চট্টগ্রাম, , সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮

১০ বছরেও শেষ হয়নি চট্টগ্রাম-হাটহাজারী সড়কের নির্মাণ কাজ!

প্রকাশ: ২০১৭-১০-২১ ২৩:৫৭:৩০ || আপডেট: ২০১৭-১০-২২ ১৩:৫২:৪৭

এম আই খলিল
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস

চট্টগ্রাম শহরের মুরাদপুর থেকে হাটহাজারী পৌরসভার দুরত্ব মাত্র সাড়ে ১২ কিলোমিটার। কিন্তু সড়কটির এমন অবস্থা যে, যানবাহন চলাচল তো দূরের কথা; পায়ে হেঁেট গেলেও পুরো শরীর ব্যাথা হয়ে যায়। ফলে এ সড়ক দিয়ে চলাচল করতে চান না কেউ।

অথচ এ সড়কে রয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার ২০ লাখ মানুষের যাতায়াত। শিক্ষা-পর্যটন ছাড়াও এ সড়কে রয়েছে চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহের মূল স্টেশন। হাটাহাজারী ছাড়াও ফটিকছড়ি, রাউজান এবং রাঙ্গুনিয়া উপজেলার অধিকাংশ মানুষ চট্টগ্রাম শহরে যাতায়াত করে এ সড়কে।

কিন্তু সড়কটি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ হয়নি অদ্যাবধি। সড়ক মেরামত শুরু থেকে এ পর্যন্ত ১০ বছর পার হয়ে গেছে। আর কত বছরে এ সড়কের নির্মাণ কাজ শেষ হবে তা নিয়েই আতঙ্কে রয়েছে বিস্তীর্ণ জনপদের ৩০-৩২ লাখ মানুষ।

স্থানীয় ভুক্তভোগীরা জানান, ২০০৭ সালে নগরীর মুরাদপুর থেকে হাটহাজারী পৌরসভা পর্যন্ত ১২ দশমিক ৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণসহ ৬ লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয় সড়ক ও জনপথ বিভাগ। তখন কাজটি ২০১০ সালে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু নানান জটিলতায় তখন কাজটি শেষ হয়নি।

ফলে প্রথম দফায় ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। তাও শেষ করতে পারেনি প্রকল্পের কাজ। দ্বিতীয় দফায় সময় বাড়ানো হয় ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এরপরও কাজ শেষ করতে পারেনি নিযুক্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলো। ফের তৃতীয় বারের মতো সময় বাড়িয়ে প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয় ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।

তাতেও কাজ শেষ না হওয়ায় চতুর্থবারের মতো সময় বাড়িয়ে প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ২০১৭ সালের ৩০ জুন। যা শেষ হওয়ার চারমাসেও সড়কটির নির্মাণ কাজ শেষ করতে পারেনি সড়কটির নির্মাণ কাজের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠাগুলো।

সড়ক ও জনপথ সূত্র জানায়, সড়কটি নির্মাণ কাজের শুধু সময় বাড়েনি। সেই সাথে বেড়েছে প্রকল্প ব্যয়ও। শুরুতে এ সড়কের নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় একনেকে পাস হয় ১২৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা ৮৭ হাজার টাকা। পরে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে এ ব্যয় বেড়ে দাড়ায় ২২৬ কোটি টাকায়।

সড়কটির প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজের মধ্যে রয়েছে, চারলেনের জন সড়কটির উভয় পাশে ২৪ ফুট করে ৪৮ ফুট প্রশস্ত সড়ক তৈরী করণ। এ জন্য এক দশমিক ৩৬ একর জায়গা অধিগ্রহণ করা। সড়কটির মাঝখানে ডিভাইডার তৈরী করা। সড়কে দুটি ব্রিজ নির্মাণ ও ২৪টি কালভার্ট নির্মাণসহ ১২ কিলোমিটার সড়ক পিচ ঢালাই করা।

সূত্র আরো জানায়, তিনটি প্যাকেজে এ প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করছে সওজ। ৮ দশমিক ৮ কিলোমিটার অংশের কাজ পেয়েছিল এম বিল্ডার্স। বাকি ৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার অংশের পেয়েছিল অনোয়ার ও পপুলার নামে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। ৮ দশমিক ৮ এর মধ্যে ৩ কিলোমিটার অংশের কাজ সময়মতো শেষ করতে না পারায় ২০১৫ সালের ৪ এপ্রিল এম বিল্ডার্সের কার্যাদেশ বাতিল করেন সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

দরপত্রের মাধ্যমে ওই তিন কিলোমিটার অংশের কাজ পান আওয়ামী নেতা মঞ্জুরুল আলম নামে এক ঠিকাদার। একইসঙ্গে প্রকল্পের ২৪টি কালভার্টের মধ্যে ১৮টির নির্মাণ কাজও পান তিনি। এর আগে আনোয়ার পপুলার এর পাওয়া ৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার অংশের কার্যাদেশ বাতিল করে এ প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা জরিমানা করেন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

পরে পুনঃ দরপত্র আহবান করলে ৩৭ কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষ ওই অংশের (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ১ নম্বর গেইট থেকে হাটহাজারী সদর পর্যন্ত) কাজ পায় তাহের ব্রাদার্স লিমিটেড। গত ১০ ফেব্রুয়ারি সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রী সভার কমিটিতে এ অংশের কাজ অনুমোদন পেয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ঠিকাদার মঞ্জুরুল আলম বলেন, মাননীয় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের আন্তরিকতায় প্রকল্পের বাকি তিন দশমিক ৭ কিলোমিটার অংশের কাজ সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটিতে অনুমোদন পেয়েছিল। দফায় দফায় মেয়াদ বাড়ানোর পরও সময়মতো প্রকল্পের বাস্তবায়ন না হওয়ায় পিডিবির গাফিলতি ও ভুমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে দায়ী করেন তিনি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সওজ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী জুলফিকার আহমেদ বলেন, অক্সিজেন হাটহাজারী সড়কের প্রায় কাজ শেষ হয়েছে। সড়কের দুটি ব্রিজের কাজ ও দুই জায়গায় অল্প রাস্তার কাজ বাকি আছে। ডিভাইডারের কাজ চলমান। এ অবস্থায় আরও অন্তত মাস দুয়েক সময় লাগতে পারে প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি সমাপ্ত করতে। তবে প্রকল্পের মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না।

জানতে চাইলে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান তাহের ব্রাদার্সের সহকারী ব্যবস্থাপক বজলুর রহমান বলেন. সড়ক নির্মাণ কাজে সময় বৃদ্ধির কারণ হচ্ছে সড়কের প্রশস্থতায় স্থানীয়দের বাঁধা। সড়কের উভয় পাশে গড়ে ওঠা মসজিদ, মাদরাসা, মন্দির, কবরস্থান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদে জটিলতা সৃষ্টি। এছাড়াও গ্যাস, বিদ্যুৎ, ওয়াসা ও টেলিফোনসহ বিভিন্ন সেবা সংস্থার সংযোগ লাইন অপসারণও বিলম্ব হয়। এসব কারণে কয়েক দফা প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ বাড়ানো হয়। পাশাপাশি ব্যয়ও বেড়ে যায়। কিন্তু সরকারের কাছ থেকে পর্যাপ্ত বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। ফলে ছয় লেন প্রকল্পটি চার লেনেই শেষ করতে হচ্ছে। সর্বশেষ সময় অনুযায়ী জুনের মধ্যে সড়কের কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এখনো শেষ হয়নি।