চট্টগ্রাম, , বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮

টাকার নেশায় ইয়াবা পাচারে রোহিঙ্গারা

প্রকাশ: ২০১৭-১০-০৭ ১২:২৪:৪৪ || আপডেট: ২০১৭-১০-০৭ ১২:২৪:৪৪

এম আই খলিল 
প্রধান প্রতিদেক, সিটিজি টাইমস 

রাখাইনে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা টাকার নেশায় ইয়াবা পাচারের মতো অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। গত ১০-১২দিনে চট্টগ্রামের বিভিন্নস্থানে ২৬ জনেরও বেশি রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছে।

আর এ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা বাড়ছে চট্টগ্রামের পুলিশ প্রশাসনে। এমনটাই জানালেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার। তিনি বলেন, রাখাইনের ঘটনায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার আগে রোহিঙ্গারা এভাবে ইয়াবাসহ ধরা পড়েনি। কিন্তু বর্তমান সময়ে তা উদ্বেগজনকহারে ধরা পড়ছে।

তিনি বলেন, নির্যাতনের শিকার হওয়ায় সরকার ও দেশের জনগণ মানবিক দিক থেকে রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভুতিশীল। আর এই সুযোগটাকে কাজে লাগাচ্ছে দেশের প্রভাবশালী ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। টাকার লোভ দেখিয়ে পাচারের জন্য রোহিঙ্গাদের হাতে তুলে দিচ্ছে ইয়াবা। শুধু তাই নয়, রোহিঙ্গাদের নিয়ে মিয়ানমার থেকে কোটি টাকার ইয়াবার চালান আনতেও শুরু করেছে।

তিনি বলেন, এমনিতেই ইয়াবা ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। তার ওপর অনুপ্রবেশকারী প্রায় পাঁচলাখ রোহিঙ্গার কিছু অংশও যদি ইয়াবা পাচারে লিপ্ত হয় তাহলে মাদকের ভয়াল থাবায় বিপর্যস্ত করে দেবে যুব সমাজকে।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের শীর্ষ এই কর্মকর্তা জানান, নগরীতে গত ১০-১২ দিনে ইয়াবাসহ ধরা পড়েছে ২৬-২৭জন রোহিঙ্গা। পুরুষের পাশপাশি এরমধ্যে রোহিঙ্গা নারীও রয়েছেন। তাদের কাছে উদ্ধার করা হয়েছে আট লাখ উনিশ হাজার ইয়াবা। যার মূল্য ৫০ কোটি টাকারও বেশি।

এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজারের গভীর সমুদ্রে একটি মাছ ধরার ট্রলার থেকে আট লাখ ইয়াবাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-৭ এর কর্মকর্তারা। উদ্ধার করা এসব ইয়াবার বাজার মুল্যও ৪০ কোটি টাকা বলে জানান র‌্যাব-৭ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মিমতানুর রহমান।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা জানান, নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গারা সর্বস্ব হারিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। টাকার অভাবে কাজের সন্ধানে তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় কম সময়ে বেশি আয়ের সুযোগ থাকায় ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও রোহিঙ্গারা ইয়াবা পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে মাদক ব্যবসায়ীরা রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ও দিচ্ছে। তবে ইয়াবা পাচার করতে গিয়ে রোহিঙ্গারা ধরা পড়লেও মূল হোতারা দৃশ্যত ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

র‌্যাব-৭ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মিমতানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের একটি অংশ কক্সবাজার থেকে প্রতিদিন মিয়ানমারে প্রবেশ করে কোটি টাকার ইয়াবার চালান নিয়ে আসছে। আরেকটি অংশ চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ইয়াবা পাচারের কাজে সক্রিয় রয়েছে। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক থাকায় ইয়াবাসহ রোহিঙ্গারা ধরা পড়ছে।

শুধু র‌্যাবের হাতে রোহিঙ্গা ইয়াবা পাচারকারী ধরা পড়েছে তা নয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুন্ডের সোনাইছড়ি এলাকায় ঢাকাগামী শ্যামলী পরিবহনে তল্লাশি চালিয়ে ৫ হাজার ইয়াবাসহ দুই রোহিঙ্গা যুবককে গ্রেপ্তার করে হাইওয়ে পুলিশ।

এর আগে আলাদা চার দফা অভিযানে ১৩ রোহিঙ্গা নারী পুরুষ মাদক বহনকারীকে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম মেট্রো উপ-অঞ্চলের সদস্যরা। নগরীর কোতোয়ালী থানার ফিরিঙ্গি বাজার ও নিউ মার্কেট মোড় ও বাকলিয়া থেকে ইয়াবাসহ তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামীম আহমেদ।

এছাড়া টেকনাফ ও বান্দরবান সীমান্তে গত কয়েকদিনে বেশ কয়েকটি বড় বড় ইয়াবার চালান আটক করেছে বিজিবি। এর সাথে জড়িত কয়েকজন রোহিঙ্গাও আইন-শৃংখলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন। ফলে বিজিবি থেকে নিয়ে র‌্যাব ও পুলিশ প্রশাসনে উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা বাড়ছে বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে র‌্যাব-৭ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মিমতানুর রহমান বলেন, ইয়াবাসহ নানা অপরাধ দমনে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে সীমাবদ্ধ রাখার কাজ চলছে। ক্যাম্পের বাইরে যেখানেই তারা ধরা পড়ছে সেখান থেকে ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তাছাড়া রোহিঙ্গাদের উপর র‌্যাব বিশেষ নজরদারি করছেও বলে জানান তিনি।

একইভাবে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার ইকবাল বাহার বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রতি আমরা যতই মানবিক হয় না কেন, তা ক্যাম্পের মধ্যে। ক্যাম্পের বাইরে পাওয়া গেলে তাদের প্রতি কোনো মানবিকতা থাকবে না। তাছাড়া ইয়াবা পাচারে জড়িতদের আবশ্যই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ইয়াবা পাচারে এমনিতেই পুলিশের ব্যাপক নজরদারি রয়েছে। ইয়াবা পাচারে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ জড়িত থাকার হার বাড়ায় পুলিশের নজরদারি আরো বাড়ানো হয়েছে। শুধু রোহিঙ্গা নয়, ইয়াবা যার কাছে থাকবে পুলিশের চোখ তার উপর পড়বে। গত ১০-১২ দিনে ইয়াবাসহ রোহিঙ্গা গ্রেপ্তারে তারই প্রমাণ মেলে।