চট্টগ্রাম, , বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮

আবদুল ওয়াহ্‌হাব মিঞাকে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি: সুপ্রিমকোর্ট

প্রকাশ: ২০১৭-১০-১৪ ১৭:১৪:৫০ || আপডেট: ২০১৭-১০-১৪ ১৭:১৪:৫০

ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্‌হাব মিঞাকে প্রধান বিচারপতির অনুরূপ দায়িত্ব দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ।

এ তথ্য জানিয়েছে সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার দপ্তর।

সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার দপ্তর আরো জানিয়েছে, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচার, আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও নৈতিকস্খলনসহ ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠায় তার সঙ্গে বসতে চাননি আপিল বিভাগের একই বেঞ্চের অন্য ৫জন বিচারপতি।

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এক মাসেরও বেশি সময়ের ছুটিতে বিদেশ যাওয়ার কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে এই সিদ্ধান্ত এল রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে। এখন থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্‌হাব মিঞা প্রধান বিচারপতির ন্যায় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন বলে সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার দপ্তর জানিয়েছে।

শুক্রবার রাত ১০টার দিকে সরকারি বাসভবন থেকে শাহ জালাল বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সময় বাসভবনের গেইটে লিখিত বক্তব্যে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা বলেছেন, আমার একটি রায় নিয়ে বিশেষ মহল প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়েছে, আমি সুস্থ আছি।

বিচারপতি সিনহা বলেন ‘আমি সম্পূর্ণ সুস্থ আছি। কিন্তু ইদানিং একটা রায় নিয়ে রাজনৈতিক মহল, আইনজীবী, বিশেষভাবে সরকারের মাননীয় কয়েকজন মন্ত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে ব্যক্তিগতভাবে যেভাবে সমালোচনা করেছেন, এতে আমি সত্যিই বিব্রত। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সরকারের একটি মহল আমার রায়কে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে পরিবেশন করায় প্রধানমন্ত্রী আমার প্রতি অভিমান করেছেন। এই অভিমান অচিরেই দূর হবে বলে আমার বিশ্বাস।’

লিখিত বক্তব্যে প্রধান বিচারপতি আরো বলেন, ‘সেই সঙ্গে আমি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়েও একটু শঙ্কিত বটে। কারণ, গতকাল (বৃহস্পতিবার) প্রধান বিচারপতির কার্যভার পালনরত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রবীণতম বিচারপতির উদ্ধৃতি দিয়ে মাননীয় আইনমন্ত্রী প্রকাশ করেছেন যে, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি অচিরেই সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনে পরিবর্তন আনবেন। প্রধান বিচারপতির প্রশাসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কিংবা সরকারের হস্তক্ষেপ করার কোনও রেওয়াজ নেই। তিনি শুধুমাত্র রুটিনমাফিক দৈনন্দিন কাজ করবেন। এটিই হয়ে আসছে।’

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘প্রধান বিচারপতির প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করলে দায়িত্বপ্রাপ্ত এটি সহজেই অনুমেয় যে, সরকার উচ্চ আদালতে হস্তক্ষেপ করছে এবং এর দ্বারা বিচার বিভাগ ও সরকারের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হবে। এটি রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।’

শুক্রবার রাত ৯টা ৫৭ মিনিটে বাসা থেকে বের হন প্রধান বিচারপতি। আধা ঘণ্টা পর রাত ১০টা ৩০ মিনিটে তারা বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখান থেকে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে রওনা হন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তাকে বহনকারী সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি যথাসময়েই শাহ জালাল বিমানবন্দর ছেড়ে গেছে।

এদিকে ছুটি নিয়ে রাজনীতিতে তুমুল বিতর্কের মধ্যে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা শুক্রবার রাতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়েন। রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে অস্ট্রেলিয়ায় তার মেয়ে সুচনা সিনহার বাড়ির উদ্দেশ্যে বিচারপতি সিনহা রওনা হন।

সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের ডিউটি ম্যানেজার মো. জুনায়েদ হোসেন জানান, তাদের ওই ফ্লাইট নির্ধারিত সময়েই ছেড়ে গেছে। ঢাকা থেকে রওনা হয়ে ফ্লাইট এসকিউ ৪৪৭ স্থানীয় সময় ভোর ৬টায় সিঙ্গাপুরে পৌঁছাবে। সেখানে ৪৫ মিনিট যাত্রাবিরতি করে রওনা হবে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে। সিঙ্গাপুর থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছাতে প্রায় সাত ঘণ্টা লাগে বলে জানান জুনায়েদ।

এর আগে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সে শুক্রবার রাতের ফ্লাইটের টিকেট কাটেন।

বৃহস্পতিবার দুপুরে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, শুক্রবারই প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বিদেশ সফরে যাচ্ছেন। বিচারপতি সিনহা অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফর শেষে আগামী ১০ নভেম্বর দেশে ফিরবেন।

এ সময় তিনি আরো বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা যেভাবে চেয়েছেন সেভাবেই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’

এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিদেশে যাওয়ার অনাপত্তিপত্র ও ছুটির প্রজ্ঞাপন জারি করে আইনমন্ত্রণালয়।

এছাড়া বুধবার রাতে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিদেশে যাওয়ার বিষয়ে সরকারি আদেশের (জিও) অনুমতিপত্রে সই করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। আইন সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক এ তথ্য জানিয়েছেন।

আইন সচিব জানান, প্রধান বিচারপতির বিদেশ যাওয়া সংক্রান্ত আবেদনের সারসংক্ষেপে রাষ্ট্রপতি বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে সই করেন।

প্রসঙ্গত, বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নিতে করা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় গত ১ আগস্ট প্রকাশের পর থেকে মন্ত্রী-এমপিদের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েন প্রধান বিচারপতি। জাতীয় সংসদেও তার সমালোচনা করা হয়। ৮ সেপ্টেম্বর রাতে অসুস্থ মেয়েকে দেখতে কানাডায় যান প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা। সেখান থেকে তিনি একটি সম্মেলনে যোগ দিতে ১৮ সেপ্টেম্বর জাপানে যান।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে কানাডা ও জাপান সফর শেষে দেশে ফেরেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। সাপ্তাহিক ছুটি, বাংলাদেশ সরকারের ঘোষিত ছুটি এবং কোর্টের অবকাশের কারণে দীর্ঘ ৩৯ দিন পর ২ অক্টোবর থেকে সুপ্রিমকোর্টে নিয়মিত বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে আবারো একমাসের ছুটির আবেদন করেন তিনি। পরে তা আরো ১০ দিন বাড়ানো হয়েছে।

২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পাওয়া বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার দায়িত্ব পালনের মেয়াদ রয়েছে আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। ছুটি নিয়ে রাজনীতিতে আলোচনা-সমালোচনা মধ্যেই বিদেশ সফরে গেলেন প্রধান বিচারপতি সিনহা।