টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

অপরিকল্পিতভাবেই গড়ে উঠছে চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম, ০৫  জুলাই ২০১৭ (সিটিজি টাইমস): আধুনিক মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া কোনো নগর গড়ে উঠতে পারে না। চট্টগ্রাম মহানগরকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার জন্য প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণীত হয়েছিল। সরকারিভাবে অনুমোদনও মিলেছিল। কিন্তু শহরটি গড়ে উঠছে অপরিকল্পিকভাবে। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হলেও, এখনো নগরীটি মাস্টারপ্ল্যান-মাফিক গড়ে ওঠেনি। এই মাস্টারপ্ল্যানটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব ছিল সিডিএ, সিটি করপোরেশন, রেলওয়ে, ওয়াসা, সড়ক-জনপদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই। যে যার মতো কাজ করছে, গচ্ছা দিচ্ছে জনগণের কাড়ি কাড়ি টাকা। আর উন্নয়নের নামে চলছে লুটপাটের মহোৎসব।

অভিযোগ রয়েছে, গুটি কয়েক ব্যক্তির ইচ্ছার কাছেই মার খাচ্ছে পরিকল্পনা-মাফিক নগর হিসেবে চট্টগ্রামের গড়ে ওঠার সকল আয়োজন। তাদের কাছে উন্নয়নের নামে লুটপাটই মুখ্য বলে অভিযোগ। তাদের এসব উন্নয়নের সেøাগান মূলত নগর ধংসের নামান্তর বলেও মনে করছেন অনেকে। ওপরে হাজার কোটি টাকার অকেজো ফ্লাইওভার বানানো হয়। আর নিচে বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতায় সৃষ্ট প্লাবনে নৌকা চলে। চট্টগ্রাম শহরের রাস্তার উন্নয়নের জন্য কাক্সিক্ষত বরাদ্দ মেলে না। অথচ সহজে এসে যায় ফ্লাইওভারের টাকা।

চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য ইউএনডিপির সহায়তায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রণীত হয় মাস্টারপ্ল্যান। ১৯৯৪ সালে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘ সময় ধরে চট্টগ্রামে বিভিন্ন বিষয়ে অনুসন্ধাান চালিয়ে এ মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেন। ৯৭ সালের ৯ সেপ্টেম্ব^র প্ল্যানটি গৃহায়ন ও পূর্ত মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করার দুবছর পর এর অনুমোদন মেলে। এই মাস্টারপ্ল্যানটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব ছিল সিডিএ, সিটি করপোরেশন, রেলওয়ে, ওয়াসা, সড়ক-জনপদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকায় প্ল্যান অনুযায়ী, কোনো কাজ হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানগুলো যে যেভাবে পারছে কাজ করে যাচ্ছে। ফলে আজ নগরবাসীকে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এখন আগের প্ল্যানটি অনেকে মানতে পারছেন না। নতুন করে আবার প্ল্যান করা এবং টাকা লুটপাটের মিশনে ব্যস্ত সংশ্লিষ্টরা। সুনির্দিষ্ট প্ল্যান থাকা সত্ত্বেও অপরিকল্পিতভাবে বছরের পর বছর নগরীতে নির্মাণ করা হচ্ছে স্থাপনা, দখল করা হচ্ছে খাল-নালা।

নগর উন্নয়নের নামে সিডিএ (চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) যেসব কাজ করে যাচ্ছে, তা এলাকায় আদৌ প্রয়োজন নেই। সেসব এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে ফ্লাইওভার। প্রয়োজনের তুলনায় ব্যয় হচ্ছে দ্বিগুণ-তিনগুণ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, কমিশন আর দুর্নীতির কবলে পড়া চট্টগ্রামের উন্নয়ন যেন সরকার দেখেও দেখছে না। চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য সিডিএতে হাজার হাজার কোটি টাকার জোগান মিললেও কাক্সিক্ষত অর্থের নাগাল পায় না সিটি করপোরেশন। গত ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে নগর উন্নয়নের জন্য করপোরেশনের বাজেট ছিল ৯৮৫ কোটি টাকা। সরকার বরাদ্দ দিয়েছে মাত্র ২৫৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। বাকি টাকার জোগান আসবে কীভাবে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এদিকে, গত তিন দিনের টানা বর্ষণে নগরবাসীর মধ্যে নাভিশ্বাস উঠেছে। অনেকে ঘরে অলস সময় কাটাচ্ছেন। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ। নগরীর অর্ধেক এলাকা পানির নিচে। অনেক স্থানে চলছে নৌকা। এ অবস্থা নগরবাসী স্বাভাবিকভাবে দূষছে সিটি মেয়রকে। আর প্রায় আড়ালেই থেকে যাচ্ছে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে অপরিকল্পিত ফ্লাইওভার নির্মাণকারী সিডিএ। তারা চট্টগ্রামের জন্য করা মাস্টারপ্ল্যানটি ফাইলবন্দি করে মেয়াদ শেষ করেছে।

জানা গেছে, মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সিডিএ, সিটি করপোরেশন, ওয়াসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কেউই প্ল্যান অনুযায়ী, কাজ করছে না। সূত্র জানায়, ১৯৬১ সালে সিডিএ অর্ডিন্যান্স প্রভিশনের ভিত্তিতে সংস্থার নিয়ন্ত্রিত ২১২ বর্গমাইল এলাকার ওপর রিজিওনাল ও তৎঅর্ন্তর্ভুক্ত একশ বর্গমাইল এলাকার ওপর প্রথম মাস্টারপ্ল্যান প্রণীত হয়। তখনও প্ল্যান অনুযায়ী, কাজ হয়নি। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে বিধস্ত চট্টগ্রামকে পুনঃ বিবেচনা করে নতুন প্ল্যানের প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। ’৯২ সালে শুরু হয় কাজ। নির্ধারিত এই কাজ ’৯৭ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও রহস্যজনকভাবে তা ’৯৫ সালেই শেষ করে দেওয়া হয়। এতে ব্যয় দেখানো হয় ১২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। ইউএনডিপি ও বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক সহায়তায় ‘স্ট্রাকচারপ্ল্যান, মাস্টারপ্ল্যান ও ডিটেইলড এরিয়াপ্ল্যান ফর চিটাগাং সিটি’ নামের এ প্রকল্পের প্রণীত প্ল্যানের আওতায় বিশেষজ্ঞরা চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করেন। যাতে রয়েছে একটি স্ট্রাকচারপ্ল্যান, একটি আরবান ডেভেলপমেন্ট-প্ল্যান এবং এই দুটি প্ল্যানের সমর্থনে একটি ট্রান্সপোর্টেশন ও একটি ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান। স্ট্রাকচার প্ল্যানটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা, যার মেয়াদ ২০ বছর (১৯৯৫-২০১৫)। পরিকল্পনাটির ভৌগোলিক বিস্তৃতি ৪৪৬ বর্গমাইল, যা সিডিএর নিয়ন্ত্রণাধীন বর্তমান এলাকার গুণেরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউএনডিপির কনসালট্যান্ট বেদ প্রকাশ ’৯৮ সালে চট্টগ্রাম আসেন মাস্টারপ্ল্যানটির রিভিউ করতে। কিন্তু যখন তিনি জানলেন, এ প্ল্যানটি অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা এবং কাজই শুরু হচ্ছে না তখন তিনি চরম হতাশা ব্যক্ত করে ফিরে যান। শেষ পর্যন্ত ’৯৯ সালে প্ল্যানটির অনুমোদন মেলে। অনুমোদন মিললেও প্ল্যান অনুসারে কোনো কাজই হয়নি। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) এর রয়েছে চরম দ্বন্দ্ব। গুরুত্বপূর্ণ এই দুই প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় না থাকায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন নির্মাণকাজ চলছে অপরিকল্পিতভাবে। সিটি করপোরেশনের কোনো সিদ্ধান্ত যেমন আমলে নেয় না সিডিএ, তেমনি সিডিএকে পাত্তা দেয় না সিটি করপোরেশন। একই অবস্থা বিরাজমান অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও।

চট্টগ্রামের রাস্তাঘাটের চেহারা দেখলে বিশস করতে কষ্ট হয় এটা বন্দর নগরী। বন্দরে আসা বিদেশি নাবিক এবং বিদেশি পর্যটকরাও বিস্মিত হন রাস্তার এই হাল দেখে। বছরের পর বছর ধরে চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে লাগেনি উন্নয়নের ছোঁয়া। বর্ষা মৌসুমে নগরীর বিভিন্ন লিংক রোডগুলোর গর্ত ভরাট হয়েছে। কিন্তু ফান্ড সংকটের কারণে পুরো রাস্তা মেরামত করা হয়ে উঠে না সিটি করপোরেশনের। ফলে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। নির্বাচন এলে সংসদ সদস্য প্রার্থীরা চট্টগ্রামের উন্নয়নে গাদা গাদা প্রতিশ্রুতি দেন। পরে তারা এসব ভুলে যান। সড়ক উন্নয়নের অনেক প্রকল্প ফাইলবন্দি। নগরবাসীদের মতে, নিছক ধোঁকা দেওয়ার জন্যই সড়ক উন্নয়নের এই প্রকল্পগুলো গ্রহণ করা হয়েছিল।

সুত্র: প্রতিদিনের সংবাদ

মতামত