চট্টগ্রাম, , বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮

‘রোহিঙ্গা শিশুদের যা কিছু ছিল তার চেয়েও বেশি কিছু হারিয়েছে ওরা ’

প্রকাশ: ২০১৭-১০-২৬ ০৯:৫৬:২৮ || আপডেট: ২০১৭-১০-২৬ ০৯:৫৬:২৮

‘রোহিঙ্গা শিশুদের যা কিছু ছিল তার চেয়েও বেশি কিছু হারিয়েছে ওরা।’ নির্যাতিত রোহিঙ্গা শিশুদের দুর্দশার চিত্র বোঝাতে এই একটি বাক্যই ব্যবহার করেছে ইউনিসেফ। ওদের হয়তো নিজেদের তেমন কিছুই ছিলো না, কিন্তু একটা পরিবার ছিলো। মিয়ানমারে সহিংসতার শিকার হয়ে অনেক রোহিঙ্গা শিশু হারিয়ে ফেলেছে তাদের পরিবারকেও।

এমনই দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়ানো রোহিঙ্গা শিশু ১০ বছর বয়সী তাসনিম আরা। সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে সে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। দুঃসহ সেই স্মৃতির কথা তুলে ধরে সে জানায়, আমার বড় ভাই ও চাচাকে আমার চোখের সামনে কুপিয়ে মেরে ফেলতে দেখেছি। সেই স্মৃতি এখনও তাড়া করে ফেরে তাসনিমকে।

তাসনিমকে রেখে আরেক দিকে চোখ ফেরালে নজর পড়ে জান্নাত আরার দিকে। জান্নাত আরার নিজের বয়সই ৯, এই বয়সে সে তার ছোট ভাইকে কোলে করে এসেছে ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত পুষ্টি কেন্দ্রে, যে কি না নিজে অপুষ্টির শিকার। সেবাদাতাদের সে বলে, আমার ভাই, আরফান, প্রতিদিন একটু একটু করে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। তাই আমরা তার চিকিৎসার জন্য তাকে এখানে নিয়ে এসেছি।

এভাবে ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত পুষ্টি কেন্দ্রে আরফানের মতো আরও অনেক শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। এখানে থাকা শিশুদের কেউ কেউ এসেছে তার বাবার সঙ্গে, কেউ মায়ের সঙ্গে আবার কেউ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে পরিবার থেকে।

কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একেক দিকে তাকালে একেক রকম অনুভূতি জমা হয়। একদিকে যেমন দেখা যায় অপুষ্টির শিকার শিশুদের দুর্দশা, তেমনই অন্যদিকে দেখা যায় কিছু নতুন প্রাণের উচ্ছলতাও।

ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত শিশুবান্ধব কেন্দ্রে একসঙ্গেই খেলাধূলা করে শিশুরা। তাদের বক্তব্য, এখানে আমাদের অনেক মজার সময় কাটে। তাই বাসার চেয়ে এখানেই সময় কাটাতে আমাদের বেশি ভালো লাগে। বাড়িতে আমাদের কাজ করতে হয়, কিন্তু এখানে আমরা শুধুই খেলি। প্রারম্ভিক শিক্ষাও প্রদান করা হচ্ছে এখানে থাকা শিশুদের।

এসব শিশুর জন্য একটি সুস্থ ও সুন্দর ছোটবেলা উপহার দিতে চেষ্টা করে চলছে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো, এমনকি শিশুবান্ধব কেন্দ্রগুলোতে রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য কার্টুন দেখারও ব্যবস্থা করা হয়।

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শিশুদের বেশিরভাগই অপুষ্টির শিকার। এসব শিশুদের সহায়তা দিতে কাজ করে যাচ্ছে সেবাদাতা সংস্থাগুলো। তবে তাদের জন্য এখন অর্থ তহবিলে সংকট দেখা দিয়েছে। এসব রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য দাতাদের কাছে আরো বেশি বেশি সহায়তা প্রত্যাশা করছে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।

এর পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় রোহিঙ্গাদের সহযোগিতায় আয়োজিত আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি সম্মেলনে বসে বেশ কয়েকটি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। সম্মেলনে রোহিঙ্গাদের জন্য আরও সাড়ে ৬ কোটি ডলার বা ৫শ’ কোটি টাকা সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো।

রোহিঙ্গাদের মানবিক সহযোগিতায় পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, খাবার, স্বাস্থ্যসেবা, সুরক্ষা এবং শিক্ষার কাজে এই অর্থ ব্যয় করা হবে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, জেনেভার ওই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ৩ কোটি ডলার, কুয়েত দেড় কোটি ডলার, অস্ট্রেলিয়া এক কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার এবং যুক্তরাজ্য এক কোটি ২ লাখ পাউন্ড অর্থ সহায়তা দেয়ার প্র্রতিশ্রুতি দেয়।

বৈঠকে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান মার্ক লোকক বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা, সহিংসতা ও দেশত্যাগের বিষয়টি এই দশকের মধ্যে সবেচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা। এই ঘটনার শিকার লোকজনের চাহিদা মেটাতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর বহুদিন ধরে চলমান সংঘর্ষ-সহিংসতা সঙ্কট সমাধানে ২০১৬ সালের আগস্টে গঠিত হয় অ্যাডভাইজরি কমিশন অন রাখাইন স্টেট। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে ওই কমিশন এক বছরের তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের প্রধান অং সান সু চির কাছে জমা দেয় চলতি বছরের ২৪ আগস্ট।

৬৩ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদন জমা দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই ২৪ আগস্ট দিবাগত রাতে ত্রিশটি পুলিশ ও সেনাচৌকিতে রহস্যজনক হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় নিহত হয় নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্য। তারপরই হামলার জন্য রোহিঙ্গা ‘জঙ্গি’দের দায়ী করে জবাব হিসেবে সেনাবাহিনী পুরো অঞ্চলে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে।

সেনাবাহিনীর হামলা ও সহিংসতার মাত্রার ভয়াবহতার কারণে জাতিসংঘ একে ‘পাঠ্যবইয়ে যোগ করার মতো জাতিগত নিধনের উদাহরণ’ বলে অভিহিত করেছে।আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন না করার উদ্দেশ্যেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এই হত্যাকাণ্ড শুরু করে।