চট্টগ্রাম, , বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮

নির্যাতিত হয়েও উল্টো জরিমানার শিকার গৃহবধূ !

প্রকাশ: ২০১৭-১০-৩০ ১৬:৪৯:৫২ || আপডেট: ২০১৭-১০-৩০ ১৬:৪৯:৫২

আলমগীর মানিক
রাঙামাটি থেকে

জমির ফসল খেয়ে ফেলায় গরু বেধে রাখাকে কেন্দ্র করে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে জীবন নিয়ে বাড়ি-ঘর ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তিন সন্তানের এক জননী। প্রতিবেশীর আঘাতে নিজের গর্ভের অপূর্ন সন্তানটি প্রচুর রক্ত ক্ষরনে মারা যাওয়ার পাশাপাশি শারিরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েও গ্রাম্য সালিশে নিজেই জরিমানার শিকার হয়েছেন নুর জাহান নামে এক হতভাগিনী। ঘটনাটি রাঙামাটির লংগদু উপজেলাধীন বগাচত্বর ইউনিয়নের পেটাইন্যামা ছড়া এলাকায়।

দুই বছরের শিশু পুত্রকে কোলে নিয়ে আদালতের বারান্দায় মামলার তারিখের অপেক্ষায় থাকা নুরজাহান বেগম, প্রতিবেদককে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কাছে এসেই ন্যায় বিচার প্রাপ্তির আকুঁতি জানিয়ে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দেয়। এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, থানা পুলিশ কারো কাছেই গর্ভের সন্তান মেরে ফেলাসহ নির্মম শারিরিক নির্যাতনের শিকারের ঘটনার ন্যায় বিচার না পাওয়ার কথা জানান। তিনি বলেন আমি নিরূপায় হয়েই আদালতের শরনাপন্ন হয়েছি।

ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে নুর জাহান জানান, তিনটি সন্তানসহ চার মাসের গর্ভাবস্থায় আমি নিজের বসতঘরে মোটামুটি শান্তিতেই বসবাস করে আসছিলাম। বাচ্চাদের বাবা চট্টগ্রামে শ্রমিকের কাজ করে আমাদের জন্যে যে টাকা পাঠায় সেগুলো দিয়ে কোনো রকমে জীবন যাপন করে আসছিলাম। গত ১৭/০৮/২০১৭ ইং তারিখে আমার বাড়ির উঠানে লাগানো সবজি খেত খেয়ে ফেলায় আমি একটি গরুকে গাছের সাথে বেধে রাখি। এই খবর পেয়ে প্রতিবেশি মজনু ভান্ডারি তার স্ত্রী বিলকিছসহ তাদের সন্তান ও স্বজনরা এসে আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এক পর্যায়ে আমাকে বেদড়ক পেঠাতে থাকে। এসময় আমার তলপেঠে লাথি মারলে আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। আমার এই অবস্থা দেখে তারা পালিয়ে যায়। পরে অপর প্রতিবেশিরা এগিয়ে এসে আমাকে উদ্ধার করে। এক পর্যায়ে প্রচুর পরিমাণে রক্তক্ষরণ হয়ে আমার অবস্থার অবনতি হলে আমাকে লংগদু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায় আমার আম্মা। সেখান থেকে আমাকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে রেফার্ড করে।

প্রতিবেদকের কাছে উক্ত হাসপাতালগুলোর কাগজপত্র দেখিয়ে নুরজাহান জানান, আমি খাগড়াছড়ি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা আমাকে জানায় যে, আমার গর্ভের সন্তানটি রক্ত ক্ষরনের কারনে মারা গেছে। এই অবস্থায় আমি বাড়ি আসলে গ্রামের ইউপি চেয়ারম্যান রশিদ আমাকে নিয়ে বিচার বসিয়ে আমার কোনো কথা নাশুনেই আমাকে দোষী বানিয়ে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার আদেশ দেন। এরপর এই রায় আমি মানিনা জানিয়ে নিজ বাড়িতে চলে আসি। কিন্তু এরপর আমার উপর অত্যাচারের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। আমার বসতঘরে হামলা চালিয়ে জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভাতের পাত্রে এবং কলসিতে পায়খানা করে রেখে যায় হামলাকারিদের লোকজন। আমার বাসার টিনে প্রতিনিয়ত ঢিলছুড়ে আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও নানা ধরনের কটুক্তি করে। এমতাবস্থায় আমি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাই বাবার বাড়িতে। কিন্তু এরপর আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয় লংগদু থানায়। ঘটনার দুই মাসপর মামলা দায়ের করে সেই মামলায় লংগদু থানা পুলিশ আমার বাবাকে গ্রেফতার করে চালান দেয়।

নুর জাহান জানান, আমি এলাকায় ন্যায় বিচার নাপেয়ে রাঙামাটির আদালতে সকল কাগজপত্র দিয়ে ন্যায় বিচারে প্রত্যাশা করলে আদালত আমার অভিযোগটি আমলে নিয়ে লংগদু থানাকে নির্দেশ দেওয়ার একমাস অতিবাহিত হলেও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেনি। এই ব্যাপারটি জানতে আব্বাকে সাথে নিয়ে আমি অসুস্থ অবস্থায় লংগদু থানায় গেলে আমার আব্বাকে পুলিশ গ্রেফতার করে আমাকে দীর্ঘক্ষণ বসিয়ে রেখে থানা থেকে বের করে দেয়। নুরজাহান অভিযোগ করেন, সরকারদলীয় ইউপি চেয়ারম্যানের প্রভাবে থানা পুলিশ আমার সাথে অমানবিক আচরণটি করেছে।

সংশ্লিষ্ট্য ইউনিয়ন বগাচত্তর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল রশিদ মুঠোফোনে এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, নুরজাহানের প্রতিবেশির অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা গ্রামের গণ্যমান্যদের নিয়ে শালিসী বৈঠকে বসি। এসময় নুর জাহানের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায়, আমরা গ্রাম্য শালিসে উক্ত নুর জাহানকে কোনো জরিমানা করি নাই। আমরা শুধুমাত্র বাদীর চিকিৎসা খরছ বাবদ পাঁচ হাজার টাকা পরিশোধের জন্যে নুরজাহানকে নির্দেশ দিয়েছি কিন্তু সে টাকাটা দেয়নি।

অপরদিকে লংগদু থানার অফিসার ইনচার্জ রঞ্জন কুমার সামন্ত জানিয়েছেন, আমাদের কাছে নুর জাহান কোনো অভিযোগ নিয়ে আসেনি। কিন্তু তার বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকায় আমরা তাকে গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করেছি। দুই মাস পরে কেন মামলা নিলেন এই প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, বাদী আমাদের কাছে কাগজপত্র নিয়ে আসায় আমরা মামলাটি গ্রহণ করেছি।
এই উভয় মামলা তদন্তের দায়িত্বে থাকা এসআই সেলিম জানিয়েছেন আমি মামলাটি তদন্ত করছি আদালতের বেধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই আমি রিপোর্ট জমা দিয়ে দিবো আদালতে। তিনি বলেন, নুরজাহান এলাকায় থাকতে পারছেনা এমন বিষয় আমাদেরকে জানানো হয়নি।

এদিকে নুরজাহানকে মামলা-হামলার মাধ্যমে এলাকাছাড়া করা সেই নারী বিলকিছ ও তার স্বামী মজনু’র সাথে মুঠোফোনে কথা বললে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তারা বিষয়টি সম্পূর্ন অস্বীকার করে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

ছেলেকে কোলে নিয়ে আদালতের সামনে বটতলায় বসে থাকা নুরজাহান বলেন, ভাই আমি ন্যায় বিচারের আশায় অর্ধাহারে কাটাচ্ছি প্রতিদিন। মামলার খরছ চালাতে এবং হোটেল ভাড়ায় নিজের কাছে যা সঞ্চয় ছিলো সেগুলো শেষ হয়ে গেছে। বাড়ির পাশের প্রতিবেশিদের দেয়া সহায়তায় ছোট্ট ছেলেটির মুখে সামান্য খাবার দিতে পারছি।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, নুরজাহানের উপর হামলাকারিরা এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ি। বছর দেড়েক আগে তাদের মধ্যে দুইজন মাদক নিয়ে লংগদু পুলিশের হাতে আটকও হয়েছিলো।