টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

যেভাবে কাতারকে কোণঠাসা করার নীলনকশা হয়েছিল

চট্টগ্রাম, ০৬ জুন ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: কাতারের সঙ্গে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের ৬ দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা আকস্মিক কোনও সিদ্ধান্ত নয়। দুইদিন আগে গ্লোবাল লিকস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ফাঁসকৃত নথিতে দেখা গেছে, বেশ কিছুদিন আগে থেকেই দোহাকে কূটনৈতিকভাবে কোণাঠাঁসা করার চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি কথিত রুশসমর্থনপুষ্ট ওই হ্যাকার গ্রুপ যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) রাষ্ট্রদূত ইউসেফ আল-ওতাইবার ই-মেইল হ্যাক করে।

হ্যাককৃত ইমেইলের বরাতে ইন্টারসেপ্ট-এর প্রতিবেদন বলছে, এক ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমিরাতের ওই মন্ত্রীর যোগসাজশের প্রমাণ পেয়েছে তারা। আদানপ্রদানকৃত মেইল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কাতারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের নীলনকশা হয়েছিল ইসরায়েলি থিংক ট্যাংক আর আমিরাতের মন্ত্রীর মধ্যকার ই-মেইল আলোচনায়।

ফাঁসকৃত ই-মেইল সূত্রে জানা যায়, আমিরাতের রাষ্ট্রদূত ইসরায়েলি ওই থিংক ট্যাংকের সঙ্গে কাতারকে কোণঠাঁসা করার পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেন। ফাঁস হওয়া ই-মেইল উদ্ধৃত করে ইন্টারসেপ্ট-এর প্রতিবেদন বলছে, তারা কাতারবিরোধী প্রচারণার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। দেশটির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পরিকল্পিত নীলনকশা প্রণয়নের জন্য বৈঠকের দিনক্ষণও ঠিক করেছিলেন। ই-মেইলগুলোতে এফডিডি (ইসরায়েলপন্থী রক্ষণশীল গবেষণা প্রতিষ্ঠান দ্য ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্র্যাটিস) এবং আমিরাত সরকারের কর্মকর্তাদের আসন্ন বৈঠক নিয়ে প্রস্তাবিত এজেন্ডার বিস্তারিত উল্লেখ করা আছে। জুনের ১১ থেকে ১৪ তারিখ পর্যন্ত এ বৈঠকের তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

এফডিডি’র গবেষণা সংক্রান্ত ভাইস প্রেসিডেন্ট জোনাথন শ্যানজারের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির সিইও মার্ক দুবোউয়িৎজ এবং হান্নাহ-এরও সে বৈঠকে উপস্থিত থাকার কথা। বৈঠকে আমিরাতের যুবরাজ শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদকেও অন্তর্ভূক্ত করার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্মকর্তারা অনুরোধ জানান। দুই পক্ষের মধ্যে কাতার নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়।

ইন্টারসেপ্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্ভাব্য আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি হলো কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। আল জাজিরাকে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করে তা নিয়ে আলোচনার কথা ছিল।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর মুখ্য সম্পাদক ডেভিড হার্স্ট আল জাজিরাকে বলেছেন, ইমেইলগুলো কাতারের বিরুদ্ধে ভয়াবহ প্রচারণার নীলনকশাকে সামনে এনেছে।

সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা হঠাৎ এলেও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কাতারের সম্পর্কের টানাপড়েন দীর্ঘদিনের। দুই সপ্তাহ আগে গত ২৫ মে কাতারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে দেশটির আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির নামে একটি বক্তব্য প্রচারিত হয়। এতে বলা হয়, কাতারের আমির ইরানের প্রতি আরব দেশগুলোর বিরোধিতার সমালোচনা করেছেন। কাতার দাবি করে, পুরো ঘটনাটি ভুয়া। কারণ রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংবাদ সংস্থা হ্যাক হয়েছিল এবং ওই খবর সাইটটি হ্যাক হওয়ার পর প্রকাশিত হয়েছিল। একে কেন্দ্র করে আল জাজিরা নেটওয়ার্কসহ কাতারের সংবাদ বিষয়ক সব ওয়েবসাইট ব্লক করে দেয় সৌদি আরবসহ চার আরব দেশ।

বিবিসি’র বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মূলত দুটি বিষয় কাজ করেছে এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে। এক, জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে কাতারের সংযোগ, আর দুই আঞ্চলিক রাজনীতিতে সৌদি আরবের প্রতিপক্ষ ইরানের ভূমিকা। ফাঁস হওয়া ইমেইলও বিবিসি’র বিশ্লেষণের যথার্থতার সাক্ষ্য দেয়।

গ্লোবাল লিকসের ফাঁস হওয়া ইমেইলে দেখা যায়, ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র/সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্ভাব্য নীতিমালা কী হতে পারে তা নিয়েও আলোচনার কথা ছিল জুনের প্রস্তাবিত বৈঠকে। এসব নীতিমালার মধ্যে আছে ‘রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক, গোয়েন্দা এবং সাইবার টুল সংক্রান্ত। ইরানি আগ্রাসনকে ধারণ ও পরাজিত করার জন্য সম্ভাব্য জবাব হিসেবেও এ নীতিমালাগুলো নির্ধারণের কথা ছিল।

এফডিডি’র সিনিয়র ফেলো ডেভিড ওয়েনবার্গ গত মাসে বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ‘কৌতুহলী’।

ট্রাম্প প্রশাসনের মেয়াদকালে মধ্যপ্রাচ্যের নীতিবিষয়ক বিতর্কের রূপরেখা তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে এই এফডিডি। সুতরাং ইরানের প্রতি আরও কঠোর হতে ট্রাম্পকে চাপ দেওয়ার জন্য ‌এফডিডি’কে সংযুক্ত আরব আমিরাত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম বলে বিবেচনা করবে সেটাই স্বাভাবিক। ডেভিড ওয়েনবার্গ অ্যারাবিয়ান বিজনেস ডটকমকে বলেন, ‘ইরানকে চাপ দিতে তারা কিছু সময় ধরে আমেরিকার মতো একজন অংশীদার খুঁজেছে। ধারণাকে কর্মকাণ্ডে বাস্তবায়িত করতে তারা আমেরিকাকে খুঁজছে।’

যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত ইউসেফ আল-ওতাইবা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা ও উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগকারী ও ট্রাম্পের সমর্থক থমাস ব্যারাকের প্রচেষ্টায় গত জুনে প্রথমবারের মতো তারা দুজন মিলিত হয়েছিলেন। গত ফেব্রুয়ারিতে পলিটিকো’তে কুশনারকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, ‘অনেকটা অবিরামভাবে ফোন ও ই-মেইলে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন কুশনার।’

মতামত