টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

আবারো কাঁদলো নিহতের স্বজনরা

চোখের পানিতে মিরসরাই ট্র্যাজেডী ৬ষ্ঠ বর্ষপূর্তি পালন

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই থেকে 

চট্টগ্রাম, ১১ জুলাই ২০১৭ (সিটিজি টাইমস): চোখের পানিতে আর ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করে পালন করা হলো মিরসরাই ট্র্যাজেডির ৬ষ্ঠ বর্ষ। আবারো কাঁদলো নিহতের স্বজনরা। ২০১১ সালের ১১ জুলাই মিরসরাইয়ে ঘটে যাওয়া একটি সড়ক দূর্ঘটনা কেড়ে নিল ৪৫টি তাজা প্রাণ। সেই শোক গাথা দিন ছিল গতকাল মঙ্গলবার। সকালে আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে এক শোক র‌্যালী বের করে স্কুল কর্তৃপক্ষ। শোকর‌্যালী শেষে বিভিন্ন সংগঠন নিহতদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিফলক ‘আবেগ’ ও ‘অন্তিম’এ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।

নিহত আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেনীর ছাত্র নয়ন শীতের মা নিলিমা শীল ও কাজল নাথে মা অনিতা দেবী জানান, ছেলেদের হারিয়ে তারা শোকার্ত জীবন যাপন করছেন। প্রতিদিনই তাদের কাছে ১১ জুলাই। এখনো রাতের বেলায় বিছানায় খুঁজেন ছেলেকে।

আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাফর সাদেক জানান, কথা ছিল ছাত্ররা শিক্ষকের মৃত্যু বার্ষিকী পালন করবে। কিন্তু তাদের বেলায় হলো হিতে বিপরীত। শিক্ষক হয়ে ছাত্রদের মৃত্যু বার্ষিক পালন করতে হচ্ছে। তাও একজন, দুইজন নয় ৪৫ জন।

মঙ্গলবার সকালে আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়, আবুতোরাব প্রাইমারী স্কুল, আবুতোরাব ফাজিল (স্নাতক) মাদরাসা, প্রফেসর কামালউদ্দিন চৌধুরী কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কালো ব্যাজ ধারণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কালো পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচী শুরু করে। আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের আয়োজনে আবেগ থেকে শোকর‌্যালী বের হয়ে আবুতোরাব বাজার পদক্ষিণ শেষে পুনরায় বিদ্যালয়ে এসে শেষ হয়। পরবর্তীতে আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের হল রুমে নিহতদের স্মরলে স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ডাঃ মোঃ ইসমাইল খান। বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সদস্য গোলাম সরোয়ারের উপস্থাপনায় ও সভাপতি মুহাম্মদ আজম খানের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন উপজেলা চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) ইয়াছমিন আক্তার কাকলী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়া আহমেদ সুমন, উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি শেখ আতাউর রহমান, সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী। অন্যানের মাঝে বক্তব্য রাখেন সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ফেরদৌস হোসেন আরিফ, চেয়ারম্যান কবির নিজামী, জাহাঙ্গীর হোসাইন মাস্টার, সাবেক চেয়ারম্যান শাহীনুল কাদের চৌধুরী, আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাফর সাদেক, উপজেলা স্বেচ্চাসেবকলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ হাসান। এসময় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, নিহতদের স্বজন, রাজনৈতিক নেতৃবর্গ উপস্থিত ছিলেন। স্মৃতিচারণ সভা শেষে উপজেলা আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে নিহতদের ছবি সংবলিত ক্রেস্ট নিহতদের স্বজনদের নিকট হস্তান্তর করেন।

স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’ ও ‘অন্তিম’ এ ফুলের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন উপজেলা পরিষদ, উপজেলা আওয়ামীলীগ, উপজেলা বিএনপি, উপজেলা জাসাস, আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়, মায়ানী ইউনিয়ন পরিষদ, মঘাদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ সহ বিভিন্ন সংগঠন।

স্মৃতিচারণ সভায় বক্তারা নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনার পাশাপাশি এমন দুর্ঘটনা যাতে আর কখনো না ঘটে সেজন্য সামাজিক সচেতনতার প্রতি গুরুত্ব দেন। ১১ জুলাইকে জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণার দাবী জানানো হয়।

এখনো থমকে দাঁড়ায় পথিক :
‘ডোবা’ নামের যে মৃত্যুকূপে নিমেষই ৪৫ টি সপ্নের অপমৃত্যু হয়েছে সেটির সামনে আসলে আজো থমকে দাঁড়ায় পথিক। দীর্ঘশ্বাসের ভেলায় চড়ে সেই ভয়াল ক্ষণটিতে ফিরে যায় চলতি পথের যে কোন পথিক। স্মরণ করে মর্মস্পর্শি সেই সড়ক দুর্ঘটনার মূহুর্তটিকে। মনে করার চেষ্টা করে তার চেনা মুখগুলোকে। আর সেই পথিক যদি হন নিহতের কোন আত্মীয় তাহলে তাদের দীর্ঘশ্বাসের মাত্রাটুকু বেড়ে যায় বহুগুনে। প্রিয়জনকে হারানোর স্থানটুকুর দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে একটি একটি দীর্ঘশ্বাসই তাদের সম্বল হয়ে উঠে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহসড়কের বড়তাকিয়া বাজার থেকে আবুতোরাব যাওয়ার পথে চোখে পড়বে ডোবাটি। যেখানে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ ‘অন্তিম’।

মিরসরাই ট্র্যাজেডির ষষ্ঠ বছরের পূর্ণ হওয়ায় স্মৃতিচারন করতে গিয়ে আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাফর সাদেক বলেন, দুর্ঘটনায় আমাদের স্কুলের ৩৪ জন ছাত্র আজ জীবিত থাকলে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দিতো। তাদের শূন্যতা কখনো পূরন হবার নয়। এখনো মনে হচ্ছে তারা আমার আশেপাশে ঘুরাফেরা করছে। তিনি আরো বলেন, ট্র্যাজেডির সময় তৎকালীন শিক্ষা-সচিব এসে আবুতোরাব বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করার ঘোষনা দিলেও অদ্যবদি কিছুই হয়নি। আমরা চাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় দ্রুত আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করবে। মিরসরাই স্টেডিয়ামকে মিনি স্টেডিয়াম ও প্রতিটি বিদ্যালয়ে বিআরটিসি বাস দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এছাড়া ১১ জুলাইকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ঘোষণা করার দাবী উঠলেও এখনো এটি বাস্তবায়ন হয়নি।

বিভীষিকাময় সেদিন যা ঘটেছিল :
১১ জুলাই ২০১১, সোমবার : মিরসরাই স্টেডিয়াম থেকে ফিরছিল বঙ্গবন্ধু-বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল ফাইনাল খেলা শেষে একটি পিকআপে করে বিজয়ী এবং বিজিত উভয় দলের খেলোয়াড় ও সমর্থকরা আবুতোরাব এলাকায় যাচ্ছিল। বড়তাকিয়া-আবুতোরাব সড়কের সৈদালী এলাকায় ৬০-৭০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ডোবায় উল্টে যায় মিনিট্রাকটি। যার নং চট্টমেট্রো – ড – ১১-০৩৩৭। ডোবার জল থেকে একে একে উঠে আসে লাশ আর লাশ। পরে সে লাশের রথ গিয়ে থামে পঁয়তাল্লিশে গিয়ে। অপর দিকে ছেলের মৃত্যু হয়েছে ভেবে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেলেন এক বাবা হরনাথ। সর্বশেষ ২০১১ সালের ২৪ নভেম্বর রাত ৯ টায় নয়নশীলের প্রয়ান পর্যন্ত ৪৫টি মৃত্যু গুনতে হয়। সব মিলিয়ে ৪৫ জনের প্রাণের বিনিময়ে রচিত হয় মিরসরাই ট্র্যাজেডী। এর মধ্যে আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩৪ জন, প্রাইমারী স্কুলের ৪ জন, আবুতোরাব ফাজিল মাদ্রাসার ২ জন, প্রফেসর কামালউদ্দিন চৌধুরী কলেজের ২ জন, একজন অভিভাবক ও দু’জন ফুটবলপ্রেমী মারা যায়। ৪৫ জনের মৃত্যুর ঘটনায় ৮ ডিসেম্বর চালক মো. মফিজুর রহমান ওরফে মফিজ উদ্দিনকে দুটি ধারায় মোট ৫ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেয় আদালত। ২০১৫ সালের ২৮ জুলাই সাজা শেষে জেল থেকে ছাড়া পান চালক মফিজ।

মতামত