চট্টগ্রাম, , রোববার, ১৯ আগস্ট ২০১৮

পার্বত্য চুক্তির বর্ষপূর্তিকে ঘিরে আবারো রক্তাক্ত পাহাড়

প্রকাশ: ২০১৭-১২-০৬ ২৩:৪৩:১৮ || আপডেট: ২০১৭-১২-০৭ ০৯:২৫:৪৮

একদিনে ২ খুনসহ একজনকে রক্তাক্তের প্রতিবাদে আ:লীগের ডাকে বৃহস্পতিবার রাঙামাটিতে হরতাল

আলমগীর মানিক
রাঙামাটি থেকে

নাশকতামূলক কর্মকান্ড ঘটিয়ে শান্ত পাহাড় উত্তপ্ত করে তোলার চেষ্টা করছে পাহাড়ের অস্ত্রধারীরা এমন মন্তব্য করেছেন আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির বর্ষপূর্তি যেতে না যেতেই মঙ্গলবার রাঙামাটি জেলার তিন উপজেলায় তিনটি পৃথক নাশকতামুলক ঘটনা পাহাড়কে সেদিকেই নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন দায়িত্বশীল সূত্রগুলোও। গত তিনদিন রাজধানীতে বেশ কিছু টিভি টকশো’র মাধ্যমে একটি চক্র “পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়ন ঘিরে হতাশ পাহাড়িরা আবারও চরম পন্থা অবলম্বনের চিন্তা-ভাবনা করছে’ বলে প্রচার করার দু’দিনের মাথায় একই দিনে তিনটি ঘটনা ওই টকশো’র বক্তব্যের যোগসূত্র কিনা তা যাচাই করে দেখছে গোয়েন্দা সূত্রগুলো। মঙ্গলবার আঞ্চলিক দলের অস্ত্রধারীরা দুই উপজেলায় দু’জন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার উপর হামলা চালায়। এতে একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত ও অপরজন গুরুতর আহত হয় বলে জানিয়েছেন রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মূছা মাতব্বর। স্থানীয় সূত্রের দেওয়া তথ্য ও তার বক্তব্য থেকে জানা যায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন জুড়াছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দু চাকমা। অন্যদিকে একইদিনে বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রাসেল মারমার উপর অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়ে তাকে ব্যাপক মারধর করে। গুরুতর আহতাবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ‘অরবিন্দু চাকমাকে জেএসএস সন্ত্রাসীরাই গুলি করে হত্যা করেছে’ বলে অভিযোগ করেছেন জেলা আওয়ামী লীগ।

এদিকে, রাঙামাটি জেলার জুড়াছড়ি উপজেলা আওয়ামীলগের সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দু চাকমার হত্যাকারীসহ বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি রাসেল মারমার উপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তারসহ হত্যাকান্ডের সুষ্ঠূ বিচারের দাবীতে বৃহস্পতিবার রাঙামাটি জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহবান করেছে রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগ। বুধবার বিকালে রাঙামাটিতে শহরে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে এ হরতালের ঘোষণা দেন রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী মো: মূছা মাতব্বর। আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি দীপংকর তালুকদারসহ দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনসমূহের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী এসময় উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে মঙ্গলবার সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত অরবিন্দু চাকমার মৃতদেহের ময়না তদন্ত বুধবার দুপুরে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের মর্গে সম্পন্ন করা হয়। এরআগে সকালে দীপংকর তালুকদার জুড়াছড়ি উপজেলা সফর করেন। মঙ্গলবার রাতে অরবিন্দুকে হত্যার প্রতিবাদে তাৎক্ষনিকভাবেই উপজেলা চত্তরে বিক্ষোভ মিছিল করে উপজেলা বুধবার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করে ক্ষমতাসীনদলের নেতাকর্মীরা। সর্বাত্মকভাবে পালিত হয়েছে এই হরতাল কর্মসূচী।

এদিকে একইদিন মঙ্গলবার সকালে জেলার নানিয়ারচর উপজেলায় বিবাদমান অস্ত্রধারী দুই গ্রুপের মধ্যে গুপ্ত হামলায় প্রতিপক্ষের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন সাবেক জনপ্রতিনিধি অনাদি রঞ্জন চাকমা (৪৫)। মঙ্গলবার সকালে উপজেলার ১৮মাইল এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি নিহত হন। নানিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, পার্বত্য চুক্তি বিরোধী সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ইউপিডিএফ এর মধ্যে মতবিরোধের জের ধরে নবসৃষ্ট গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ সমর্থক অনাধি রঞ্জন চাকমা অন্তঃকোন্দলে এই হামলার শিকার হন। তিনি ওই ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি মেম্বার।

এদিকে হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা একটি সংগঠন নিজেদের ‘মুখোশ বাহিনী প্রতিরোধ কমিটি’ পরিচয় দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবরোধের ডাক দিয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানান সংগঠনটির সদস্য সচিব সেন্টু চাকমা।একই দিনে জেলায় তিনটি নাশকতামুলক কর্মকান্ডে নড়েচড়ে বসেছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। তারা চারিদিকে সতর্কাবস্থা জারি করেছে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়। এরপর আর যাতে কোনো নাশকতামুলক ঘটনা না ঘটতে পারে সে জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।
এদিকে রাঙামাটির পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান জানিয়েছেন, ঘটনাগুলির সাথে যারা জড়িত তাদেরকে চিহ্নিত করতে কাজ করছে পুলিশ। তিনি বলেন কোনো একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এসকল ঘটনা জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্তিতিতে প্রভাব ফেলবে না বলেও জানিয়েছেন পুলিশ সুপার।

মঙ্গলবারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেএসএস এর সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের দাবিতে রাঙামাটির দশ উপজেলায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে স্থানীয় আওয়ামীলীগসহ অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এসকল সমাবেশে নেতৃবৃন্দ প্রায় অভিন্ন দাবিতে বক্তব্য রেখেছেন বলে জানাগেছে। একের পর এক হত্যাকান্ডসহ সশস্ত্র হামলার ঘটনায় আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েছে উপজেলা পর্যায়ের আওয়ামীলীগ নেতারা। বরকল থেকে এক আওয়ামী লীগ নেতা রাতে ফোন করে শহরের পরিস্থিতি জানতে চান। তিনি জানান, তারা নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। খোঁজ নিয়ে জানাগেছে রাঙামাটি আওয়ামীলীগের নেতাদের প্রায় সকলেই তাদের ইউনিয়ন ও উপজেলা থেকে পালিয়ে শহরে অবস্থান করার লক্ষ্যে চলে আসছেন। আঞ্চলিক দলীয় সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের ভয়ে কেউই এখন আর নিজেদেরকে নিরাপদ ভাবছেন না। সকলেই এখন শহরে এসে আত্মীয় স্বজন কিংবা আবাসিক হোটেলে অবস্থান করছেন।