চট্টগ্রাম, , রোববার, ১৯ আগস্ট ২০১৮

যে কারণে গতি পাচ্ছে না, সম্ভাবনাময় জাহাজ নির্মাণ শিল্প

প্রকাশ: ২০১৭-১২-০৬ ০৯:২৩:১৬ || আপডেট: ২০১৭-১২-০৬ ১২:১৬:১১

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায় নির্মাণ খরচ কম হবার কারণে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সম্ভাবনা এমনিতেই উজ্জ্বল। তবে দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যবসাবান্ধব নীতিমালার অভাবে এ শিল্পটি এখনও যথাযথভাবে বিকশিত হবার সুযোগ পায়নি। অন্যদিকে এই খাতে ঋণ পাওয়া অনিয়মিত হয়ে গেছে। তারপরও বর্তমানে এই খাতে কিছুটা সুবাতাস বইছে বলে মনে করছেন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।

জানা গেছে, দেশের সবগুলো শিপইয়ার্ডে জাহাজ নির্মাণে ব্যস্ত সময় কাটছে এখন। চলছে সঠিক সময়ে অর্ডারপ্রাপ্ত জাহাজ হস্তান্তরে নিরন্তর আন্দরিক চেষ্টা।

রপ্তানিমুখী জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড শিপবিল্ডিং ইন্ডাস্ট্রিজ অব বাংলাদেশ-এইওএসআইবির তথ্যানুযায়ী, দেশে ছোট-বড় অর্ধশতাধিক শিপইয়ার্ড ও শতাধিক মেরিন ওয়ার্কশপ রয়েছে। শিপইয়ার্ডগুলির ৭০শতাংশ ঢাকা ও এর আশেপাশে, ২০ শতাংশ চট্টগ্রামে এবং ১০ শতাংশ খুলনা ও বরিশালে অবস্থিত। দেশের সকল অভ্যন্তরীণ ও সমুদ্র উপকূলীয় জাহাজ এসব শিপইয়ার্ডে নির্মাণ ও মেরামত হয়ে থাকে। স্থানীয় চাহিদা পূরণের জন্য এসব শিপইয়ার্ড ৩৫০০টন ধারণক্ষমতা সমপন্ন জাহাজের ডিজাইন তৈরি ও নির্মাণ করে।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের রিভিউ অব মেরিটাইম ট্রান্সপোর্টের ২০১৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বিশ্বে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের শীর্ষে চীন, দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বিতীয়, তৃতীয় জাপান। এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ২২তম। প্রতিবেশী ভারতের অবস্থান ২০তম।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কুমিরায় অবস্থিত কর্ণফুলী শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এম এ রশিদ বলেন, টানা ছয় বছর মন্দাভাব কাটিয়ে চলতি বছরে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। শিপইয়ার্ডগুলোতে পর্যাপ্ত অর্ডার আছে। যা নির্মাণে ব্যস্ত সময় যাচ্ছে এখন।

তিনি বলেন, জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বাংলাদেশে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু পুঁজির অভাবে এ শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে হিমশিম খাচ্ছে। এ শিল্পে সহায়ক ব্যাংক ঋণ পেলে রপ্তানির অন্যতম খাত হবে। তিনি বলেন, এ খাতে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা ও সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।

এই মুহূর্তে দেশে আনুমানিক ১০ হাজার টন ক্ষমতার আন্তর্জাতিক মানসমপন্ন রপ্তানিমুখী জাহাজ তৈরির ক্ষমতা সমপন্ন ১০টি শিপইয়ার্ড রয়েছে। এরমধ্যে ২০০৮সালে জার্মানির স্টেলা শিপিং কোম্পানির কাছে প্রথম এমভি স্টেলা ম্যারিস নামের সমুদ্রগামী বহুমুখী পণ্যপরিবহনের উপযোগী জাহাজ রপ্তানি করে আনন্দ শিপইয়ার্ড অ্যান্ড স্লিপওয়েজ লিমিটেড। এরপর জাহাজ রপ্তানিতে যুক্ত হয় চট্টগ্রামের ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড।

সূত্রমতে, গত আট বছরে বিশ্বের ১১টি দেশে মোট ৪২টি জাহাজ রপ্তানি করে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। এরমধ্যে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড লিমিটেড রপ্তানি করেছে ২৭টি জাহাজ। যার মূল্য প্রায় ১৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অবশিষ্ট জাহাজগুলো রপ্তানি করেছে আনন্দ শিপইয়ার্ড অ্যান্ড স্লিপওয়ে লিমিটেড। বর্তমানে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও নরওয়েতে রপ্তানির জন্য ৬টি জাহাজ নির্মাণ করছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও এশিয়ার অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সাথে দেশীয় কয়েকটি জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানও নির্মাণাদেশ নিশ্চিত করতে পেরেছে।

এইওএসআইবির সাধারণ সমপাদক ও ওয়েস্টার্ন মেরিনার্স শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমরা এখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছি। এজন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংক লোন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৩০ বছর মেয়াদি লোন পরিশোধের সুযোগ আছে। এ শিল্পে আর্থিক সমস্যা নিরসনে রপ্তানিমুখী জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগকৃত মূলধনের বিপরীতে উচ্চ সুদের হার ৪ শতাংশ করে, তা ২০ বছর মেয়াদে (৫ বছর মোরাটারিয়াম সময়সহ) পরিশোধের সুবিধা দেয়া অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। তা হলেই ২০১০-২০১৬ সাল পর্যন্ত যে লোকসান ছিল তা ক্রমেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন ভাড়া কমে যাওয়ায় এ শিল্পের মন্দাভাব বিরাজ করছে। তবুও অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। কারণ বিদেশে যে জাহাজ নির্মাণে ৩৫কোটি টাকা লেবার খরচ লাগে; সেখানে আমাদের দেশে লাগে মাত্র তিন কোটি টাকা।

তবুও আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় আন্তর্জাতিক দরপত্রে সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগও কমে যাচ্ছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর। এছাড়া এ শিল্পের জন্য নীতিমালা না থাকায় অনেকেই মানসমপন্ন জাহাজ নির্মাণ করছেন না। ফলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের জন্য ব্যাপক সম্ভাবনাময় এ শিল্পে বিরুপ প্রভাব পড়ছে। তাই সংশ্লিষ্টরা জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য একটি নীতিমালা অত্যাবশ্যক বলে মনে করেন।

দেশীয় উদ্যোক্তারা বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিজেদের জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে বাঁচাতে প্রণোদনা দিচ্ছে। ভারত সরকার ২০১৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত জাহাজের রপ্তানিমূল্যের ওপর ২০ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা অনুমোদন করেছে। অথচ রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ায় দেশীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গত তিন বছরে জনবল ছাঁটাই করেছে। তবে দেশে পদ্মা সেতুসহ অনেকগুলো বড় অবকাঠামো নির্মিত হচ্ছে। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে হলে এখনই প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো সরকারিভাবে এ শিল্পের সহায়তা প্রয়োজন।

এইওএসআইবির তথ্যমতে, বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী জাহাজ নির্মাণশিল্পে অবকাঠামোগত বিনিয়োগের পরিমাণ তিন হাজার কোটি টাকা। আর জাহাজ নির্মাণের কার্যাদেশের বিপরীতে নেয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এখন ঋণ অনিয়মিত হওয়ায় বা বিনিয়োগের অর্থ তুলে আনতে না পারায় ব্যাংকগুলো নতুন করে জাহাজ নির্মাণখাতে উৎসাহী হচ্ছে না।