টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

পাহাড় খেকোদের কারণেই ধস আর মৃত্যুর মিছিল

চট্টগ্রাম, ১৫ জুন ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: পার্বত্য এলাকায় পাহাড় ধসের জন্য দায়ী পাহাড় কাটা, বনভূমি উজাড় করা আর পাহাড়িদের মধ্যে ‘সেটেলার’দের ঢুকিয়ে দেয়া। প্রভাবশালীরা বছরের পর বছর এই অবৈধ কাজ করে শত শত মানুষের মুত্যু ডেকে আনছে। তাদের সহায়তায় রয়েছে প্রশাসন।

টানা বর্ষণে সোমবার পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে পাহাড় ধসে কমপক্ষে ১৩৯ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রাঙামাটিতে সেনা কর্মকর্তাসহ ৯৮ জন, বান্দরবানে ৯ জন এবং চট্টগ্রামে ৩০ জন মারা গেছেন। মৃতের সংখ্যা আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এখনো মাটির নিচে অনেকে চাপা পড়ে আছেন। উদ্ধারকর্মীরা এখনো ধসে যাওয়া মাটির পাহাড়ের সব ধ্বংসস্তুপে পৌঁছাতে পারেননি।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাহাড় ধসে গত ১০ বছরে ৬ সেনা সদস্যসহ ৩ শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। পাহাড় ধসের এই ঘটনা ঘটতে শুরু করে ২০০০ সালের পর ধেকে।

পাহাড় ধসের সবচেয়ে বড় ঘটনাটি প্রথম ঘটে ২০০৭ সালের ১১ জুন। টানা বর্ষণে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের হাটহাজারী, পাহাড়তলি, বায়েজিদ বোস্তামি, খুলশী এলাকায় পাহাড় ধসে ১২৭ জন নিহত এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হন। পরের বছর, অর্থাৎ ২০০৮ সালে বান্দরবান শহরের বালুচরা এলাকায় পাহাড় ধসে ১৩০ জনের প্রাণহানি ঘটে।

২০০৭ সালের পাহাড় ধসে শতাধিক মানুষের মুত্যুর ঘটনার পর তখনকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার পাহাড় ধসের কারণ ও প্রতিকার জানতে ১১ সদস্যের একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে। সেই কমিটি প্রতিবেদন দিলেও কমিটির সুপারিশ কাজে লাগানো হয়নি।

কমিটির অন্যতম সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা দেখেছি, পাহাড় ধসের কারণ প্রাকৃতিকের চেয়ে মানুষেরই সৃষ্টি বেশি। পাহাড় কেটে ফেলা, গাছপালা কেটে ফেলা, পাহাড় লিজ দেয়া, পাহাড়ে সেটেলারদের বসতি, পাহাড়কে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা অন্যতম কারণ।’

তিনি জানান, ‘আমরা পাহাড় ধস রোধে বেশ কিছু সুপারিশ করেছিলাম। এরমধ্যে প্রধান সুপারিশ ছিল পাহাড় লিজ দেয়া বন্ধ করা। পাহাড়ের বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধ করা। পাহাড় কেটে হাউজিং, শিল্পস্থাপন পাহাড়ের বড় ক্ষতি করে। পাহাড়ে ঘর বানিয়ে ভাড়া দেয়া আরেকটি ক্ষতি। আর আমরা অবৈধভাবে পাহাড় কাটা বন্ধেরও সুপারিশ করেছিলাম।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপকের আরো বলেন, ‘পাহাড়ের বন উজার করা হয়েছে। গাছ না থাকলে পাহাড় টিকবে কী করে। তাই আমরা পাহাড়ে দ্রুত বনায়নের প্রস্তাব করেছিলাম।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বন উজাড় এবং পাহাড় কাটা হচ্ছে অবৈধভাবে। যারা এসব করছেন, তারা প্রভাবশালী। তাদের সঙ্গে আছেন প্রশাসনের অসাধু কিছু লোক।’

সামারি চাকমা পাহাড়ে বেড়ে ওঠা আদিবাসী নারী। তিনি এখন খাগড়াছড়িতে আইন পেশায় নিয়োজিত। সামারি চাকমা বলেন, ‘পাহাড়ে এখন আর বড় কোনো গাছ নাই। সব ন্যাড়া পাহাড়। আমাদের ছোট বেলায় আলুটিলায় অনেক গাছ দেখেছি। কিন্তু সব উজাড় হয়ে গেছে। তাই পাহাড় আর তার মাটি ধরে রাখতে পারছে না।’

তিনি বলেন, ‘পাহাড়ের মাটিও নিয়ে যাওয়া হয়, পাহাড়ে নানা বাণিজ্যিক কাজ হয়। ফলে পাহাড় তার নিজস্ব ক্ষমতা হারিয়েছে। আমরা কথা বলেও কোনো ফল পাইনি।’

সাংবাদিক এবং মাউন্টেনিয়ার ( ট্র্যাকার) শাকিল হাসান এ পর্যন্ত কমপক্ষে ২৯ বার পাহাড়ি এলাকায় গিয়েছেন। পাহাড়ের ধস নিয়ে তার কাজও রয়েছে। তিনি বলেন, ‘পাহাড় ধসের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে আশির দশকের শুরুতে পার্বত্য এলাকায় ব্যাপক হারে অন্য এলাকা থেকে এনে বাঙালিদের বসতি স্থাপন করা। যেহেতু পুরো এলাকাটি পাহাড়ি, তাই সেগুলো কেটেই বসতি নির্মাণ করা হয়েছে।’

তিনি মনে করেন,‘গত ১৫ বছরে বগা লেক, থানচি, আলীকদম, সাজেক, বাঘাইছড়ির মতো দুর্গম এলাকাতেও পাকা সড়ক নির্মান করা হয়েছে। এই কষ্টসাধ্য কাজটি করেছে সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগ। কিন্তু কেন জানি মনে হচ্ছে, দেশের পাহাড়ের ভূমিবিন্যাস, মাটি নিয়ে দীর্ঘ গবেষনায় ঘাটতি ছিল। আর পার্বত্য এলাকায় পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি। ষাটের দশকে দেয়া বাঁধের ফলে রাঙামাটির বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে, যা ওই এলাকার ভূমি বিন্যাস, মাটির উপর দীর্ঘ মেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।’

তার মতে, ‘ব্যাপকহারে গাছ কাটার ফলে পার্বত্য এলাকা অদ্ভুত ন্যাড়া চেহারা নিয়েছে। তবে পাহাড়গুলো সবুজ দেখায় প্রচুর বৃষ্টির কারণে লতা গুল্ম আর ছোট প্রজাতির গাছ জন্মায় বলে।কিন্তু এসবের শেকড় মাটির খুব গভীরে যায় না। বড় গাছের শেকড় যেমন গভীরে গিয়ে মাটিকে আকড়ে থাকে। তো বড় গাছ কেটে ফেলার কারণে মাটির শক্তি কমে যাচ্ছে। ভূমি ধসের এটাও বড় কারণ।’

সবমিলিয়ে পাহাড়ে এখন পাহাড় খেকোদের দাপট। আর পাহাড়খেকোদের কারণেই ভূমি ধসে শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

সূত্র: ডয়চে ভেলে

মতামত