চট্টগ্রাম, , বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

তিনিই চট্টগ্রাম!

প্রকাশ: ২০১৭-১২-১৫ ২১:৫০:০২ || আপডেট: ২০১৭-১২-১৫ ২১:৫৩:১৭

ফজলুর রহমান

দলাদলির ছড়াছড়ি আমাদের সময়ও ছিল। গ্রুপের লড়াইও ছিল তুঙ্গে। শাটলট্রেনের একেকটি বগি একেকটি উপদলের রং ধারণ করতো। এই সময়কার মতো তখনও ছির দখলকৃত এলাকা। লাইন অব ফায়ার। কারগীল সীমান্ত! পোস্টার আর দেয়া লিখনের সীমা। এসব লংঘন করলে পোস্টার ছেড়া-ছেড়ি থেকে খুনোখুনিও ঘটত। সেই ৯৭-৯৮ থেকে ২০০২-০৩ অবধি দেখা দৃশ্যগুলো এখনো যেন তেমন। অথবা একই ঢঙ্গে আরেকটু যেন বেশি কখনো কখনো। তবে একটি জায়গায় এসে আমরা স্থিরে ছিলাম। যখন শাটল ট্রেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেশন ছুঁতে আসতো ঠিক তখনই তা চোখে পড়তো। ফতেপুর গ্রাম ছিঁড়ে আসা শাটল ট্রেন থেকে বাম পাশে চোখ রাখলেই দেখতাম বিশাল আকারের দুটি ছবি।

দুটি ছবিই ছিল পাশাপাশি। প্রথমটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। দ্বিতীয়টি এ.বি.এম. মহিউদ্দিন চৌধুরীর। দুটি ছবিতেই স্পষ্ট আকারের কিছু লেখাও অনেক দূর থেকে চোখে পড়তো। প্রথমটিতে লেখা ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’। আর দ্বিতীয়টিতে লেখা ‘মহিউদ্দিন চৌধুরীর চট্টগ্রাম’। এই লেখা সম্বলিত ছবি টিকেছে বছরের পর বছর। কারণ নিজের অজান্তেই অনেকে মেনে নিতেন। এই বিভক্তিরকালেও এমন মেনে নেয়া সহজ ছিল না। র্কীতি থাকলে কর্তৃত্ব আপনাতেই ভাস্বর হয় এ আরেক প্রমাণ।

প্রথমটি অবিসংবাদিত। তবে দ্বিতীয়টি! ‘মহিউদ্দিন চৌধুরীর চট্টগ্রাম’!! হ্যা, মাঝে মাঝে তিনি এমনই ‘যেন তিনিই চট্টগ্রাম হয়ে উঠতেন। এখানে দেশদ্রোহ কিংবা বিচ্ছিন্নতার সুর কেউ পেতেন না। কেউ কথার বিপরীতে কথা দাঁড় করানোর চেষ্টাও করতেন না। কারণ তিনিই তো ছিলেন এই অতি গুরুত্বপূর্ণ দরিয়াপাড়ের পাহারাদার। এই নিরন্তর পাহারায় তিনি কখনো দলকানা ছিলেন না। ‘আমি চট্টগ্রামের, চট্টগ্রামের আমি’-এই ছিল তাঁর মূল মন্ত্র। সৃষ্টিকর্তার কি ইচ্ছা-সেই চট্টগ্রামের কোলে এনেই তাঁকে দিয়ে দিলেন চিরঘুম। তাঁর ইন্তেকাল বিদেশের মাটিতে হতে পারতো, ঢাকায় স্কয়ার হাসতালেও মরণ এসে ডেকে নিয়ে যেতে পারতো। কিন্তু চট্টগ্রাম ছাড়তে হবে বলে যিনি মন্ত্রী হতে চাননি-সেই তাঁকে পরম করুণাময় হয়তো চট্টগ্রামের চেনা পরিবেশ দেখিয়েই নিয়ে গেলেন।

দিনের বেশিরভাগটা দিতেন চট্টগ্রামকে। যেখানে চট্টগ্রামের স্বার্থ ক্ষুন্ন হচ্ছে গর্জাতেন। এমন চট্টল দরদী আর কি কখনো পেয়েছে এই বন্দরনগরী?

একটা ঘটনা বলি। বছর সাতেক আগের ঘটনা। চুয়েটে তখন তীব্র বাস সংকট। শহর থেকে যাতায়াতে অনেক কষ্ট। এমন দিনে যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর অফিসিয়াল একটি চিঠি লেখা হলো। পরে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। এ.বি.এম. মহিউদ্দিন চৌধুরীরও সাহায্য নিলে ভালো হয়। তিনিও যেন তাঁর তরফ থেকে চেষ্টা করেন। জনাব মহিউদ্দিন চৌধুরীও রাজি হলেন। তিনি এবার চুয়েটের চিঠি দেখতে চাইলেন। সেই চিঠির সফট কপি দিতে বললেন। আমরাও দাপ্তরিক ভাষায় লেখা চিঠিটি দিলাম সফট কপিতে। তিনি সেখানে এবার আমূল পরিবর্তন ঘটালেন। চুয়েট চট্টগ্রামের গর্ব, চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠান বলে এটাকে এভাবে অবহেলা করা অন্যায়-এমন কিছু কথা লিখে তিনি পুনরায় একটি চিঠি লিখলেন। যা তখনকার প্রেক্ষাপটে ফলপ্রসূও হয়। এভাবেই খোনে তিনি চট্টগ্রাম দেখতেন সেখানেই তিনি নিজেকে রাখতেন। চট্টগ্রামের স্বার্থ নিয়ে এমন নিরবিচ্ছিন্ন উচ্চকন্ঠ আর মিলিবে কি?

প্রকৃতি শূণ্যস্থান পছন্দ করে না। তাই রাজনীতিতেও শূণ্যস্থান থাকে না। কেবল থেকে যায় একজন ‘মহিউদ্দিন শূণ্যতা’। যে শূণ্যতা যতদিন আমরা অনুভব করিনি ততদিন বলে গেছি ‘মহিউদ্দিন চৌধুরী আছেন না!’। এই শূণ্যতার দিনে প্রিয় মহিউদ্দিন আপনাকে জানাই বিদায়। আপনার নিরন্তর অবদানের প্রতি অনেক সম্মান। আপনার ভালোবাসার প্রতি হাজারো সালাম। চট্টগ্রামের বুকে শুয়ে থাকুন। চশমা হিলের মাটি আপনাকে মিশিয়ে দিলেও অনন্তকাল ধারণ করবে চট্টগ্রাম। তবে নতুন এক মহিউদ্দিনময় ব্যক্তিত্ব না পাওয়া অবধি চলতে থাকবে আমাদের আফসোস। হয়তোবা বছরের পর বছর!

লেখক:  সহকারী রেজিস্ট্রার (সমন্বয়), ভাইস চ্যান্সেলর অফিস, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সিটিজি টাইমস -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই সময়ের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখার জন্য সিটিজি টাইমস কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।