চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮

চট্টগ্রাম ওয়াসার গ্রাহকদের দিতে হচ্ছে লুটপাটের খেসারত!

প্রকাশ: ২০১৭-১০-১৪ ২৩:১২:৪৩ || আপডেট: ২০১৭-১০-১৫ ১২:৩১:৫৪

মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, সিটিজি টাইমস

জন্মের পর থেকেই শুরু হয়েছিল লুটপাটে। ইতিমধ্যে পার হয়েছে ৫৫টি বছর। এতোটা বছর পার হলে ও অভ্যাসটি কমেনি বরং তা দিন দিন আরো বেড়েই চলেছে। আগে কিছুটা রাখঢাক থাকলে ও এখন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এটি আরো ব্যাপক আকার ধারন করেছে। এতে করে কারো ভাগ্য পরিবর্তন হলে ও চট্টগ্রাম ওয়াসার গ্রাহকদের দিতে হচ্ছে হাজার কোটি টাকার লুটপাটের খেসারত।

ওয়াসার তথ্য মতে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মোট পানি উৎপাদন ছিল ৮ হাজার ৪০২ মিলিয়ন লিটার। বিল করা হয়েছে ৬ হাজার ২১১ মিলিয়ন লিটারের। পদার আড়ালে রয়ে গেছে ২ হাজার ১৯১ মিলিয়ন লিটার। অথ্যাৎ উৎপাদন ও বিক্রয়ের ব্যবধানই ২৬ শতাংশ। প্রতি মাসে উৎপাদন বিভাগ এবং বিক্রয় বিভাগের অংকে রয়ে যায় বিশাল ফারাক। যেটিকে অনেক প্রতিষ্টান সিস্টেম লস বলে তা ওয়াসা বলে নন রেভিনিউ ওয়াটার (এন আর ডব্লিউ)।

ওয়াসার গ্রাহক রয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার। ১১ হাজার ৭১৪টি মিটারের গড় বিল করা হয়েছে। বিল হয় নাই ২৬ শতাংশের। শুধু ১ মাসেই ওয়াসা বঞ্চিত হয়েছে ১ কোটি ৯৭ হাজার ১ হাজার ১৯ টাকা থেকে। চট্টগ্রাম ওয়াসায় মোট সংযোগ রয়েছে প্রায় ৬৪ হাজার ৯৮৮টি। এর মধ্যে গড় বিল হয় ১১ হাজার ৭১৪টি মিটারের। উল্লেখ নষ্ট মিটার কিংবা চুরি হয়ে যাওয়া মিটারের গড় বিলের নামে যা হয় মিটার পরিদর্শকদের অন্যতম আয়ের উৎস হিসেবেই অনেকে এই খাতকে তাদের আলাদীনের চেরাগের সাথে তুলনা করা হয়।

মুলত রাজস্ব বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তা কর্মচারীর ভাগ্য খুলে যায় এন আর ডব্লিউর মাধ্যমে। তাদের দুনীতির বিষয়টি সর্বজন স্বীকৃত যা ওয়াসার জন্ম থেকে আজঅব্দি চলেই আসছে।

কর্তৃপক্ষের দাবি বতর্মানে ওয়াসাতে ২৬ শতাংশ এন আর ডব্লিউ। চট্টগ্রাম ওয়াসার বাজেটে এন আর ডব্লিউ ধরা হয়েছে ২০ শতাংশ। এই ব্যাপারে জানতে চাইলে রাজস্ব বিভাগের দায়িত্বশীল কেউ কোন মন্তব্য না এই প্রতিবেদককে মনে করিয়ে দেন যে, বিবিধ কারণে এই সংখ্যাটা বেড়ে গেছে। অতীতে এটি ৩০ শতাংশ পার হয়েছিল।

কর্তৃপক্ষের তথ্য মতে, চলতি বছরের ফের্রুয়ারী মাসে পানির উৎপাদন ছিল ৮ হাজার ১৮৮ মিলিয়ন লিটার। বিল হয়েছে ৫ হাজার ৯৭৩ মিলিয়ন লিটারের। একই ভাবে মার্চে উৎপাদন ছিল ৮ হাজার ৮৭৫ মিলিয়ন লিটার এবং বিল করা হয়েছে ৬ হাজার ৪৩ মিলিয়ন লিটারের। এই পরিসংখ্যানে দেখা যায়, র্ফ্রয়োরী মাসে এন আর ডব্লিউ ছিল ২৭ শতাংশ এবং মার্চে ছিল ৩২ শতাংশ। একই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের এপ্রিলে ২৬ শতাংশ, মে ২৬, জুন ১৭ এবং জুলাইতে ২৫ শতাংশ এন আর ডব্লিউ বিদ্যামান আছে চট্টগ্রাম ওয়াসায়। গত (বৃহস্পতিবার) এই রির্পোট লেখাকালীন জুলাই থেকে পরবর্তী মাসগুলোর এন আর ডব্লিউর কোন পরিসংখ্যান ওয়াসা অফিসে পাওয়া যায় নি।

চট্টগ্রাম শহরের বাসিন্দাদের পানির সমস্যা লাঘবে তৎকালিন পাকিস্থান সরকার গঠন করেছিল চট্টগ্রাম ওয়াসা। নানা সীমাবদ্ধতার মাঝে ও নগরবাসীর পানির তৃঞ্চা মেটাতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে শেখ হাসিনা পানি শোধনাগার প্রকল্পটি চালুর পরে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ পানি উৎপাদন সক্ষমতা দৈনিক ৩১ কোটি লিটার দাবী করলে ও মুলত ২৭-২৮ কোটির ঘরেই সীমাবদ্ধ থাকছে। তবে বিক্রয় বিভাগ মনে করছে এই সংখ্যাটা আরো অনেক কম।

চট্টগ্রাম ওয়াসা সুত্রে জানা যায়, নগরবাসীর পানির চাহিদা মেটাতে ২০০০ সালের পরে শহরের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক গভীর নলকূপ স্থাপন করে। পুরো নগরীকে কাজের সুবিধার্থে ( মেনটেইনেন্স অপারেশন এন্ড ডিস্ট্্িরবিউশন) মড ১ ও মড ২ অঞ্চলে ভাগ করা হয়। বতর্মানে মড ১ বিভাগে কার্যকর গভীর নলকূপ রয়েছে ২৪টি ও মড ২ তে ৫০টি। গত বছরের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পানিশোধনাগার প্রকল্পটি উদ্ধোধনের পরেই ২২টি নলকূপ বন্ধ করে দেয়া হয়।

বছরের পর বছর চালু এই সব গভীর নলকূপের ৯০ শতাংশ মিটারই নষ্ট বলে স্বীকার করেছে কর্তৃপক্ষ। তাছাড়া যান্ত্রিক এই সব নলকূপের সক্ষমতা দিন দিন কমে আসছে। ইতিমধ্যে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা এসে দাড়িয়েছে ৫০ শতাংশে। তারপরও নিজেদের কৃতিত্ব দেখাতে এই সব পুরানো নলকুপের শতভাগ উৎপাদন দেখিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছে রাজস্ব বিভাগ। তা ছাড়া মিটার অচল থাকাতে উৎপাদনের পরিমান ও সঠিকভাবে নির্নয় করা সম্ভব হয় না। বিভিন্ন প্রকল্পে কি পরিমান পানি উৎপাদন হচ্ছে তা নিয়ে ও সন্দিহান এই বিভাগটি। ফলে প্রতি মাসে উৎপাদন বিভাগ এবং বিক্রয় বিভাগের অংকে রয়ে যায় বিশাল ফারাক। যেটিকে অনেক প্রতিষ্টান সিস্টেম লস বলে তা ওয়াসা বলে নন রেভিনিউ ওয়াটার (এন আর ডব্লিউ)।

মুলত শেখ হাসিনা পানি শোধনাগার প্রকল্পের অতিরিক্ত ১৪ কোটি পানি উৎপাদনে আসাতে নগরীর পুরানো জরাজীর্ণ পাইপ লাইন ফুটো হয়ে যাওয়াতে পানির অপচয় বেড়ে গেছে বলে মনে করেন ওয়াসা কতৃপক্ষ। আবার চলতি মাসে নতুন সংযোগ হলে ও পরে গিয়ে বিল হয়। অলিখিতভাবে সঠিক বিলিং হয় না। অথ্যাৎ বিশাল অংশ অদৃশ্য থাকে চুরির কারণে।

ইতিমধ্যে ওয়াসার উধর্বতন কর্তৃপক্ষ এন আর ডব্লিউ আরো কামানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করছে রাজস্ব বিভাগের উপর। তবে রাজস্ব বিভাগ মনে করছে জরাজীর্ণ গভীর নলকূপ থেকে শতভাগ উৎপাদন দেখানো হচ্ছে। অপরদিকে বিভিন্ন পানি প্রকল্প থেকে উৎপাদনের যে রিডিং দেয়া হচ্ছে তা নিয়ে ও সন্দেহ রয়েছে রাজস্ব বিভাগের।

নির্ভরযোগ্য সুত্রে জানা যায়, এন আর ডব্লিউ বিষয়ে ব্যাপক চাপে রয়েছেন রাজস্ব বিভাগ।ওয়াসার বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক ড. পীযুষ দত্ত রাজস্ব বিভাগের কর্মরত কর্মকর্তা কর্মচারীদের মৌখিক নির্দেশ দিয়েছেন অতিসত্বর চালু থাকা গভীর নলকুপের ব্যাপারে সুনিদিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করতে। বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক ও চান উৎপাদনের সঠিক চিত্র।

এই ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ওয়াসার বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক ড. পীযুষ দত্ত রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীদের দেয়া নির্দেশকে পরোক্ষভাবে অস্বীকার করে সিটিজি টাইমসকে বলেন, ‘‘এটি একান্তই প্রকৌশল বিভাগের বিষয়। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে কেন এন আর ডব্লিউ বেশী হচ্ছে তা যাচাই করতে উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রকৌশল) স্যারকে অনুরোধ জানিয়েছি।’’

জানতে চাইলে উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রকৌশল) রতন কান্তি সরকার বলেন, ‘এখানে লুকোচুরির কোন সুযোগ নাই। প্রকৃত যা উৎপাদন, পরিসংখ্যানে তাই দেখানো হচ্ছে। ওয়াসার গভীর নলকূপের মিটারগুলো অকেজো আছে স্বীকার করে তিনি বলেন ‘ওয়াসার অধিকাংশ গভীর নলকূপের মিটার নষ্ট থাকলে ও কয়েকমাস পর পর সেইসব নলকূপ থেকে আলট্রাসনিক মিটার দিয়ে ঐসব গভীর নলকূপের উৎপাদন রিডিং নিয়ে থাকি। সুতরাং এতে ভুল বুঝাবুঝর কোন অবকাশ নেই।’’ তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তেরাজস্ব বিভাগের ১ কর্মকর্তা আক্ষেপ করে সিটিজি টাইমসকে বলেন, ‘‘এইসব মুখস্ত বুলি, যা আজ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করেনি প্রকৌশল বিভাগ। মূলত ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করতেই প্রকৌশল বিভাগ বিভিন্ন সময় নানা ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে থাকেন। এতই যদি প্রকৌশল বিভাগ নিজেদের কাজের ব্যাপারে সচ্ছতা দেখাতে চান, তবে বছরের পর বছর কেন গভীর নলকূপের মিটারগুলো ঠিক করছেন না।’’

এতোটা দিন কেন ৯০ শতাংশ নলকূপের মিটার নষ্ট, এই ব্যাপারে ওয়াসা কর্তৃপক্ষের কোন পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে রতন কুমার সরকার ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দিকে ইঙ্গিত করে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ আমি এই ব্যাপারে কিছু জানি না, উধবর্তন কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করুন।’

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ,কে,এম ফজলুল্লাহ সিটিজি টাইমসকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি অপচয় রোধ করতে। মুলত শেখ হাসিনা পানি শোধনাগার প্রকল্প থেকে ১৪ কোটি লিটার পানি আসার পরেই প্রেসারে নগরীর বিভিন্ন স্থানে পুরানো পাইপ ফেটে গিয়ে পানির অপচয় হচ্ছে যা প্রকৌশল বিভাগ মেরামত করছেন প্রতিনিয়ত।’

ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক গভীর নলকূপের অধিকংশ মিটার নষ্টের কথা জানিয়ে আরো বলেন,‘ ইতিমধ্যে এই ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে যা আগামী ৩ মাসের মধ্যে সম্পন্ন হবে। তবে যে সব নলকূপের মিটার নষ্ট সেখান থেকে আলট্্রাসনিক মিটারের মাধ্যমে রিডিং নেয়া হয় যা নিভূল’।

প্রকৌশলী এ,কে,এম ফজলুল্লাহ আরো জানান, এন.আর.ডব্লিউ কমাতে ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম ওয়াসা ঢাকা ওয়াসার ন্যায় ডিস্ট্রিক মিটারিং এরিয়া (ডি.এম.এ) স্থাপনের কাজ শুরু করেছে। আগামী ২০২০ সালের মধ্যে তা সম্পন্ন হবে। তখন এন. আর.ডাব্লিউ অনেক কমেআসবে। ’

জানা যায়, ঢাকায় যেসব এলাকায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে ডিএমএ প্রকল্প চালু হয়েছে সে সব এলাকায় এনআরডব্লিউ নেমে ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। সিংগাপুর কিংবা কম্বোডিয়ায় যেখানে এনআরডব্লিউ ৭ শতাংশের নীচে সেখানে আগামীতে চট্টগ্রাম ওয়াসার এন আর ডব্লিউ ১০ শতাংশের নীচে নেমে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ, কে,এম ফজলুল্লাহ।