চট্টগ্রাম, , বৃহস্পতিবার, ২২ নভেম্বর ২০১৮

“উখিয়ার জনপদে কাঁদছে নির্যাতিত রোহিঙ্গা মানবতা”

প্রকাশ: ২০১৭-১০-০৪ ১২:২১:৪৭ || আপডেট: ২০১৭-১০-০৪ ১৫:০১:০৫

আব্দুল মান্নান

নব্য হিটলার সুচির সেনাবাহিনীর নির্যাতনের স্বীকার বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া উখিয়ার জনপদে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের উপর নির্মম নির্যাতনের চিত্র দেখে আমি অবাক! আমি বাকরুদ্ধ! আমি বিস্মিত! উখিয়ার জনপদ যেন আজ ভয়ঙ্কর জাহেলি যুগকেও হার মানিয়েছে। আমি জাহেলি যুগের বর্বর নির্যাতনের চিত্র দেখিনি, দেখেছি উখিয়াতে অবস্থানরত রাখাইন রাজ্যে নির্যাতিত নিষ্পেষিত নিপীড়িত রোহিঙ্গা নির্যাতনের ভয়ঙ্কর রূপ। কি অমানবিক! দেখলেই যেন শরীরের লোম শিহরিত হয়। নিষ্পাপ শিশুর আর্তনাদ, নির্যাতিত যুবতীর বোবা কান্না, নির্বাক হয়ে বসে থাকা বেকার যুবকের হাহাকার, ক্ষুধার্ত মায়ের আহাজারি আর পিপাসার্ত শিশুর হৃদয় বিদারক অশ্রুসজল কান্না যেন কক্সবাজার উখিয়ার আকাশ-বাতাস-তরুলতাকে নিস্তব্ধ করে রেখেছে। পাহাড়ের পাদদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বসবাস আমাকে বিস্মিত করেছে। কি করে সম্ভব এমন মানবেতর জীবন যাপন? কয়েক দিন আগেও যাদের দয়াতে অসহায়দের মুখে হাসি ফুটতো তাদের মুখ যেন আজ গম্ভীর! যে হাতে তাদের দানের টাকা বিলিয়ে দিতো গরীব দুঃখী অসহায়দের মাঝে সেই হাতে নিতে হচ্ছে বেঁচে থাকার জন্য ভিনদেশি করুণা।

রাখাইন রাজ্যে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বিতরণের এক ফাঁকে কক্সবাজার জেলা উখিয়ার থাইংখালী জামতলী ক্যাম্পে ঘুরে দেখার সুযোগ হয়। দৃষ্টি পড়ল পাহাড় কেটে আশ্রয় নেওয়া এক অনাথ শিশুর দিকে। শিশুটির কাছে না যেথেই যেন আমার চোখ অশ্রুসিক্ত! মাথায় হাত রেখে বসে আছে ছোট এক দোকানের পাশে! জিজ্ঞেস করলাম নাম কি তোমার? গম্ভীর অন্ধকার মুখে যেন বলতেই চাই না! মাথায় হাত রেখে বললাম ‘তোর নাম কি? বলল- আল আমিন’ তারসাথে একটু কথা বলে যা বুঝলাম, শিশুটির বাবা-মা সবাই ছিল। দুই বোনের একমাত্র ভাই তিনি! একদম নিঃস্ব হয়ে কোন রকম নাফ নদী পার হয়ে প্রাণে বেঁচে সীমান্ত পার করল। সে জানে না তার বাবা-মা, বোন বা আত্মীয় স্বজন কোথায় আছে! শুধু জানে চেহেরা চিহ্নিত আশ্রয় নেওয়া এলাকার এক চাচির কথা! বর্তমানে সেই চাচির সাথেই আছে। আরেক আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জমিরের মায়ের কথা মনে পড়লে যেন মনটা এখনও ক্রন্দিত হয়। নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে তুলে নিয়ে যেথে দেখেছে তার স্বামীকে। সেই দৃশ্য দেখে দেড় বছরের জমিরকে নিয়ে বৈরী আবহাওয়া ঝড়ের সাথে যুদ্ধ করে রাখাইন সীমান্ত পার হয়ে তিনদিন পর আশ্রয় নিয়েছে জমিরের মা জামতলী ক্যাম্পে। আমি একটু আদর আর ভালোবাসা দিয়ে জমিরের গায়ে হাত দিলাম। হাত দিতেই যেন মনে হলো গরমে হাতটা পুড়ে যাচ্ছে! ডাক্তার দেখানোটা যেন জরুরী হয়ে গেছে। ছোট্ট শিশু জমিরের চেহারাটা যেন মলিন হয়ে আছে। গত তিনদিন মায়ের দুধ তো দুরের কথা পানিও বুঝি তার পেঠে পড়েনি। আমার পকেটে হাত দিয়ে দেখি চকলেট! চকলেটটা শিশুটির হাতে দিতেই যেন শিশু আর মায়ের গম্ভীর মুখ খানা হাসিতে ভরপুর। এরকম শুধু আল-আমিন না, শুধু জমির আর জমিরের মা না, হাজার হাজার আল-আমিন, জমির আর জমিরের মায়ের মতো অসহায় মা-শিশু উখিয়ার জনপদে মাথায় হাত রেখে বসে আছে অশ্রুসিক্ত নয়নে। আমি দেখেছি রোহিঙ্গাদের কে দুই হাত বাড়িয়ে দিতে প্যান্ট সুট পরিহিত ভদ্রজনের দিকে, ক্ষুধার্ত শিশু সাহেবের পিছু হাটে কিছু পাওয়ার আশায়! ত্রাণবাহি গাড়ী দেখলেই রোহিঙ্গা মিছিল করে খাবারের আশায়। এখনও হাজার হাজার রোহিঙ্গার বাসস্থান নেই। নেই প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসা ব্যবস্থা। রাস্তার ধারে, পাহাড়ের নিশ্চুপ গহীন জঙ্গলে বা ক্যাম্পের চারপাশে মাথা গুজার ঠাঁই নিতে অপেক্ষারত। তারা এখনও এক মুঠো ভাত পেতে অপলকে চেয়ে আছে বিশ্ব মানবতার দরবারে। এভাবেই প্রতিনিয়ত দুঃখে নিরবে উখিয়ার জনপদে কাঁদছে রোহিঙ্গা মানবতা!

বর্তমান সময়ে বিশ্বের দিকে তাকালে দেখতে পাবেন সবচেয়ে নির্যাতিত সম্প্রদায়ের মধ্যে রোহিঙ্গা সম্প্রদায় নির্যাতন সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে গেছে। যারা প্রাণ বাঁচাতে নিজ দেশে পর্যন্ত থাকতে পারছে না। নব্য হিটলার সুচির সেনাবাহিনী দ্বারা হাজার হাজার রোহিঙ্গা হত্যা করে সন্ত্রাসী হত্যার নামে বিশ্বের দরবারে সাধু সাজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সন্তানের সামনে বাবাকে হত্যা করা হচ্ছে, স্ত্রীর সামনে স্বামীকে গলা কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হচ্ছে, মায়ের সামনে মেয়ের ধর্ষণ যেন তাদের কাছে কিছুই না, যুবতী মেয়েকে ধর্ষণের পর আগুনে পুড়ে হত্যা করা হচ্ছে। এবর্বর নির্যাতনের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে জাতিগত ভাবে নিধন করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা শিশুর বুক ফাটা কান্না, বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের নির্যাতনের স্টীম রোলার, নাফ নদীতে রোহিঙ্গার রক্তে রঞ্জিত পানি দেখেও কি বিশ্ব মানবতার বিবেক জাগ্রত হবে না?

এমন পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় হলো রোহিঙ্গাদের সমস্যা আন্তর্জাতিক ভাবে স্থায়ী সমাধান করে তাদের বসত-বাড়ি ফিরিয়ে দিতে উপযোক্ত ভূমিকা রাখতে হবে। মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে সন্ত্রাসী নিধনের নামে রোহিঙ্গা নিধন বন্ধ করতে জাতিসংগে প্রস্তাব রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক ভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শুধু এব্যাপারে সরকারের যেমন ভুমিকা রাখতে হবে তেমনি করে স্যোসাল মিডিয়া, মানবাধিকার কর্মী ও সুশীল সমাজসহ সর্বসাধারণকেও এগিয়ে আসতে হবে। দলমত নির্বিশেষে সকল রাজনৈতিক দলকে রাখাইনে গণহত্যার প্রতিবাদে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করতে হবে। মানবাধিকার সংরক্ষিত সংগঠনে নিয়োজিত ব্যক্তিকে আরও সোচ্চার হতে হবে। আন্তর্জাতিক ভাবে স্যোসাল মিডিয়াতে গণহত্যার তথা রোহিঙ্গা নির্যাতনের খবর প্রকাশ করতে হবে। সর্বোপরি রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে হবে।

লেখক:  বিএসএস (অর্থনীতি), জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। amannan1993@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সিটিজি টাইমস -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই সময়ের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখার জন্য সিটিজি টাইমস কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।