টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

জীবন হাতে নিয়ে পার্বত্য অঞ্চলে যেভাবে কাজ করে সেনাবাহিনী

চট্টগ্রাম, ১৬ জুন ২০১৭ (সিটিজি টাইমস)::  ‘সমরে আমরা, শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা দেশের তরে’ শ্লোগানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রতিনিয়ত নিয়োজিত রয়েছে দেশগঠন এবং শান্তি রক্ষার কাজে। সন্মুখ সমরের জন্য গঠিত এই বাহিনী দেশের যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। দেশের সীমানা পেরিয়ে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে গিয়েও সুনাম কুড়ানো এই বাহিনীর সদস্যরা দেশের শান্তি রক্ষায় বা দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে থাকেন, নিহতও হন অনেকেই।

গত কয়েকদিনে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে স্মরণকালের ভয়াবহতম ভুমিধসে প্রায় দেড় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ২ সেনা কর্মকর্তাসহ ৫ জন সেনাসদস্য। দুর্গতদের উদ্ধারকাজে গিয়ে নিহত হয়েছেন তারা।

পার্বত্য অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করা সেনা সদস্যদের জন্য আসলে কতটা কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ, তা জানতে কথা বলেছে একসময়ে পার্বত্য অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করা সেনাবাহিনীর বর্তমান ও সাবেক একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব:) আবদুর রশীদ বলেন: পার্বত্য অঞ্চলে কাজ করলে সবসময়ই জীবনের ঝুঁকি থাকে। বিভিন্ন রোগ-বালাই ছাড়াও বিষাক্ত পোকামাকড় এবং সাপের ভয় থাকে। দেখা গেল আপনি জুতা খুলে বসেছেন কিন্তু সে জুতোর ভেতরে সাপ ঢুকে বসে আছে!

বাংলাদেশের পাহাড়গুলো নরম মাটির হওয়ায় এখানে ঝুঁকির পরিমান আরও বেশি উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন: পাহাড়গুলো নরম মাটির হওয়ায় দুই ধরণের ঝুঁকি। ভারি বৃষ্টি হলেই তা যেকোন সময় ধসে পড়তে পারে। কিন্তু কখন যে ধসে পড়বে তা কেউ বলতে পারে না। এছাড়া অল্প বৃষ্টিতেও চলাচল করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ওই সময় পাহাড়ে হাঁটতে গেলে পায়ের সঙ্গে মাটি উঠে এসে যে কোন সময় পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। আর পড়ে গেলে ঠিক কত উঁচু পাহার থেকে পড়ছেন তার ওপর নির্ভর করে আপনি বাঁচবেন না মরবেন।

‘পার্বত্য অঞ্চলে সেলিব্রাল ম্যালেরিয়া নামক একটি রোগের প্রকোপ আছে । যে রোগে আক্রান্ত হলে মৃত্যু প্রায় অবধারিত হয়ে পড়ে।’

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বলেন: পার্বত্য অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করা আমাদের জন্য অনেক সময়ই কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে। আশির দশকের শুরু থেকেই শান্তি-বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, ম্যালেরিয়া, সড়ক দুর্ঘটনাসহ নানা দুর্যোগের সময় আমাদের অনেক সদস্যকে প্রাণ দিতে হয়েছে।

তবে গত কয়েকদিনের পাহাড় ধসে সাধারণ মানুষসহ যত সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন এর আগে কখনও এমনটি ঘটেনি বলেও জানান তিনি।

পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম কিছু এলাকার বর্ণনা তুলে ধরে তিনি বলেন: রাঙামাটির আসাম বস্তি, বান্দরবানের রুমার কিছু এলাকা রয়েছে যেসব এলাকা খুবই দুর্গম এবং ঘনবসিত পূর্ণ। এসব এলাকায় বেসামরিক প্রশাসনের পক্ষে পৌঁছানো অনেকটা কষ্টসাধ্য। সেসব এলাকা কোন অপারেশন পরিচালনা করতে আমরা বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করে থাকি।

২০১০ সালের পাহাড় ধস এবং ১৯৯১ সালের ঘুর্ণিঝড়ের সময়ও সেনাবাহিনীকে অনেক কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয় বলে জানান উচ্চপদস্থ ওই সেনা কর্মকর্তা।

এতসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়ার পেছনে মূলত দুটি বিষয় কাজ করে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন: সেনাসদস্যদের সবসময় কমান্ডারের নির্দেশ মত চলতে হয়। তাছাড়া আমাদের কাছে সবার ওপরে দেশের স্বার্থ। তাই কমান্ডারের নির্দেশনার পাশাপাশি দেশের স্বার্থ সামনে আসলে সেনা সদস্যরা জীবনের পরোয়া না করেই ঝাঁপিয়ে পড়ে।

তিনি আরও বলেন: সেনাবাহিনীকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে মূলত চারটি জিনিস প্রয়োজন: ১. নেতৃত্ব ২. যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ, ৩.লজিস্টিক সহায়তা এবং ৪.প্রভিশনিং।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে বিষয়গুলো যথাযথভাবে রয়েছে বলে তারা কখনও দায়িত্ব পালনে পিছপা হন না বলে জানান এই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল।

গত ১৩ জুন আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর থেকে জানানো হয়, রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধসে উদ্ধার কার্যক্রম চালানোর সময় মঙ্গলবার দুই সেনা কর্মকর্তাসহ চার সেনাসদস্য নিহত হয়। এদিন ভোরে রাঙ্গামাটির মানিকছড়িতে একটি পাহাড় ধসে মাটি ও গাছ পড়ে চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়ক বন্ধ হয়ে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে রাঙ্গামাটি জোন সদরের নির্দেশে মানিকছড়ি আর্মি ক্যাম্প থেকে সেনাবাহিনীর একটি দল উক্ত সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। উদ্ধার কার্যক্রম চলাকালীন আনুমানিক সকাল ১১টায় উদ্ধার কার্যস্থল সংলগ্ন পাহাড়ের একটি বড় অংশ উদ্ধারকারীদলের উপর ধসে পড়লে তাঁরা মূল সড়ক হতে ৩০ ফিট নিচে পড়ে যান। পরবর্তীতে একই ক্যাম্প থেকে আরও একটি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুই সেনা কর্মকর্তাসহ চার সেনাসদস্যকে নিহত এবং ১০ জন সেনাসদস্যকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে। আহতদের মধ্যে পাঁচ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদেরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারযোগে ঢাকা সিএমএইচ এ স্থানান্তর করা হয় বলেও জানানো হয়।- চ্যানেল আই

মতামত