চট্টগ্রাম, , শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮

এক বছরেও সর্বস্ব হারানো ৩’শ ব্যবসায়ির পাশে দাঁড়ায়নি কেউ

প্রকাশ: ২০১৭-১০-১৯ ১৮:৫১:০৫ || আপডেট: ২০১৭-১০-১৯ ১৮:৫৫:৫৬

আলমগীর মানিক
রাঙামাটি থেকে

রাঙামাটির দূরছড়ি বাজারে রহস্যজনক আগুনের ছৌবলে সহায় সম্বল হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার একটি বছর পার হতে চললেও ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়িদের পাশে দাঁড়ায়নি সরকারী-বেসরকারি কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান। এখনো পুর্বের অবস্থায় স্বরূপ ফিরে পায়নি রাঙামাটির ঐতিহ্যবাহি দূরছড়ি বাজার। গত ২০১৬ সালের ২০ অক্টোবর রহস্যজনকভাবে আগুন লেগে মাত্র আধা ঘন্টা সময়ের মধ্যেই সম্পূর্ন পুড়ে ছাই হয়ে যায় পুড়ো বাজার। সহায় সম্বল হারিয়ে মুহুর্তের মধ্যেই পথে বসে যায় ২৮৫টি পরিবার। একমাত্র আয়ের উৎস ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতঘরসহ সমস্ত জিনিসপত্র পুড়ে ছাই হওয়ার পর বিগত একটি বছরেও এই সকল ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোর কাছে সাহায্যের হাত বাড়ায়নি সরকারী বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান/ সংস্থা। এতে করে চরম দূর্দিন যাচ্ছে তাদের। সপ্তাহের হাটের দিনে অন্তত দুই কোটি টাকা লেনদেন হওয়া ঐহিত্যবাহি বাজারটি পুর্নগঠনে নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পেয়ে সরকারিভাবে এই বাজারটিসহ ক্ষতিগ্রস্থদের সহায়তায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে একটি তালিকা তৈরি পূর্বক ইষ্টিমিট করে পাঠানো হয় তার বেশ কয়েক মাস আগে। কিন্তু অদৃশ্য দোয়ার অভাবে সেই তালিকা এখনো ফাইলবন্দি অবস্থায়ই রয়ে গেছে। বছরের পর বছর ব্যবসা করে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা আগুনে পুড়ে নিঃস্ব হওয়ার পর এখন পরিবার পরিজন নিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। তাকিয়ে আছে সরকার ও নেতৃবৃন্দের বদান্যতার দিকে।

দূরছড়ি বাজারের ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ীরা জানায়, ২০১৬ সালের ২০ অক্টোবর আগুনে পুড়ে প্লট মালিকসহ সর্বমোট ২৮০টি ব্যবসায়ি পরিবার সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার পর দীর্ঘ একটি বছর সময় অতিবাহিত হলেও এই বাজারটি পুর্নগঠনে কোনো কোনো নেতৃবৃন্দ তাদের পাশে আশার বাণী নিয়ে দাঁড়ায়নি। ব্যবসায়িরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যে বাজারটিতে প্রতি সাপ্তাহিক হাটে কোটি টাকার লেনদেন হতো, সেই বাজারটি পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার এক বছরেও ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়িদের আগামী দিনগুলো কিভাবে চলবে তা নিয়ে একবারও ভাবেনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ছালাম জানিয়েছেন, ১৯৬০ ইংরেজী সালের পর থেকে এই দূরছড়ি বাজারটি রহস্যজনক আগুনে পুড়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের ২০অক্টোবর আবারো আগুন লেগে সম্পূর্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহি এই বাজারটি। অগ্নিকান্ডের পর সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম ডিভিশনের জিওসিসহ রাঙামাটির জেলা প্রশাসক ও প্রশাসনের উর্দ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে আসলে আমাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে বাজারের ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়িদেরকে স্থায়ীভাবে দোকানঘর নির্মানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু একটি বছর পার হতে চললেও মন্ত্রণালয় এই ব্যাপারে আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি আধৌ এই ব্যাপারে তারা এগিয়ে আসবে কিনা সে ব্যাপারেও আমরা সন্দিহান।

ব্যবসায়ি সমিতির সভাপতি খায়ের আহম্মদ জানান, আমাদের ছোট-বড় ২৮৫টি দোকান সম্পূর্ন পুড়ে ছাই হয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে অন্তত তিনশো পরিবার। তিনি বলেন, ভূক্তভোগীদের দাবীর প্রেক্ষিতে প্রতিটি দোকানের জন্য ৬,০০,০৩৬.০০ (ছয় লক্ষ ছত্রিশ টাকা মাত্র) ধার্য্য করে জেলা প্রশাসক অফিস থেকে একটি প্রক্কলন পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়।

খায়ের জানান, আর্থিক অনুদানের বিষয়ে তারা (বাজার কমিটি) তিনবার জেলা প্রশাসকের সরনাপন্ন হলে তিনি এ বিষয়ে তার কিছু করার নেই বলে জানান। জেলা প্রশাসক বাজার কমিটিকে সংশি¬ষ্ট মন্ত্রনালয়ের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। গত ১৫ অক্টোবর ২০১৭ তারিখ বাজার কমিটির সভাপতির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় পার্বত্য মন্ত্রনালয়ের সচিব জনাব নব বীক্রম কিশোর ত্রিপুরার সাথে দেখা করেন। পার্বত্য সচিব তাদেরকে জানান যে, পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রনালয় আর্থিক বিষয়ক প্রস্তাবকে নাকচ করে দিয়েছেন।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মানজারুল মান্নান জানিয়েছেন, ঘটনার পরপরই আমরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের পাশে দাড়িয়েছি। পরবর্তীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে মাননীয় মন্ত্রী, সচিব মহোদয় আমাদের নির্দেশনা প্রদান করেন যে, দূরছড়ি বাজারটি নিয়ে একটি ইষ্টিমিট করে ডিজাইন করে পাঠানোর জন্যে, তারা চেষ্ঠা করবেন যে কিছু করা যায় কিনা? এই নির্দেশনা পেয়ে, আমরা উক্ত বাজারটি পুর্নগঠনে একটি ডিজাইন করে এবং ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা প্রণয়ণ করে একটি ইষ্টিমিট আমরা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। কিন্তু অদ্যবদি পর্যন্ত আমার কাছে বরাদ্ধের ব্যাপারে কোনো তথ্য আমি জানিনা। এই ব্যাপারে আমার কাছে কোনো পত্র আসেনি।

এদিকে, ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ি হোমিওপ্যাথী চিকিৎসক মঙ্গল প্রদীপ চাকমা বলেন, আগুনে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার একটি বছর পার হতে চললেও আমাদের পাশে কেউই দাঁড়ায়নি। এটা আমাদের দূর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছুই নয়। অর্থনৈতিক কর্মকান্ড স্বাভাবিক রাখতে এবং পাহাড়ী-বাঙ্গালীর মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে বাজারটির পূণঃনির্মাণ/ক্ষতিগ্রস্থদের আর্থিক সহায়তা প্রদান অত্যন্ত জরুরী। ভূক্তভোগী এবং ক্ষতিগ্রস্থরা তাদের ক্ষতি পূরণের বিষয়ে সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।