টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

সীতাকুণ্ড ট্র্যাজেডি: আগে জানলে টিকার বাক্স নিয়ে দৌড়াতাম

চট্টগ্রাম, ১৮ জুলাই ২০১৭ (সিটিজি টাইমস): এ যেন রূপকথার গল্প। একবিংশ শতাব্দীতে যখন বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার স্লোগান নিয়ে জনগণের দোড়গোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তখন চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের ত্রিপুরাপাড়ায পাহাড়ি টিলার ত্রিপুরা উপজাতিরা এখনও আদিমযুগের জীবনযাপনে অভ্যস্ত।

শুনতে বিস্ময়কর হলেও মাত্র ৮৫টি বাড়ি নিয়ে গড়ে ওঠা একটি ক্ষুদ্র উপজাতি সম্প্রদায়ের কেউ কখনও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা চোখে দেখেনি। লতাপাতা ও ঝাড়ফুঁকই তাদের একমাত্র ভরসা। শিক্ষার আলোও তাদের ঘরে পৌঁছেনি। ওরা মাটি খুঁড়ে পানি সংগ্রহ করে। প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে জীবন কাটায়। কেউ কখনও তাদের কাছে স্বাস্থ্যসেবা কিংবা অক্ষরজ্ঞান প্রদানের কর্মসূচি নিয়ে যাননি।

সম্প্রতি ওই এলাকায় নয় শিশুর মৃত্যুসহ ৮৭ জন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর এ চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। অজ্ঞাত রোগে শিশুদের আক্রান্ত হওয়া ও নয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে গণমাধ্যমকে অবহিত করতে সোমবার মহাখালী রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের উদ্যোগে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, অসুস্থ রোগীদের লক্ষণ ও ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, আক্রান্ত ও মৃত শিশুরা হাম রোগের জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হয়েছিল। তারা অপুষ্টিতে ভুগছিল। ফলে সংক্রমণ একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়েছিল। অপুষ্টির কারণে সংক্রমণ তীব্র আকার ধারণ করে। ৮৫টি বাড়ির ৩৮৮ জনের মধ্যে কেউ কখনও হামের টিকা পায়নি। আক্রান্তদের মধ্যে দুই মাসের শিশু থেকে ২০ বছরের যুবকও রয়েছে। তিনি শিশু মৃত্যুর ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘আগে জানলে টিকার বাক্স নিয়ে নিজেই দৌড়াতাম। আধুনিক চিকিৎসা পেলে শিশুদের এমন করুণ মৃত্যু হতো না।’

স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যর্থতা রয়েছে কিনা গণমাধ্যমকর্মীদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য মহাপরিচালক ও চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী শিশুদের এ মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, শুধু সাম্প্রতিক সময়েই নয়, গত ২০ বছরেও সেখানে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছেনি। কী কারণে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছেনি , স্বাস্থ্যকর্মীদের গাফিলতি রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। কারও গাফিলতি কিংবা অবহেলা থাকলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। চট্টগ্রাম বিভাগে ওয়ার্ডভিত্তিক প্ল্যান রিভিউ করে আর অন্য কোথাও কেউ স্বাস্থ্যসেবার আওতার বাইরে রয়েছে কিনা তাও খুঁজে দেখা হবে।

স্বাস্থ্য মহাপরিচালক জানান, ওই উপজাতি সম্প্রদায়ের লোকজন অন্য কোনো সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা করে না। এদের সম্প্রদায়ের নেতা থাকে এবং সাধারণত নেতার পরামর্শ, উপদেশ ও আদেশ নিষেধ সবাই মেনে চলে। আধুনিক জীবনযাত্রা এবং সরকারি প্রশাসন ও সেবা ব্যবস্থা থেকেও সম্প্রদায়ের লোকজন দূরে থাকার চেষ্টা করে। তিনি জানান, গত ৮ জুলাই পাহাড়ি টিলায় অসুস্থতার কারণে ১টি শিশু মৃত্যুবরণ করে। পরিবার ও সম্প্রদায়ের লোকজন এটি বিছিন্ন ঘটনা বলে মনে করে।

পরদিন ৯ জুলাই আরও দুটি শিশু মারা যায়। সম্প্রদায়গত সংস্কারের বশে তারা একে বালা (মসিবত) মনে করে ভীত হয়ে পড়ে এবং ওই রাতে সবাই মিলে মশাল জ্বালিয়ে বালা দূর করতে প্রার্থনা করে। ১০ জুলাই কোনো শিশু মারা না যাওয়ায় তারা মনে করে প্রার্থনা কাজে লেগেছে। কিন্তু পরবর্তী দিন ১১ জুলাই ১টি শিশু ও ১২ জুলাই একদিনেই চারটি শিশু মৃত্যুবরণ করে। বিষয়টি জানতে পারার পর থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়।

তিনি জানান, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের চেয়ে বাংলাদেশে হামের টিকা প্রদানের হার ভালো। বর্তমানে হামের টিকা প্রদানের হার শতকরা ৮৭ দশমিক ২ ভাগ, ১৯৮২ সালে যা ছিল মাত্র শতকরা ২ ভাগ। তিনি জম্মের পর নয় মাসের মধ্যে ও ১৫ মাস বয়সে নিজ নিজ শিশুকে টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে হামের টিকাসহ সরকারিভাবে দেয়া বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধক টিকা প্রদানের আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইম্যুনাইজেশন অ্যান্ড ভ্যাকসিন ডেভেলপমেন্ট (আইভিডি) মেডিকেল অফিসার ডা. স্টিফেন চাককো বলেন, বাংলাদেশে হামসহ বিভিন্ন টিকা প্রদানের হার খুবই সন্তোষজনক। ২০২০ সালের মধ্যে হামমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ কাজ করছে। ২০১৬ সালে মোট হামে ১৬৫ জন আক্রান্ত হয়েছে। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে হামে আক্রান্তের সংখ্যা যেমন থাইল্যান্ড ১ হাজার ৫৩ জন, মিয়ানমার ৮১৮ ও ভারত ১ হাজার ৫৩৬ জন। কোন দেশকে হামমুক্ত করতে হলে শতকরা ৯৫ ভাগ শিশুকে হামমুক্ত করতে হয়। বাংলাদেশ নির্দিষ্ট সময়ে লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

চট্রগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী জানান, এ ঘটনার পর তারা খোঁজ নিয়ে জেনেছেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় এ ধরনের ৭টি উপজাতি রয়েছে। তাদের মধ্যে দুটি উপজাতি এখনও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আসেনি। সংবাদ সম্মেলনে আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সাবরিনা ফ্লোরাসহ স্বাস্থ্য অধিদফতর ও আইইডিসিআরের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। – জা.নি

মতামত