টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

বিলুপ্তির পথে সাতকানিয়ার দ্বীপ চরতী

সাঙ্গু নদের ভাঙন কবলিত হাজারো অসহায় মানুষের করুন আর্তি

# আমরা অসহায়, আমরা নিঃস্ব,আমাদের বাচাঁন
# পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠিয়ে ৩৫০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে
# চলতি বছর ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভবনা নেই- জানালেন পানি উন্নয়ন বোর্ড়ের -নির্বাহী প্রকৌশলী

শহীদুল ইসলাম বাবর
সিটিজি টাইমস প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম, ১৬ জুলাই ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):   আমার এলাকার মানুষ গুলো বড়ই অসহায়, সাঙ্গুনদের ভাঙনে নিঃশ্ব হাজারো পরিবার। ভাঙনের কবল থেকে এসব অসহায় মানুষদের রক্ষায় দীর্ঘ দিন ধরে প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছি। স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ধর্ণা দিতে দিতে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোন উদ্যেগ পরিলক্ষিত হয়নি। ভাঙনরোধে সরকারের উদ্যেগের কোন অগ্রগতি দৃশ্যমন না হলেও ভাঙ্গনের গতি বেশ দৃশ্যমান। এক মাসের ব্যবধানে শুধুমাত্র চরতী ইউনিয়নেই অন্তত ৩শ পরিবার তাদের বসত ঘর হারিয়েছে। বসত ঘর হারানোর আশংকায় আরো হাজারো পরিবার। সাঙ্গুনদের ভাঙনের বিষয়ে জানতে চাইলে উপরোক্ত কথাগুলো বলছিলেন চরতীর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ডা. রেজাউল করিম। চেয়ারম্যানের কথার সাথে সুর মিলিয়ে একই কথা বলেছেন সাতকানিয়া উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও একই ইউনিয়নের দ্বীপ চরতীর বাসিন্দা রমিজ উদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেন, ভাঙনরোধকল্পে ব্লক বসানোর জন্য স্থানীয় সংসদ, পানি উন্নয়ন বোর্ড়, পরিকল্পনা কমিশন, পানি সম্পদ মন্ত্রনালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন নিবেদনের প্রেক্ষিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রফেসর ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভীর নেতৃত্বে, পানি উন্নয়ন বোর্ড় ও পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা সম্প্রতি দ্বীপ চরতীসহ বিভিন্ন এলাকা পরির্দশন করায় সহসায় ভাঙনের কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার আশা করছিলেন মানুষ। কিন্তু আশার প্রতিফলন হয়নি, বেড়েছে হতাশার চাপ। গত এক মাসে ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে গৃহহীনদের তালিকায় উঠেছে আরো অন্তত ৩শ নাম। দিনে দিনে দীর্ঘ হচ্ছে গৃহহীন মানুষের নামের তালিকা। শুধু বসত ঘর নয়, ভাঙনের কারনে সাঙ্গুর পেটে তলিয়ে গেছে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, কবরস্থান ও শত শত একর ফসলী জমি।

পানি উন্নয়ন বোড়েৃর কর্মকর্তারা বলেছেন, চট্টগ্রাম-১৫ সংসদীয় আসনের আওতাভুক্ত এলাকায় নদী ভাঙনরোধের জন্য আগে দুই বার পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তা পরিকল্পনা কমিশনের সভায় পাশ হয়নি। এই বার ওনারা(পরিকল্পনা কমিশন) কর্মকর্তারা ভাঙ্গন কবিলত এলাকা পরির্দশন করেছেন। এবং তাদের দেওয়া পরামর্শ অনুযায়ী নতুন করে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের আসন্ন সভায় তা উত্থাপন করা হবে। সেখানে পাশ হলেও উঠবে একনেকে।

চরতী ইউনিয়ন পরিষদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী জানা যায়, গত এক মাসের ব্যবধানে চরতী ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম মিলিয়ে শতাধিক বসত ঘর নদে বিলীন হয়ে গেছে। বিলীন হওয়া নদের মধ্যে বেশ কয়েকটি বড় বড় দালানও রয়েছে। ঘর হারানো ব্যাক্তিরা হলেন. দ্বীপ চরতীর মাওলানা আব্দুল হালিম, মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, মোহাম্মদ নাছির, সাবেকুর রহমান (সাবু), আবুল কাসেম, ফজলুল হক,মাওলান মোহাম্মদ ইসমাঈল, সামশুল ইসলাম, মোহম্মদ হারুন, ওসমান গনি, মোহাম্মদ ইউনুছ,আবু তাহের, মাঈনুদ্দিন, ,হাছিনা বারুন, জহুরা বেগম, জামাল আহমদ, ক্বারী মাওলানা মোহাম্মদ নোমান,মোহাম্মদ ইলিয়াছ, আবদুস সালাম, নুরুল ইসলাম, নুরুল আমিন, হাফেজ মাওলানা আবু ছালেহ, নুরুল আলম, মোজাম্মেল হক,ভাঙনের ঝুকিতে আছে বেলায়েত হোসেন সওদাগর, মোহাম্মদ ইউনুচ ও নুরুন্নবীসহ অন্তত শতাধিক পরিবার। দক্ষিণ ব্রাক্ষনডেঙ্গা এলাকায় ভাঙনে ঘর হারিয়েছে নুরুল আলম, আবু তাহের, আব্বাস উদ্দিন, উত্তর ব্রাক্ষনডেঙ্গার খোরশেদ আল, আব্বাস উদ্দিন, ফয়েজ আহমদ , ছাবের আহমদ, মধ্যম চরতীর লায়লা বেগম, মনজুর আহমদ, সোলতান আহমদ, আব্দুস সালাম, আব্দুল মতলব ও আব্দুল গফুর, চরতীর প্যানেল চেয়ারম্যান মো. সোহেল চৌধুরী জানান, দক্ষিন চরতীর হুমায়ুন কবির,আলী আহমদ, মো. ইউনুচ, মোহাম্মদ আমিন, আব্দুল করিম, আব্দুর রশিদ, মোহাম্মদ ফিরোজ, মোক্তার আহমদ, ওসমান গনি।

তুলাতলী এলাকায় সাবেকপ্যানেল চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, আহমদ হোসেন,ফরিদুল আলম, জিন্নাত আলী, আনোয়ারুল ইসলাম, মোহাম্মদ ইসহাক, আসহাব মিয়া ও মোহাম্মদ হোসেনেরবসত ঘর বিলীন হয়ে গেছে। বিলীন হওয়ার পথে রয়েছে আরো অন্তত শতাধিক বসত ঘর।

এছাড়াও নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে চরতী ইউনিয়নের দ্বীপ চরতী দক্ষিন পাড়া শাহী জামে মসজিদ,দ্বীপ চরতী ছিদ্দিকিয়া (রাঃ) এতিমখানা ও হেফজখানা। দ্বীপ চরতী আব্দুল ফকির (রাঃ)মাজার, তিনটি বড় বড় কবরস্থান সম্পূর্ণ ভাবে বিলীন হয়ে গেছে। আর বেশ কিছু অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার ফলে এ সড়কেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে রয়েছে। এছাড়াও মধ্যম চরতী পূর্ব পাড়া জামে মসজিদসহ আরো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে বিলীনের অপেক্ষায়। অপরদিকে চরতীর পার্শ্ববর্তি ইউনিয়ন আমিলাইশেও বেড়েছে ভাঙনের প্রবনতা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২ নং ওয়ার্ড়ের কৈবক্ত পাড়া, মুসলিম পাড়া,৩নং ওয়ার্ড়ের বাচা মিয়া সিকদারের বাড়ি, কবির আহমদ বাড়ি, আনু মিয়া বাড়ির বেশ কিছু বসত ঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আমিলাইশের চেয়ারম্যান গত জুনের বন্যা পরবর্তি সময়ে ৫৮ টি বসত ঘর, জুলাই জুলায়ের প্রথম সপ্তাহের বন্যায় ৩৬ টি বসত ঘর বিলীন হয়ে গেছে বলে জানান এইচ এম হানিফ।

তিনি জানান, সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকল্প কর্মকর্তা ভাঙন কবিলত এলাকা পরির্দশন করেছেন। তবে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ লোকজনকে কোন সহায়তা করা হয়নি। দ্বীপ চরতীর বাসিন্দা এযভোকেট দেলোয়ার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত বৎসর ব্যাপক আকারে ভাঙন শুরু হয়ে দ্বীপ চরতী দক্ষিণ পাড়া শাহি জামে মসজিদটিসহ শতাধিক বসত ঘর নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পর উপজেলা প্রশাসন ভাঙন কবিলত পরিবার প্রতি ৫০ কেজি করে চাল দেওয়ার ঘোষনা দিয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি।

অপরদিকে সাতকানিয়ার নলুয়া, খাগরিয়া, কালিয়াইশ, ধর্মপুর, বাজালিয়া ও পুরানগড় ইউনিয়নেও ভাঙন সমস্যা রয়েছে। অবশ্য বাজালিয়া, পুরানগড়, কালিয়াইশ ও ধর্মপুর এলাকায় ভাঙনরোধে কিছু কিছু এলাকায় ভাঙন রোধে পাথরের ব্লক বসানো হয়েছে।

ভাঙনের বিষয়ে জানতে চাইলে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ উল্যাহ বলেন, সাতকানিয়ার চরতী, আমিলাইশ, নলুয়া ইউনিয়নে ভাঙন সমস্যা প্রকট আকার ধারন করেছে। ভাঙনের চিত্র উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত ভাবে জানানো হয়েছে। একই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে পানি উন্নয়ন বোর্ড় চট্টগ্রাম অঞ্চল-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী বিদ্যুৎ কুমার শাহা বলেন, চট্টগ্রাম-১৫ আসনের আওতাধীন বেশ কিছু ইউনিয়নে সাঙ্গুনদের ভাঙনরোধ কল্পে আগে দুই বার পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠানো হলেও তা অনুমোধিত হয়নি।

এই বারে স্থানীয় সংসদ সদ্য প্রফেসর ড. আবু রেজা মোহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভী, পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ যৌধ ভাবে বাঙন কবলিত এলাকা পরির্দশন করেছে। তাদের (পরিকল্পনা কমিশনের) কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রস্তাব তৈরী করে পাঠানো হয়েছে। কমিশনের সভায় প্রস্তাবটি অনুমোধন হলে প্রস্তাবটি একনেকে উঠবে। প্রস্তাবে ২৫ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং ও ১০ কিলোমিটার পাথরের ব্লক বসিয়ে ভাঙন রোধের জন্য ৩শ ৫০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, এ বরাদ্ধ পেলেও চলতি বছরে ভাঙন রোধে কোন কিছু করার সুযোগ নেই। বর্ষা মৌসুম শেষে শুস্ক মৌসুম শুরু হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ করা যাবে।

তবে চলতি মৌসুমে সাঙ্গুগর্ভে আরো আরো বসত ঘরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিলীন হওয়ার যথেষ্ট আশংকা থাকলেও যেন কারে কিছু করার নেই।

মতামত