চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট ২০১৮

এখন শুধুই ফ্রেম !

প্রকাশ: ২০১৭-০৮-২১ ১৭:১৪:৪৭ || আপডেট: ২০১৭-০৮-২২ ১৪:১৬:১০

রবিউল হোসেন

দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রবেশ মুখ কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতুর টোল প্লাজায় টোল দিতে দাঁড়ানো অবস্থায় সিএনজি অটো রিকশাকে বাসের চাপায় মর্মান্তিক ভাবে নিহত একই পরিবারের স্বামী-স্ত্রী, দু সন্তানের দাফন ও চালকের দাহ সম্পন্ন হয়েছে।

গত শনিবার রাত পৌনে ১২টায় ঘটনাটি। নিহতরা হলেন চট্টগ্রাম নগরীর ফিরিঙ্গীবাজার ৩৩ নং ওয়ার্ড মুন্সিবাড়ী এলাকার আবু বক্করের ছেলে শেখ মোহাম্মদ সেলিম(৩৫), তার স্ত্রী বিলকিছ আকতার বৃষ্টি(৩২), মেয়ে সাবরিন(৫) ও ছেলে সাফরান(২), সিএনজি চালক কক্সবাজার দুলাহজারা এলাকার মৃত প্রসন্ন দে’র পুত্র সরোজ দে(৫৫)।

শেখ মোহাম্মদ সেলিম তার স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে নগরীর আলকরন শ্বাশুর বাড়ি থেকে কর্ণফুলী চরপাথরঘাটা ১নং ওয়ার্ড আবুল হাশেমের ভাড়াবাসা হাশীম আলতাজ মঞ্জিলে ফিরছিল। রোববার বিকেল ৩টায় নগরীর আলকরণ শেখ বাড়ীস্থ স্থানীয় মসজিদে একই পরিবারের নিহত ৪ সদস্যের জানাযা শেষে ষ্টেশন রোডস্থ বাইশ মহল্লার কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়।

অন্যদিকে একই দিন চালক সরোজ দে’কে গ্রামের বাড়িতে দাহ করা হয় বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় বাসটি জব্দ করা হলেও রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত কোন মামলা হয়নি বলে কর্ণফুলী থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। এদিকে গত শনিবার দূর্ঘটনার ঘটনায় চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে স্থানীয়দের মধ্যে। এ ধরনের ছোট বড় দূর্ঘটনা ঘটলেও টোল প্লাজা কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়।

পরিবার সূত্রে জানায়, কয়েকটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কর্ণফুলী ভাড়া বাসা থেকে সেলিম এবং তার স্ত্রী সন্তানরা গত বুধবার আলকরণ সেলিমের শ্বাশুর বাড়ি যায়। শনিবার রাতে আলকরণ থেকে কর্ণফুলী চরপাথরঘাটাস্থ ধূপপোল আবুল হাশেমের ভাড়া বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। রাত পৌনে বারটায় শাহ আমানত সেতু টোল প্লাজা এলাকায় মর্মান্তিক দূর্ঘটনার তাদের সব হারিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই মর্মান্তিক মৃত্যু হয় সবার। ঘটনার পর বিনা ময়না তদন্তে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। লাশ গুলো গতকাল রোববার সকালে নগরীর আলকরণ শেখ বাড়িস্থ বিলকিছের বাবার বাড়িতে নেয়া হলে স্বজনদের আহাজারীতে আশে পাশের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠে।

অন্যদিকে নিহত সিএনজি চালক সরোজ দে’র লাশও রোববার দুপুরে তার গ্রামের বাড়ি কক্সবাজার দুলাহজারা পৌছেছে বলে জানা গেছে। এসময় তাদের স্বজনদের আহাজারীতে আশে পাশের পরিবার নিস্তব্ধ হয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানান, শনিবার পৌনে বারটায় কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতুর টোল প্লাজা এলাকায় সংগঠিত দূর্ঘটনার ঘাতক বাসের চালক ছিল মাদকাশক্ত। সেতুর মাঝখান থেকেই বাসের চালক খুব দ্রুত গতিতে বাস চালাতে দেখে যাত্রীরা তাকে কয়েকবার সাবধান করে দেয়। তারপরও সে দ্রুত গতিতে বেপরোয়া ভাবে গাড়ি চালালে টোল প্লাজা এলাকায় গিয়ে সিএনজিকে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় ৫জনের। বাসের এক যাত্রীর বরাত দিয়ে টোল প্লাজার প্রধান নির্বাহী জহির উদ্দীন জানায়, বাসের চালককে যাত্রীরা বারংবার বলে আসছিল গাড়ী আস্তে চালাও, আস্তে চালাও। কিন্তু সে দ্রুত গতিতে আসতে গতি থামাকে না পেলে সিএনজিকে চাপা দেয়।

জহির উদ্দীন আরো বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে পটিয়া, বাঁশখালী ও লোহাগাড়া আমিরাবাদের গাড়ি গুলো বেপরোয়া ভাবে চালায়। এদের মধ্যে বেশিরভাগই রোড পার্মিট নেই বললেই চলে।

নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরীর ফিরিঙ্গীবাজার ৩৩নং ওয়ার্ড মুন্সিবাড়ী এলাকার আবু বক্করের ছেলে শেখ মোহাম্মদ সেলিমের সাথে আলকরন শেখ বাড়ী এলাকার আবদুর রশিদের মেয়ে বিলকিছ আকতার বৃষ্টির সাথে প্রেমের সম্পর্ক করে বিগত সাড়ে ছয় বছর আগে বিয়ে হয়। বিয়ের পর ফিরিঙ্গীবাজার এলাকায় কয়েক বছর থাকার পর কর্ণফুলী চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের ধূপপোল এলাকায় এসে আবুল হাশেমের ভাড়া বাসায় উঠে। সেলিম টিভি-ফ্রিজের কারিগরের কাজ করে এবং স্ত্রী বৃষ্টি স্থানীয় শাহ আমানত আইডিয়াল কেজি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। বিয়ের পর থেকে সেলিমের সঙ্গে তার পরিবারের সাথে দূরুত্ব সৃষ্টি হলে মূলত ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছে।

গত শনিবার নগরীর ফিরিঙ্গীবাজার আলকরণ এলাকা থেকে সেলিম শ্বাশুর বাড়ি থেকে দাওয়াত খেয়ে কর্ণফুলী তার ভাড়া বাসায় ফিরছিল। প্রাইভেট সিএনজি অটো রিকসা যোগে ফেরার পথে কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতুর টোল প্লাজা এলাকায় পৌছালে পেছন থেকে বেপরোয়া বাসটি এসে চাপা দিলেই সেলিমের পরিবার ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায়। নিহত বিলকিছ আকতার বৃষ্টির বাবা আবদুর রশিদ জানায়,

রোববার বিকেল ৩টায় নগরীর আলকরণস্থ স্থানীয় মসজিদের তাদের নামাজে জানাযা শেষে নগরীর ষ্টেশনরোডস্থ বাইশ মহল্লার কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়। সেলিম এবং বৃষ্টির সাথে বিগত সাড়ে ছয় বছর আগে বিয়ে হয়েছিল। গত বুধবার স্বামী সন্তানদের নিয়ে বিলকিছ নগরীর আলকরনে বাবার বাড়ি এসেছিল। বিয়ে শেষে করে শুক্রবার বাবার বাড়িতে রাত্রিযাপন করে শনিবার রাতে কর্ণফুলী চরপাথরঘাটাস্থ ভাড়া বাসায় ফিরছিল। যাওয়ার পথেই মর্মান্তিক দূর্ঘটনায় তাদের একটি পরিবার মুহূর্তেই সব হারিয়ে যায়।

তিনি বলেন, সোমবার বৃষ্টির মেয়ে সাবরিনার পরীক্ষা এবং ২০ আগস্ট ভাড়া বাসার টাকা দেয়ার কথা। মূলত এ দুটি কারনে তারা খুব দ্রুত সময়ে বাসায় ফিরে যাচ্ছিল। তা না হলে বৃষ্টির আরো কয়েকদিন বাবার বাড়িতে থাকার কথা ছিল। তাদের সাথে বিয়ে হয়েছে সাত বছর পূর্ণ হয়নি। সাত বছর শেষ না হতেই পুরিয়ে গেল তাদের সুখের সংসার। কিভাবে যে শোক কাটিয়ে উঠবো তা বুঝতে পারছি না।

এদিকে রোববার সকাল থেকে নগরীর লামার বাজার ফায়ার সার্ভিসের একটি টিম সচেতনতা রোধে প্রচারণা চালিয়ে কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু টোল প্লাজা এলাকায়। এসময় লামার বাজার ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র ষ্টেশন অফিসার হাজী মো. আবদুল মান্নান বলেন, শনিবার রাতে দূর্ঘটনার পর পর খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের টিম এসে উদ্ধার তৎপরতা চালায়। গতকাল রোববার সকাল থেকে দূর্ঘটনায় সচেতনা সৃষ্টির জন্য ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষ মনে করেন শুধুমাত্র আগুন লাগলেই ফায়ার সার্ভিস যায়। কিন্তু যে কোন দূর্ঘটনা ও প্রয়োজন মুহূর্তে ফায়ার সার্ভিস কাজ করে সেটি সাধারণ মানুষ জানে না। সামাজিক ভাবে সচেতনতা বাড়াতে এ ধরনের সচেতনতা অব্যাহত রাখা হবে বলে তিনি জানান।

অপরদিকে রোববার দুপুরে কর্ণফুলী চরপাথরঘাটাস্থ আবুল হাশেমের ভাড়া বাসা হাশীম আলতাজ মঞ্জিলে দিয়ে দেখা যায় শোকের নিরবতা। রোববার সকালেই অনেকে পত্রিকা দেখে দূর্ঘটনার খবরটি জানতে পারে। স্থানীয়রা দূর্ঘটনার খবরটি শোনে পাহাড় ভেঙ্গে পড়ার মতো অবস্থা।

হাশীম আলতাজ মঞ্জিলের এক ভাড়াটিয়া মো. হাবীব জানায়, বিগত সাড়ে তিন বছর আগে শেখ মোহাম্মদ সেলিম এখানে ভাড়া বাসায় উঠেন। সাড়ে তিন বছর এখানে অবস্থান করলেও কখনো কারো সাথে কোন ধরনের মন মালিন্য হয়নি তাদের সাথে। সেলিম টিভি-ফ্রিজের কারিগর এবং বিলকিছ আকতার স্থানীয় কেজি স্কুল শাহ আমানত আইডিয়াল-এ শিক্ষকতা করতো। প্রেমের সম্পর্ক করে বিয়ে করায় সেলিমের সাথে তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ কম ছিল। ঠিক সে কারনেই ভাড়া বাসায় থাকতো সেলিম এবং বৃষ্টি এবং তার সন্তানরা।

কর্ণফুলী থানার ওসি রফিকুল ইসলাম পিপিএম জানান, শনিবার রাতে দূর্ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে টোল প্লাজার লোকজন এবং স্থানীয়দের সহযোগিতায় লাশগুলো উদ্ধার করা হয়। বাসের চাপায় সিএনজি অটো রিকসাটি ধুমেড় মুছড়ে যাওয়ায় লাশের শরীরের গুরুত্ব জখম ও রক্তক্ষরন হওয়ায় ঘটনাস্থলেই মর্মান্তিক মৃত্যু হয় চালকসহ একই পরিবারের সকল সদস্যের। বাসটি আটক করা হলেও চালক পালতক রয়েছে। এব্যাপারে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

কর্ণফুলী থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই জাবেদুল ইসলাম জানান, লাশ বিনা ময়না তদন্তে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাসটি জব্দ করা হলেও চালক ও হেলপার পলাতক থাকায় তাদের গ্রেপ্তার করা যায়নি।