টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মিরসরাইয়ের ৩ শ্রমিকের স্বজনদের আহাজারি থামছেনা

  • নিহতদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে চরম ক্ষোভ
  • ক্রুটিপূর্ন বয়লারের বিষয়টি মালিক পক্ষকে একাধিকবার জানানো হলেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই থেকে

চট্টগ্রাম, ০৮  জুলাই ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):  গত ৩ জুলাই সন্ধ্যায় গাজীপুরের কাশিমপুরের নয়াপাড়া এলাকায় মাল্টি ফ্যাবস লিমিটেডে বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহত মিরসরাইয়ের ৩ বয়লার শ্রমিকের স্বজনদের আহাজারী কিছুতেই থামছেনা। মালিক পক্ষ ছুটি না দেয়ায় এবারের ঈদেও বাড়ি আসতে পারেনি তারা। ৪ জুলাই রাতে একেবারেও ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন তারা! তবে জীবিত নয় মৃত লাশ হয়ে। তাও আবার ছিন্ন বিচ্ছিন্ন শরীর নিয়ে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তিকে হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে নিহতদেও স্বজনরা। একেই বলে নিয়তি,বাড়িতে যখন লাশ দাফনের প্রস্তুতি চলছে ঠিক সে মহুর্তে তাদের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয় পুলিশ। এই নিয়ে নিহতদের আত্মীয় স্বজন, এলাকাবাসী ও পুরো মিরসরাইজুড়ে ক্ষোভের আগুনে পুড়ছে মানুষ। দাবী উঠেছে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপুরণ দেয়ার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে এবং মালিক পক্ষকে আইনের আওতায় আনতে হবে। নিহতরা হলো উপজেলার জোরারগঞ্জ থানার ৭ নম্বর কাটাছরা ইউনিয়নের পূর্ব বামনসুন্দর গ্রামের ছমি মুহুরী বাড়ির মকসুদ আহম্মদের ছেলে আব্দুস সালাম (৪৮), একই ইউনিয়নের পূর্ব কাটাছরা গ্রামের আবদুল্লাহ মুন্সী বাড়ির লুৎফুল হকের ছেলে মনসুরুল হক (৪০), ৬ নম্বর ইছাখালী ইউনিয়নের জমাদার গ্রামের চৌধুরী বাড়ির নুরুল মোস্তফা চৌধুরীর ছেলে আরশাদ চৌধুরী। বৃহস্পতিবার (৬ জুলাই) সরেজমিনে নিহত তিন বয়লার শ্রমিকের বাড়িতে গিয়ে তাদের পরিবারের সদস্যদের আলাপ করলে এইসব বিষয় উঠে আসে।

৩ সন্তানকে নিয়ে কোথায় যাবেন সালামের স্ত্রী শামসুর নাহার
দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে মাল্টি ফ্যাবস লিমিটেডে বয়লার অপারেটর হিসেবে কাজ করছেন আব্দুস সালাম। সেখানে যা বেতন পায় তা দিয়ে ভালোই চলছিলো তার সংসার। ছেলেদের পড়াশোনা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত করে তারপর চাকুরী জীবন থেকে অবসর নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এবারের ঈদে মালিক পক্ষ ছুটি না দেয়ার কারণে বাড়িতে পরিবারের সাথে ঈদ করা হয়নি তার। বড় ছেলে মেহেদী হাসান এইচএসসি ফল প্রার্থী। মেজো ছেলে মাইনুল হাসান স্থানীয় বামনসুন্দর উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণীতে পড়াশোনা করেন। ছোট ছেলে নাজমুল হাসান ৪র্থ শ্রেণীতে পড়েন। আবদুস সালামের স্বপ্ন ছিলো ৩ ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন। এজন্য এইএসএসসি পরীক্ষার পর বড় ছেলেকে নিয়ে যান তার কাছে গাজীপুরে। পড়াশোনা শেষে সংসারের হাল ধরবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন তছনছ হয়ে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনায়।

এখনো ছেলে আসবে তাই রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকেন সালামের বৃদ্ধ মা মাহমুদা খাতুন। কেঁদে কেঁদে বলেন, রাস্তা দিয়ে সিএনজি যেতে লাগলে আমার মনে হয় সালাম এসেছে। সর্বশেষ রমজান মাসে তার সাথে আমার কথা হয়। ছেলেটার এমন অবস্থা হয়েছে মারা যাওয়ার পর লাশটাও ঠিকমতো লাশও দেখতে পারলাম না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তিকে হারিয়ে এখান চোখে ঘোর অন্ধকার দেখছেন সালামের স্ত্রী শামসুন নাহার। চরম অনিশ্চয়তায় তার ছেলেদের জীবন। কিভাবে তাদের লেখাপড়া করাবেন কিভাবে সংসার চালাবেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। আবদুস সালামের ছেলে মেহেদী হাসান বলেন, আমার আব্বু ঈদের ছুটিতে বাড়ি আসেনি। ঈদ শেষে আমি আব্বার কাছে যায়। ৩ জুলাই আব্বার ছুটি ছিলো। সন্ধ্যা ৬টার সময় আমি সহ বাসায় ছিলাম। হটাৎ একটি ফোন আসলে আব্বু বেরিয়ে যায়। আমি জিজ্ঞেস করলে আব্বু বলেন অফিস থেকে ফোন আসছে তাই অফিসে যাচ্ছি। যাওয়ার এক ঘন্টার পরই খবর পাই বয়লার বিস্ফোরণের। শুনে সাথে সাথে আব্বুর মোবাইলে কল দিলে মোবাইল বন্ধ পাই। দ্রুত কারখানায় গিয়ে আব্বার খোঁজ নিতে থাকি। কিন্তু কোথাও পাচ্ছিনা। মালিক পক্ষের লোকজন কোন তথ্য দিচ্ছেনা। তাঁরা কোন ধরনের সহযোগীতা করেনি। বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক ঘুরে পরে গাজীপুর সদর হাসপাতালে গিয়ে লাশ সনাক্ত করি। আমার আব্বুর শরীর থেকে মাথা সম্পুন্ন আলাদা হয়ে যায়।

ক্ষোভের সাথে সালামের ছোট ভাই আবু জাফর বলেন, একে তো আমার ভাই মারা গেছে। তার উপর উল্টো মামলা দায়ের। এটি কেমন আইন? তারা তো বয়লার অপারেটর। বয়লারে কোন ক্রুটি রয়েছে কিনা এটা দেখভাল করবে ইঞ্জিনিয়ার ও প্রতিষ্ঠানের জিএম, এজিএম। মামলা তো তাদের বিরুদ্ধে হওয়া প্রয়োজন। মালিক পক্ষকে বাঁচাতে পুলিশ আমার ভাই সহ অন্যদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে। আমার ভাই একই প্রতিষ্ঠানে ২৪ বছর ধরে ওই প্রতিষ্ঠানে বয়লার অপারেটর হিসেবে কাজ করছে। মারা যাওয়ার পর লাশ সনাক্ত করতে নুনতম সহযোগীতা করেনি মালিক পক্ষ। আমরা মামলা প্রত্যাহার ও মালিক পক্ষ থেকে ক্ষতিপুরণের জন্য জোর দাবী জানাচ্ছি।

ছেলের লাশ কাঁধে নিলেন বৃদ্ধ লুৎফুল হক
কথা ছিলো আমাকে বিদায় দেবে মনসুরুল হক। কিন্তু তার লাশ আমাকে কাঁধে বিদায় দিতে হয়েছে। এরচেয়ে ভারী আর কি হতে পারে। আমি তো মৃত্যু পথযাত্রী। কিন্তু আমার আগে এভাবে সে চলে যাবে কখনো ভাবতে পারিনি। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারি মাসে বাড়িতে এসেছিলো মুনসুর। এরপর আর দেখা হয়নি। কয়েকদিন পুর্বে মেবাইলে কথা হয়েছিলো। নিয়মিত আমার খোঁজ খবর নিতো আমার শরীর কেমন ঠিকমত ঔষুধ খাচ্ছি কিনা। এসব কথা বলার সময় হাউমাউ করে কেঁেদ ফেলেন লুৎফুল হক। এখন কে আমার খবর নিবে? কিভাবে জীবন কাটবে তার ৩ সন্তানের?

মুনসুরুল হকের চাচাতো ভাই মমতাজ উদ্দিন বলেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জন করা ব্যক্তিকে হারিয়ে তিন শিশু সন্তান নিয়ে তার স্ত্রী কিভাবে চলবে বুঝতে পারছিনা। মালিক পক্ষ থেকে ক্ষতিপুরণ তো দুরের কথা উল্টো আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। মালিক পক্ষকে বাঁচাতে পুলিশ এভাবে মৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে কম রয়েছে। তিনি অবিলম্বে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার ও মালিক পক্ষ থেকে ক্ষতিপুরনের দাবী জানান।

জানা গেছে, লুৎফুল হক কামিল পাশ করার পর দেশে ভালো চাকরী না পেয়ে বিদেশে পাড়ি জমান। সেখানে ভালো অবস্থানে না থাকায় আবার দেশে ফিরে আসেন। এরপর গত ৩ বছর পূর্বে মাল্টি ফ্যাবস লিমিটেডে বয়লার অপারেটর হিসেবে যোগ দেন। তার বড় ছেলে আব্দুল্লাহ আলম নোমান ৫ম শ্রেণীতে পড়েন। ছোট ছেলে আব্দুল্লাহ আল নিহানের বয়স ৪ বছর। একমাত্র মেয়ে নঈতা সুলতানা শারীরিক প্রতিবন্ধি।

৭ বছর অপেক্ষার পর অনাগত সন্তানের মুখ দেখা হলো আরশাদের
ইছাখালী ইউনিয়নের জমাদার গ্রামের চৌধুরী বাড়ির নুরুল মোস্তফা চৌধুরীর ৪ সন্তানের মধ্যে ছোট ছিলো আরশাদ হোসেন চৌধুরী। ৭ বছর পুর্বে বিবি ফাতেমাকে বিয়ে করে সে । এতো বছর তাদের কোন সন্তান হয়নি। ৬ মাস পূর্বে তার জীবনে সবচেয়ে খুশির সংবাদ আসে। সে বাবা হতে যাচ্ছে। তাদের সংসারে নতুন অতিথি আসছে। তার স্ত্রী এখন ৬ মাসের অন্তঃসত্ত¡া। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস অনাগত সন্তানের মুখ দেখার আগে না ফেরার দেশে চলে গেলেন আরশাদ। বিধবা হয়ে গেলো তার স্ত্রী।

আরশাদের বড় ভাই মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, প্রায় ১০ বছর যাবত ওই ফ্যাক্টরিতে বয়লার অপারেটর হিসেবে কাজ করতো আমার ভাই। গত ৩ জুলাই বয়লার বিষ্ফোরণের খবর পেয়ে দ্রুত ছুটে গিয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে খোঁজ করে অনেক কষ্টে ভাইয়ের লাশ সনাক্ত করেছি। চেহারা বিমর্ষ হয়ে যায়। দুই বছর পুর্বে আমার আম্মা মারা যাওয়ায় এতো কষ্ট পায়নি। আমার ভাই এভাবে চলে যাবে ভাবতে পারিনি। আমার ভাই খুব পরহেজগার ছিলো। ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতো।

ক্রুটিপূর্ন বয়লারের বিষয়টি মালিক পক্ষকে  একাধিকবার জানানো হলেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি
৩ জুলাই বয়লার বিস্ফোরনের ১ ঘন্টা আগে অফিস থেকে ছুটিতে যান বয়লার শ্রমিক মোহাম্মদ ইলিয়াছ। তিনি বলেন, আমি যদি ওইসময় ছুটি নিয়ে বাইরে না যেতাম আজ হয়তো আমিও মারা যেতাম। তিনি বলেন, বয়লারটি ক্রুটিপূর্ন ছিলো। বিষয়টি ইঞ্জিনিয়ার ও কোম্পানীর জিএমকে একাধিকবার অবহিত করার পরও তারা কোন ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো ক্রুটিপূর্ন বয়লার মেশিন দিয়ে কাজ করেছেন। এরপর আগেও একাধিকবার দুর্ঘটনা ঘটতে লাগছিলো। শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে গেলো। প্রাণ হারালো অনেক শ্রমিক। এর জন্য কোম্পানীর লোকজন দায়ী।
নিহত বয়লার অপারেটর আরশাদ হোসেন চৌধুরীর বড় ভাই মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, দুর্ঘটনার আশংকার কথা আমাকে একাধিকবার বলেছেন আমার ভাই। সে জানায় অনেক আতংকের মধ্যে রয়েছি। বয়লারের যে গ্যাস লাইন রয়েছে সেটি দিয়ে কম সাপ্লাই হওয়ার কারণে মোটর দিয়ে অবৈধভাবে লাইন থেকে অতিরিক্ত গ্যাস নেয়া হচ্ছে। যে কোন সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আর সেই দুর্ঘটনার বলি হয়ে চিরতরে হারিয়ে গেলো আমার ভাই। মুলত মালিক পক্ষের গাফিলতির কারণে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে।

জানা গেছে, মাল্টি ফ্যাবস নামক কারখানাটি ঈদের ছুটির পর গত মঙ্গলবার খোলার কথা ছিল। এ জন্য সোমবার থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছিল কারখানা কর্তৃপক্ষ। ওই দিন দুপুরের পর ডাইং ইউনিটের বয়লার সেকশনটি চালু করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বয়লারটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এবং যার ছাড়পত্র নবায়ন হয়নি। এ রকম অবস্থায় সেটি চালু করতে গেলে ক্রুটি দেখা দেয় এবং এ জন্য সন্ধ্যায় বয়লারের একজন অপারেটরকে বাসা থেকে কারখানায় ডেকে নেয়াও হয়। ২৫ থেকে ৩০ জন শ্রমিক সেখানে কাজ করছিলেন। সন্ধ্যায় বয়লারটির বিস্ফোরণ ঘটলে ঘটনাস্থলেই আটজন ও পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো পাঁচজন শ্রমিক মারা যান।

এদিকে নিহত শ্রমিকদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে এবং পরিবার-পরিজনদের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানান মিরসরাই উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক শিল্পপতি আলহাজ্ব শাহীদুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, কর্তৃপক্ষের চরম অব্যবস্থাপনা আড়াল করে দুর্ঘটনার দায়ভার শ্রমিকদের উপর চাপিয়ে দিতেই পুলিশকে দিয়ে এ মিথ্যা মামলা দায়ের করানো হয়েছে। তিনি অবিলম্বে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবী জানান।

নিহতদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারের দাবীতে কর্মসূচি
বয়লার বিস্ফোরণে নিহত শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রতিবাদে ও মালিক পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্থদের পরিবারগুলোকে ক্ষতিপুরণ দেয়ার দাবীতে শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছেন ঢাকায় বসবাসরত মিরসরাইয়ের বাসিন্দারা। কর্মসূচির উদ্যোক্তা সাংবাদিক নুরুল আলম জানান, নিহতদেও বিরুদ্ধে হাস্যকর মামলা প্রত্যাহার ও তাদের পরিবারকে ক্ষতিপুরণ দেয়ার দাবীতে শুক্রবার ঢাকায় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছি। আজ শনিবার বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন মিরসরাই শাখার আয়োজনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মানববন্ধন ও সমাবেশ করা হয়েছে।

মতামত