টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মিরসরাইয়ের পাহাড়ে কাসাবা চাষের অপার সম্ভাবনা

ভাগ্য বদলে দিয়েছে কৃষকদের

এম মাঈন উদ্দিন
সিটিজি টাইমস

চট্টগ্রাম, ০৩ জুলাই ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):  কাসাবা চাষ করে ভাগ্যের পরিবর্তন হয়ে গেছে মিরসরাইয়ের সঞ্জিত সাহা, মুক্তার সহ অনেক কৃষকের। আগে পাহাড়ে আধা, হলুদ সহ নানা ধরণের সবজি চাষ করলেও তাতে বিক্রির আয়ের চেয়ে উৎপাদনে ব্যয় বেশী হতো। তাছাড়া সব সময় ভালো দামও পাওয়া যেতো না। রোগ প্রতিরোধে কীটনাশকে খরচ হতো বেশী। তাই এখন অল্প পুঁজি দিয়ে চাষ করেন কাসাবা। যাতে উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভ বেশী হয়। মিরসরাইয়ের করেরহাট ইউনিয়নের ঘেড়ামারা এলাকায় এবছর প্রায় দুইশ একর পাহাড়ে চাষ করা হয়েছে কাসাবা। এটি দেখতে শিমুল গাছের মত। মাটিরে ভেতর হয় কাসাবা। উচ্চ শর্করা সমৃদ্ধ কাসাবা হচ্ছে কন্দ জাতীয় ফসল। বৈজ্ঞানিক ভাষায় এটির নাম কাসাবা হলেও মিরসরাইয়ে এটি কাঠ আলু নামে পরিচিত। সব ধরণের জমিতে কাসাবা চাষ করা গেলেও পাহাড়ে এটির ফলন বেশী হয়। লাভজনক হওয়ায় কাসাবা চাষে ঝুঁকছে মিরসরাইয়ের কৃষকরা।

কাসাবা চাষী সঞ্জিত সাহা বলেন, বর্ষা মৌসুমে কাসাবা রোপণ করা হয়। কাসাবার বংশবিস্তার সাধারণত স্টেম কাটিংয়ের মাধ্যমে করা হয় ৮ থেকে ১২ মাস বয়সের মধ্যে। এটি ৫ থেকে ৮ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। বিগত দশ বছর যাবৎ আমি এটি চাষ করে আসছি। এবছর ৬ একর জমিতে কাসাবা চাষ করেছি। দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ৪০-৫০ টনের মতো কাসাব হবে। এক বছরের মধ্যে কাসাবা বিক্রির উপযোগী হয়ে যায়। প্রতি টন কাসাবা ৮ হাজার টাকা ধরে বিক্রি করি।

তিনি আরো বলেন, তার দেখাদেখি এখন করেরহাটে প্রায় দুইশ একর পাহাড়ে কাসাবা চাষ করা হয়েছে। অল্পপুঁজিতে লাভজনক বিকল্পখাদ্য কাসাবা সম্পর্কে তৃণমূল পর্যায়ে কৃষকদের বুঝাতে পারলে কৃষকদের মাঝে আগ্রহের সৃষ্টি হবে। কাসাবা বিক্রির উপযোগী হলে প্রাণ, স্কয়ার সহ বড় বড় কোম্পানীর লোকেরা এসে এটি ক্ষেত থেকে কিনে নিয়ে যায় বলে জানান তিনি। এতে করে এটি বিক্রির জন্য বাজারে নেওয়া লাগে না। শুধু সঞ্জিত নয় তার মতো অনেক কৃষকের ভাগ্য বদলে দিয়েছে কাসাবা।

জানা গেছে, প্রায় ১২ থেকে ১৪ বছর পূর্বে ঘেড়ামারা এলাকায় এক ব্যক্তি বিদেশ থেকে কাসবার বীজ নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে তিনি করেরহাট এলাকায় এটির চাষ শুরু করেন। কাসাবা বিক্রির উপযোগী হলে তিনি ঢাকায় অবস্থিত রহমান কেমিক্যাল নামের একটি কারখানায় সেগুলো সরবরাহ করতেন। তখন রহমান কেমিক্যাল স্থানীয় কৃষকদের বীজ সরবরাহ করত। আর এভাবে পরিচিত হয়ে উঠতে থাকে ঘেড়ামারা পাহাড়ে কাসাবা।

কাসাবা চাষি মুক্তার বলেন, বর্তমানে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান প্রাণ, স্কয়ার গ্রæপ আমাদের উন্নতমানের হাইব্রিড বীজ দেয়। তিনি আরো বলেন, কাসাবা কী সেটা এখনও অনেকেই জানে না। স্থানীয়রা ফলটি সম্পর্কে তেমন অবগত নয়। অথচ বড় বড় কোম্পানীগুলো কাসাবা নিয়ে গøুকোজ, চিপস বানাচ্ছে ও ওষুধের কাঁচামালও তৈরি করছে। রহমান কেমিক্যাল ও প্রাণ কোম্পানি বর্তমানে এখানকার উৎপাদিত কাসাবা কিনে নিয়ে যায় বলে তিনি জানান।

কয়েকজন কৃষক বলেন, সরকারিভাবে কেউ এখনও কাসাবা চাষে আমাদেরকে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা করছে না। উপজেলা কৃষি স¤প্রসারণ বিভাগের কোনো কর্মকর্তা বা মাঠ পর্যায়ের অফিসারদেরও আমাদের এলাকায় দেখিনি। কাসাবার রোগ নির্ণয় ও নিরাময়ের জন্য বড় বড় কোম্পানীগুলো আমাদের বিভিন্ন সময় পরামর্শ দেন।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের ঘেড়ামারা এলাকায় তপ্ত দুপুরে পাহাড়ে কাসাবা গাছের গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করছেন শ্রমিকরা। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে এর চাষাবাদ হয়ে আসলেও মিরসরাইতে শুধু করেরহাট ইউনিয়নের এর চাষবাদ লক্ষ্য করা গেছে। কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কাসাবা চাষে উৎপাদন খরচ কম ও ফলন বেশি হয়। অর্ধশতাধিক নারী পুরুষ কাসাবা গাছের গোড়ার মাটি কোদাল দিয়ে আলগা করে দিচ্ছেন। যাতে মাটি জুরজুরে (ফুরফুরে) হয়। ফলে নরম মাটিতে কাসাবার ফলন বেশী হয়। কৃষকরা বলেন অল্প পরিশ্রমে অধিক ফসল পাওয়া যায় বিধায় কাসাবা চাষ বেশী করছেন তারা। মোটা শেকড়ের মত মূলই হচ্ছে কাসাবা। এটি কাঁচা খাওয়া যায়। কাঁচা খেতে এটি পানি যুক্ত এবং আঁশ যাতীয়। দেখতে অনেকটা শিমুল গাছের মতো। উপরের চামড়া আলাদা করে এটি খাওয়া যায়। আলুর মতো মাটির তলে ফল আসে কাসাবার। ফলন শুরু হওয়ার পর সারা বছরই মাটি খুঁড়ে কাসাবা সংগ্রহ করা যায়। একটি গাছ কমপক্ষে ৩ বছর ফলন দেয়, আবার গাছের পুষ্ট ডাল থেকে বীজ তৈরি করে খুব অল্প দিনেই গড়ে তোলা সম্ভব কাসাবার বাগান। বর্ষা মৌসুমে মাটিতে যখন আদ্রতা থাকে তখন কাসাবার চারা রোপন করা হয়। মিরসরাই ছাড়াও ফটিকছড়ি উপজেলার হেঁয়াকো, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানিকছড়ি ও মধুপুরে কাসাবার চাষ করা হয় বলে জানা যায়।

জানা গেছে, কাসাবা হলো মূল জাতীয় খাদ্য। এটি গোল আলু, মিষ্টি আলু, মেটে আলুর মতো। এটি শক্তি ও তাপ উৎপাদন করে শরীরকে সতেজ ও কর্মক্ষম রাখে। শরীরের অভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকর্ম যেমনঃ শ্বাসপ্রশ্বাস ক্রিয়া, হৃৎপিন্ড ও অন্যান্য দেহ যন্ত্রের ক্রিয়া, পরিপাক ক্রিয়া, মলমূত্র নিষ্কাষণ ক্রিয়া এবং দৈনন্দিন জীবনে সকল কাজকর্ম সম্পাদনে শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্ভাবনাময় ফসল কাসাবা হতে পারে দেশের অন্যতম খাদ্য। পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য ফসলের একটি হচ্ছে এই কাসাবা। খরাপ্রবণ অঞ্চলের জন্য এর আবাদের উপযোগিতা ধরা হলেও মূলত যেকোন মাটিতেই এর আবাদ সম্ভব। কাসাবার মূল মূলত খাদ্য উপাদান হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হলেও এর পাতা, কান্ড সবই খাদ্য উপযোগী। কাসাবা গাছের পাতার প্রোটিন এবং ডিমের প্রোটিনের মান সমান। কাসাবা চাষ বাণিজ্যিকভাবে স¤প্রসারণ করতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারবে। আফ্রিকার দেশ সমূহে কাসাবা খাদ্য হিসেবে বেশী ব্যবহার করা হয়। এটি একটি লাভজনক চাষাবাদ।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বুলবুল আহমেদ বলেন, কাসাবায় রয়েছে বিভিন্ন পুষ্টিগুণ। উচ্চ ক্যলোরিযুক্ত কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ ফসল এই কাসাবা। কাসাবা থেকে উন্নতমানের সাদা আটা পাওয়া যায় যা দিয়ে রুটি, বিস্কুট, চিপস, গøুকোজ সহ নানাবিধ খাদ্য তৈরি করা যায়। এছাড়া শাগু, বিয়ার, পোলট্রিফিড, বস্ত্র ও কাগজ তৈরির শিল্পে প্রচুর কাসাবা ব্যবহার হয়।

তিনি আরো বলেন, কাসাবায় সধারণত হোয়াইড গ্রাব, নেমাটোড, উঁই পোকা এবং ইঁদুর আক্রমণ বেশী করে। সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করে ওষুধ ব্যবহার করলে এ সব রোগ ও পোকা দমন করা যায় সহজে। করেরহাটের ঘেড়ামারায় কাসাবা চাষি কৃষকদের নিয়মিত কৃষি পরামর্শ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

মতামত