চট্টগ্রাম, , শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮

‘আলু-কচু হায় শরীল-লান পঁচাই ফেলাইর’

প্রকাশ: ২০১৭-১০-০৮ ১৪:১৫:৫৮ || আপডেট: ২০১৭-১০-০৯ ০৯:১৫:১১

এম আই খলিল
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইম্‌স 

বাজার-ত আলু আর কচু ছাড়া হন তরহারি সইত্তর টেয়ার কমে নাই। আড়াই‘শ টেয়া পইজ্জন্ত বেচের তরহারি। এডিল্লা ঠসা আঁর জীবনত ন দেহি। তয় হাইয়ুম কি। আলু আর কচু হায় শরীল-লান পঁচাই ফেলাইর, এই আর কি।

(অর্থাৎ- বাজারে আলু আর কচু ছাড়া সত্ত্বর টাকার নিচে কোন তরকারি নেই। আড়াই‘শ টাকা পর্যন্ত বিক্রী হচ্ছে তরকারি। এমন অবস্থা জীবনে দেখি নাই। তাই খাব কি। আলু আর কচু খায়-খায় শরীরটা নষ্ট করছি। এই আর কি।)

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় এমনভাবে কথাগুলো বললেন সত্তরোর্ধ্ব বিধবা নারী রুপিয়া বেগম। অবিবাহিত এক কন্যা সাইমিকে নিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর পাহাড়তলি এলাকায় স্বামীর তৈরী সেমিপাকা ঘরে বসবাস করেন তিনি।

গতকাল (৭ অক্টোবার) শনিবার নগরীর পাহাড়তলি বাজারে সবজি কেনার সময় কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, বড় মেয়ে নাইমির (৩২) বিয়ে হয়ে গেছে। উপার্জনক্ষম বলতে ছোট মেয়ে সাইমি। পোশাক কারখানায় শ্রমিকের কাজ করে সে। মাসের শেষে ৯ হাজার টাকা বেতনে চলে দু‘জনের সংসার।

রুপিয়া বেগম বলেন, ৫-৬ মাস আগেও মেয়ের বেতনে সুন্দরভাবে চলত তাদের সংসার। কিন্তু এরপর চালের দাম, সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় সংসার আর ঠিকমতো চলে না। চাল কিনলে সবজি কিনতে পারি না। সবজি কিনলে মরিচ পেয়াজ তেল কিনতে পারি না।

তিনি বলেন, বাজারে চালের কেজি ৪৫ টাকার কমে নাই। পেয়াজ ৪০ টাকার উপরে। কাঁচা মরিচের কেজিও এখন ২০০ টাকা। খোলা সয়াবিন তেল ৯৯ টাকা। আর সব তরকারি ৭০ টাকার উপরে। শুধুমাত্র আলু ২০ টাকা, জলকচু ৪০ টাকা কেজিতে পাওয়া যায়। তাই ভাত খাওয়া কমিয়ে দিয়েছি। কাঁচা মরিচ, তেল-পেয়াজ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। তেল-পেয়াজ-মরিচ ছাড়া গত ৫-৬ মাস ধরে লবণ দিয়ে আলু-কচু রান্না করে খাচ্ছি। এছাড়া আর কোন উপায় নেই বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, দেশ স্বাধীনের পর দুর্ভিক্ষের সময়ও ভাতের বদলে শাক-সবজি খেতে পেয়েছি আমরা। কিন্তু এখন শাক-সবজির যা দাম তা খেয়ে বেঁচে থাকার অবস্থা আমাদের নেই। এমন অবস্থা আমার জিবনেও আর দেখি নাই।

রুপিয়া বেগমের মতো ওই কাঁচা বাজারে অনেক ক্রেতার মুখে শুনা যায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও শাকসবজির দামে কষ্ঠের হাহাকার। খেয়ে না খেয়ে বেচে থাকার হতাশা। এরমধ্যে রিকশা চালক হাবীবুর রহমান (৪৯), বেসরকারি কোম্পানীতে কর্মরত ইলিয়াস (৩৪), চট্টগ্রাম বন্দর এলাকার জুট ব্যবসায়ী দিপক বড়–য়াও (৪৬) রয়েছেন।

নগরীর কাজীর দেউরি কাঁচা বাজার ঘুরে দেখা যায় স্বল্প আয়ের মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা। অনেকে সবজির দাম শুনেই থ বনে যান। মধ্য আয়ের ক্রেতা দিদারুল আলম এ সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তরকারি দাম বৃদ্ধিতে কষ্ঠের কথা বললে বিক্রেতারা আরও হাসে। কেউ কেউ আমাদের কথা কানে নিতেও রাজী নয়।

কাজীর দেউরিসহ নগরীর সবকটি কাঁচা বাজারে গতকাল শনিবার সকালে প্রতিকেজি বেগুন বিক্রি হয় ৯০ টাকায়, কাঁকরোল ১৬০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা, ঢ়েড়স ১২০ টাকা, ফুলকপি ৩০০ টাকা, বাঁধাকপি ৮৫ টাকা, কাঁচা মরিচ ২০০ টাকা, চিচিঙ্গা ৮৫ টাকা, ঝিঙা ৮০ টাকা। একমাত্র জলকচু বিক্রী হচ্ছে ৪০ টাকা কেজিতে। আলু ২২ টাকা, তাও দেশি আলু বিক্রী হচ্ছে ৪৫ টাকা কেজিতে।

সবজির দাম বৃদ্ধি সম্পর্কে জানতে চাইলে কাজীর দেউরি কাঁচা বাজারের বিক্রেতা জয়নাল বলেন, বাজারে সবজির আমদানি হঠাৎ কমে গেছে। চাহিদার তুলনায় আমদানি কম বলে দাম বেড়ে গেছে। তবে আগামি দুয়েক সপ্তাহের মধ্যে শীতকালীন সবজি বাজারে আসলে দাম কমে যাবে।

রিয়াজ উদ্দিন পাইকারি বাজারের সবজির আড়তদার ইকবাল চৌধুরী বলেন, বৃহ¯পতিবার মহাসড়কে যানজটের কারণে মরিচের গাড়ি ঠিক সময়ে বাজারে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে খোলা বাজারে মরিচের ঘাটতি দেখা দিলে দাম বেড়ে যায়। আর বাজারে শীতকালীন সবজি আসার আগ পর্যন্ত সবজির দাম কমার সম্ভাবনা খুব একটা নেই।

এদিকে ইলিশ ধরা বন্ধের অজুহাতে বিক্রেতারা মর্জি-মাফিক বাড়িয়ে দিয়েছে সব ধরনের মাছের দামও। একটু ভাল মানের যে কোন মাছের কেজি ৬০০ টাকার উপরে। বাজারে মাঝারি সাইজের রুই বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৪০০-৫০০ টাকায়, কাতলা ৪৫০-৫৫০ টাকায়, তেলাপিয়া ১৬০-২২০ টাকায়, চিংড়ি আকার ভেদে ৫৫০-১০০০ টাকায়, লইট্যা ১৮০-২০০ টাকায় এবং পাঙাস ২৫০-৩৫০ টাকায়।

সবজি ও মাছের দাম বাড়ায় মাংসের দামও বেড়ে গেছে। কোরবানির ঈদের ৩-৪দিন আগে থেকে ব্রয়লার মুরগি কেজি প্রতি ১১৫-১২০ টাকায় বিক্রী হলেও এখন তা বেড়ে হয়েছে ১৩০-১৩৫ টাকা, পাকিস্তানি সোনালী ২৬০-২৭০টাকা, দেশি মুরগি ৩৬০-৩৯০টাকা। হাড়সহ গরুর মাংস ৬০০ এবং হাড়ছাড়া গরুর মাংস ৭০০-৭৫০ টাকায় বিক্রয় হচ্ছে।

নগরীর বহদ্দারহাটে মাসুক আহমেদ নামে এক ক্রেতা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ভাই এক হাজার টাকার বাজার করেছি। কিন্তু থলে পুরাতে পারিনি। যেমনি সবজির দাম, তেমনি মাছ-মাংসের দাম গত ৪-৫ মাসের ব্যবধানে দ্বিগুণ-তিনগুণ বেড়েছে। ৭০ টাকার নিচে কোন সবজি নেই। তিন ডগাওয়ালা এক আঁটি লাউ শাকের দামই ৪০ টাকা। ছোট একটা লাল শাকের আঁটি ৩০ টাকা। ভাল মানের যে কোন মাছ ছয়-সাতশ টাকার উপরে কেজি। এতে আমাদের মতো সীমিত আয়ের মানুষের খুব কষ্ট হচ্ছে।