চট্টগ্রাম, , বৃহস্পতিবার, ১৬ আগস্ট ২০১৮

চট্টগ্রামের সেই শীর্ষ ডাকাত বাইশ্যা এখন পেশাদার মৎস্যজীবি

প্রকাশ: ২০১৭-০৯-০১ ০০:০৫:৪২ || আপডেট: ২০১৭-০৯-০১ ০০:০৯:০৬

সাঈফী আনোয়ারুল আজিম

আবদুল হাকিম বাদশা । প্রকাশ বাইশ্যা ডাকাত। দেশবাসীর কাছে এক আলোচিত সমালোচিত নাম। সাধারণ মানুষের কাছে যার পরিচয় ছিলো একজন ভয়ংকর ডাকাত। যার নাম শুনলে প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষ ভয়ে চমকে উঠতো , উপকূলের মানুষের কাছে যে নামটি ছিলো বড় আতংকের । সে ভয়ংকর লোকটির এখন কি অবস্থা । কিভাবে কাটছে তার দিনকাল ! তা দেখেতে গতকাল আবদুল হাকিম বাদশার গ্রামের বাড়ি বাঁশখালী উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নের খুদুকখালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বাইশ্যা ডাকাত সাগরে মাছ ধরার জন্য বেড়িবাঁধের উপর কারেন্ট জাল সেলাই করছে। তার সাথে রয়েছে আরো কয়েকজন মৎস্যজীবি। তিনি এখন একজন পেশাদার মৎস্যজীবি হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সাংবাদিকদের দেখামাত্র তিনি এগিয়ে এসে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। কিন্তু বাড়িতে গিয়ে দুই তিনজন মানুষকে বসতে দেয়ারমতো আসবাব পত্র তার ঘরে ছিলনা। পাশের বাড়ি থেকে ২টি প্লাসিটিকের চেয়ার ও মোড়া এনে সাংবাদিকদের বসতে দেন।

নিজ ঘরে দীর্ঘ আলাপকালে বাদশা জানান, এক সময় আমার নাম শুনলে সবাই ভয়ে শিউরে উঠতো। প্রশাসন জানতো আমি এক মস্তবড়ো ডাকাত। আমার নাম শুনলেই উপকূলের মানুষের ঘুম হতোনা ! আমি সেই বাইশ্যা ডাকাত। আপনারা আমার বাড়িতে এসেছেন , অথচ আপনাদেরকে আজ বসার জায়গাটাও দিতে পারছিনা।
বাইশ্যা বলেন, আসলে আমাকে ডাকাত বানানো হয়েছে। আমি কখনো পেশাদার ডাকাত ছিলাম না।

আব্দুল হাকিম বলেন, আমাদের বাড়ির পাশের সাগরচরের দখলকে কেন্দ্র করে আমার প্রতিপক্ষের লোকজন আমাকে ডাকাতের সর্দার বানিয়েছে। আমাদের নিজস্ব ঘেরে মৎস্য চাষের জায়গা দখলে নিতে আমার এলাকার প্রতিপক্ষ ষড়যন্ত্রকারী মৃত আশরাফ আলীর পুত্র কামাল উদ্দীন, ইব্রাহীমের পুত্র ছৈয়দ নুর(৫০), পুতুন আলীর পুত্র শফিক আলম(৬০) গং উঠেপড়ে লেগেছিলো। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো আমাকে এবং আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করা। তারা আমাদের ঘের দখল করতে না পেরে আমাকে ১৩টি মামলায় আসামী করেছে। আমি ডাকাত ছিলাম না, আমাকে বিভিন্ন অপকৌশলে জড়িয়ে তারা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ডাকাত বানিয়েছে। বাইশ্যা জানান, আমি আপনাদের ( মিডিয়ার) মাধ্যমে সাবাইকে বলতে চাই, বিগত সময়ে যা হবার হয়েছে, আমি কোনো অপকর্মের সাথে সম্পৃক্ত নাই। আমার মা আমাকে মাথা ধরিয়ে শপথ করিয়েছেন যাতে মারামারি ছেড়ে দেই। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর এসব কাজে জড়িত থাকবোনা।

বাইশ্যা প্রতিবেশি আহমদ উল্লাহ জানান, সে এখন সাগরে মাছ ধরার কাজ করে। তার বড়ো ছেলে হেকাবকে নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে যায়। এখন কোনো অপরাধের সাথে জড়িত নাই।

বাদশার আরেক প্রতিবেশি নুরুল আলম জানান, বাইশ্যা দীর্ঘদিন জেলে ছিলো জেল থেকে বেরিয়ে বাইশ্যা এখন মাছ ধরার কাজে নেমেছে। তিনি আরও জানান, বাইশ্যা এখন স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। সে এখন আর কোনো অপরাধের সাথে জড়িত নাই।

সূত্রমতে, বাইশ্যার বাড়ির পাশে রয়েছে বিশাল একটি সাগর চর । এ সাগর চর দখলকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি হামলা-মামলায় প্রশাসন ও জনসম্মুখে বাইশ্যার নামটি চলে আসে। প্রতিপক্ষের লোকজনের সাথে হামলা মামলায় জড়িয়ে মাত্র ৭ বছরের ব্যবধানে আবদুল হাকিম বনে যান নামকরা বাইশ্যা ডাকাত। বাইশ্যার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন থানায় ১৩টি মামলা রয়েছে। সম্প্রতি সব মামলা থেকে সে জামিনে বেরিয়ে এসেছে।

সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে বাইশ্যা আরো জানিয়েছেন, আমি তো কোনো ডাকাত ছিলাম না। আজ আমাকে ডাকাত বানিয়েছে আমার প্রতিপক্ষের লোকজন। আমার বিরুদ্ধে আমার এলাকার কিছু ব্যক্তি মিথ্যা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে নানা অপকৌশল ব্যবহার করে মিথ্যা মামলা দায়ের করে। আমার প্রতিপক্ষের লোকজন কামাল গং এই পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে পুলিশকে ম্যানেজ করে ১৩টি মিথ্যা মামলায় আমাকে ফাঁসিয়েছে। বর্তমানে আমি সবকটি মামলা থেকে জামিনে আছি। এখন কেউ যদি আমার নামে কিংবা আমাকে ব্যবহার করে ডাকাতি করে তার জন্য আমি দায়ী নই। আমি এ ব্যাপারে প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে জানিয়ে দেবো। এই ক্ষেত্রে প্রশাসনের উচিত হবে আমার ব্যাপারে উপযুক্ত তথ্যাদি প্রমাণ করা এবং কেউ যদি আমাকে জড়িয়ে বা আমার নামে খারাপ কর্মকান্ড করে থাকে তাঁকে আইনের আশ্রয়ে আনা।

সাংবাদিকদের তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আমি সাগরে মাছ ধরে নিজের সংসার চালাচ্ছি। মিথ্যা মামলায় আসামী হয়ে আমার সহায় সম্বল বিক্রি করে আজ আমি নিঃস্ব।

আবদুল হাকিমের বড় ছেলে হেকাব উদ্দিন জানায়, আমার বাবার সাথে চির শত্রুতার জেরে শেষ পর্যন্ত শত্রুরা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যে মামলা করে আমাকে জীবনের প্রথম মামলায় জড়িয়েছে। আমি যখন ৯ম শ্রেনীর ছাত্র ছিলাম তখন আমাকে ফাঁসানো হয় ডাকাতি মামলায়। আজ আমার সোনালী ছাত্রজীবন কেড়ে নিলো ষড়যন্ত্রকারীরা। আমি ছাত্রজীবন ছেড়ে দিয়ে বাবার সাথে কাজ করতে, সমুদ্রে বোট চালাতে বাধ্য হয়েছি। আমি ও আমাদের পরিবার এখন প্রায় নিঃস্ব ও অসহায়।

সাংবাদিকদেরকে তিনি আরও জানান, আপনারা স্বাক্ষী থাকবেন। আমি বর্তমানে যে কাজ করে সংসার চালাচ্ছি । সে কাজ করে যেনো দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পারি। আমি এখন সাধারণ একজন নাগরিক। আমি কষ্ট করে আমার বউ বাচ্চা নিয়ে সংসার চালাই। আমি আর কোনো অন্যায় কাজে জড়াবোনা এবং কাউকে আমার এলাকায় ডাকাতি অন্যায় কাজ করতে দেবোনা।