোজে অংশ নেন। প্রভুরভোজ ছাড়াও এখানে বিশেষ আকর্ষণ থাকে খড়কুটা দিয়ে সাজোনো ছোট্ট গোশালা ঘরের নব যীশুকে প্রনাম ও দান, ধুপ-আরতি, বিভিন্ন আকারের প্রদীপ ও হরেক রং এর মোমবাতি আলোক সজ্জা, ক্রিষ্টমাসট্রি, প্রবেশমুখে সাজানো গেইট ও বিভিন্ন রঙ্গের তারা। ছোট, বড়, ধনী, গরীব বিভিন্ন শ্রেণী পেশার লোকদের সাথে ভাব বিনিময়ের মাধ্যমে আনন্দঘন হয়ে উঠে এই বড়দিন। আনন্দঘন পরিবেশেও আমাদের সকলের পরিবারের, সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের কথা স্মরণ রাখা প্রয়োজন। প্রয়োজন এদের উন্নয়নে এগিয়ে আসা ।

সভ্যতার এই ক্রমউন্নয়নের সন্ধিক্ষণে নবীনদের আয়াসে প্রবীনদের অবস্থা আজো শোচনীয়। প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় আধুনিক সাজ-সজ্জা প্রবীনদের অনেকেই পছন্দ করে না। আবার তাদের মধ্যে কেউ কেউ এটা বাড়তি খরচ বলেও আখ্যয়িত করেন। এর জন্য বড়দিনে পরিবারের প্রবীন মানুষটিকে না দেখা দিয়ে, নতুন জামা না দিয়ে, মূখরোচক খাবারের অংশ না দিয়ে, গীর্জায় না নিয়ে, বিছানা পরিস্কার না করে, অন্যরা নোংরা অবস্থা দেখবে ভেবে তার রুমের লাইট অফ করে হীন মানসিকাতার পরিচয় না দেয়া, ছেলে-মেয়ে অসুস্থ্য হয়ে যাবে বলে বাবা/মাকে ঘরে না নেয়া। মনে রাখতে হবে, প্রবীণগণ আমাদেরই কারো না কারো পিতা-মাতা তাদের প্রতি আমাদের ঋণ অপ্রতিশোধ্য। এরা সমান্য সহায়তা ও সমবেদনা পেলেই প্রফুল্ল বোধ করেন। এছাড়া সভ্যদার এই বিবর্তন তাদের দ্বারাই সম্ভব হয়েছে, নবীনরা এর সুফল পাচ্ছে। বর্নীত অবস্থায় যেন আমাদের প্রবীণদের বেলায় না হয়। এইদিনে তা শপথ করা।

আস্তাকুড়ের টোকাই আখ্যা পাওয়া সেই মানব সন্তানদের অবস্থা উন্নয়নে এই দিনে ভাবা প্রয়োজন, অতিরিক্ত আয়োজনে খাবার-দাবার নষ্ট করা বাদ দিয়ে এদের ক্ষুধা যন্ত্রনা দূর করার জন্য, বিভিন্ন যানবাহনে, কলকারখানায় কর্মরত শিশুসহ এতিমখানা বা অবহেলিতদের লালন করা হোষ্টেল গুলোতে বড়দিনের পিঠাপুলি পরিবেশন করা সাথে সাথে তাদের জন্য ছোট ছোট উন্নয়ন প্রকল্প চিন্তা করে সহায়তা দেয়া। ঘরের সহযোগী তথা কাজের বুয়াকে উচ্ছিষ্ট খাবার দিয়ে নয়, নতুন তৈরীকৃত নাসতা আইটমে সেয়ার করা। প্রতিবন্ধি ভাইবোনদের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শণ, সঙ্গ দেয়া, হিজরা শ্রেনী, অস্পর্শ নামে আখ্যায়িতদের ভাই-বোনদের/মানুষদের মানব-মর্যাদা দেয়া, তাদের অবস্থানের কথা চিন্তা ও তাদের সাথেও আনন্দ ভাগাভাগীর মাধ্যমে, আদিবাসী অবহেলিত শিশুদের এমনকি মাইগ্রেন্টকৃত জনগোষ্ঠির সাথেও বড়দিনের আনন্দ ভাগ করার মনমানসিকতা একজন মানুষ হিসেবে প্রয়োজন।

সত্যিইতো, একদিনে চিন্তা একসময় সুদুরপ্রসারী চিন্তার খোরাক তৈরী করে দিতে পারে। সৃষ্টিকর্তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্ট মানুষেরই মন আছে। মানুষই পারে মানুষের পাশে দাঁড়াতে। শত অবহেলা, নির্যাতন, অপবাদ, ঘৃণা সহ্য করেও পরকে আপন করে নিতে পারে মানুষ, আপনতো সাথে থাকে। তবে ইদানিং আপন পর কারো খবর কেহ নিতে চায় না। স্বার্থচিন্তা, অপ্রচলিত প্রতিদন্ধিতা, হিংসা, ধ্বংস, বিদ্বেষ, জাতিভেদ ও হানাহানি বন্দ করে যীশু খ্রীষ্টের মহান আর্দশ তথা বিশ্বাস, আশা, প্রেম, ভালোবাসা, ক্ষমা ও ত্যাগের মাধ্যমে পৃথিবীতে শান্তি ও সম্প্রীতি স্থাপন করার অভিপ্রায় প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন। নইলে ক্রমাগতভাবে পরিবার, সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্র ধ্বংসযজ্ঞে লিপ্ত হয়ে উঠবে।

আমাদের সোনার বাংলা সম্প্রীতিতে ও সংস্কৃতিকে শান্তিপূর্ণ সহবাস্থানে রয়েছে। যা বড়ই আনন্দের! বড়দিনের আনন্দ ও শান্তিবার্তা পূন্য করুক স্বপ্নদ্রষ্টার এই সোনার বাংলাকে যেখানে শান্তিতে যেন সকলে মিলনসমাজে বাস করতে পারি ও মুক্তিদাতা যীশুখ্রীষ্ট সত্যিই বাস করতে পারেন প্রতিটি খ্রীষ্টভক্তের হৃদয়-অন্তর-আত্মায়।

শুভেচ্ছা সকলকে “শুভ বড়দিন, যীশু খ্রীষ্টের জন্মদিন।

লেখকঃ প্রকল্প ব্যবস্থাপক, আলোঘর প্রকল্প, কারিতাস বাংলাদেশ।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সিটিজি টাইমস -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই সময়ের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখার জন্য সিটিজি টাইমস কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।