টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

সুফিবাদে প্রেমার্জনে স্রষ্টার ইবাদত

নুর মোহাম্মদ রানা

চট্টগ্রাম, ০৫ জুন ২০১৭ (সিটিজি টাইমস)::  সুফিবাদ (সুফীবাদ বা সুফী দর্শন) একটি ইসলামিক ধারার আধ্যাত্মিক দর্শন। এই প্রবন্ধে আত্মা সম্পর্কিত আলোচনা এর মুখ্য বিষয়। আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে মহান আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনই হলো এই দর্শনের মর্মকথা। যদিও সুফিবাদী বিশ্বাসী ছাড়া অন্যরা ভিন্নমত পোষণ করেন। পরম সত্তা মহান আল্লাহকে জানার আকাক্সক্ষা মানুষের চিরন্তর। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আধ্যাত্মিক ধ্যান ও জ্ঞানের মাধ্যমে জনার প্রচেষ্টাকে সুফী দর্শন বা সুফীবাদ বলা হয়। প্রখ্যাত সাধক হযরত ইমাম গাজ্জালী (র.) এর মতে, আল্লাহর ব্যতীত অপর মন্দ সবকিছু থেকে আত্মাকে পবিত্র করে সর্বদা আল্লাহর আরাধনায় নিমজ্জিত থাকা এবং সম্পূর্ণরূপে আল্লাহতে নিমগ্ন হওয়ার নামই সুফীবাদ। ‘সুফ’ অর্থ পশম আর ‘তাসাওউফ’ অর্থ পশমী বস্ত্রে পরিধানের অভ্যাস (লাব সু’স-সুফ) অতরপর মরমীতত্তে¡র সাধনায় কাহারও জীবনকে নিয়োজিত করার কাজকে বলা হয় তাসাওউফ। যিনি নিজেকে এইরূপ সাধনায় সমর্পিত করেন ইসলামের পরিভাষায় তিনি সুফি নামে অভিহিত হন। ইসলামি পরিভাষায় সুফিবাদকে তাসাওউফ বলা হয়। যার অর্থ আধ্যাত্মিক তত্ত¡জ্ঞান। তাসাওউফ বা সুফিবাদ বলতে অবিনশ্বর আত্মার পরিশুদ্ধির সাধনাকে বুঝায়, (সূত্র: স্রষ্টার প্রেমার্জনে সুফিবাদ, নুর মোহাম্মদ রানা, নুর আকতার প্রকাশনী, চট্টগ্রাম) এই প্রবন্ধে সুফিবাদে প্রেমার্জনে স্রষ্টার ইবাদত সম্পর্কে সারসংক্ষেপ আলোচনার চেষ্টা করছি। আত্মার পবিত্রতার মাধ্যমে ফানাফিল­াহ (আল্লাহরসঙ্গে অবস্থান করা) এবং ফানাফিল­াহর মাধ্যমে বাকাবিল­াহ (আল­াহর সঙ্গে স্থায়ীভাবে বিলীন হয়ে যাওয়া) লাভ করা যায়। যেহেতু আল­াহ নিরাকার, তাই তাঁর মধ্যে ফানা হওয়ার জন্য নিরাকার শক্তির প্রতি প্রেমই একমাত্র মাধ্যম। তাসাওউফ দর্শন অনুযায়ী এই সাধনাকে ‘তরিকত’ বা আল­াহ প্রাপ্তির পথ বলা হয়। তরিকত সাধনায় মুর্শিদ বা পথ প্রদর্শকের প্রয়োজন হয়। সেই পথ হলো ফানা ফিন শাইখ, ফানা ফিররাসুল ও ফানাফিল­াহ। ফানাফিল­াহ হওয়ার পর বাকাবিল­াহ লাভ হয়। বাকাবিল­াহ অর্জিত হলে সুফি দর্শন অনুযায়ী সুফি আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ শক্তিতে শক্তিমান হয়। তখন সুফির অন্তরে সার্বক্ষণিক শান্তি ও আনন্দ বিরাজ করে। হযরত মুহাম্মদ (স) স্বয়ং সুফিদর্শনের প্রবর্তক। তিনি বলেন, মানবদেহে একটি বিশেষ অঙ্গ আছে, যা সুস্থ থাকলে সমগ্র দেহ পরিশুদ্ধ থাকে, আর অসুস্থ থাকলে সমগ্র দেহ অপরিশুদ্ধ হয়ে যায়। জেনে রাখো একটি হলো কলব বা হৃদয়। আল­াহর কিজর বা স্মরণে কলব কলুষমুক্ত হয়। সার্বক্ষণিক আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে কলবকে কলুষমুক্ত করে আল­াহর প্রেমার্জন সুফিবাদের উদ্দেশ্য। যাঁরা তাঁর প্রেমার্জন করেছেন, তাঁদের তরিকা বা পথ অনুসরণ করে ফানাফিল­াহর মাধ্যমে বাকাবিল­াহ অর্জন করাই হলো সুফিদর্শন। সুফিবাদ উৎকর্ষ লাভ করে পারস্যে। সেখানকার প্রখ্যাত সুফি-দরবেশ, কবি-সাহিত্যিক এবং দার্শনিকগণ নানা শাস্ত্র, কাব্য ও ব্যাখ্যা-পুস্তক রচনা করে এই দর্শনকে সাধারণের নিকট জনপ্রিয় করে তোলেন। কালক্রমে বিখ্যাত ওলীদের অবলম্বন করে নানা তরিকা গড়ে ওঠে। সেগুলির মধ্যে কয়েকটি প্রধান তরিকা সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করে: (১) গাউছুল আজম বড় পীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (র) প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া তরিকা। (২) সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রা) প্রতিষ্ঠিত চিশতিয়া তরিকা। (৩) গাউছুল আজম হযরত আহমদ উল­াহ মাইজভাণ্ডারী প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া মাইজভাণ্ডারী তরিকা। (৪) হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দী (র) প্রতিষ্ঠিত নকশবন্দিয়া তরিকা এবং (৫) হযরত শেখ আহমদ মুজাদ্দিদ-ই-আলফেছানী সারহিন্দী (র) প্রতিষ্ঠিত মুজাদ্দিদিয়া তরিকা।

এছাড়া সুহ রাওয়ার্দিয়া, মাদারীয়া, আহমদিয়া ও কলন্দরিয়া নামে আরও কয়েকটি তরিকার উদ্ভব ঘটে।

বাংলার সুফিবাদ:
বাংলায় সুফিবাদ আবির্ভাবকাল সঠিকভাবে বলা কঠিন। তবে একাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত এদেশে ইসলামের সর্বাধিক প্রচার ও প্রসার হয়েছে বলে জানা যায়। আরব, ইয়েমেন, ইরাক, ইরান, খোরাসান, মধ্য এশিয়া ও উত্তর ভারত থেকে সুফিয়া এসে বঙ্গদেশে সুফিবাদ প্রচার করেন। খ্রিষ্টীয় একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীতে যেসব সুফি-সাধক এদেশে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন, তাঁদের মধ্যে উলে­খযোগ্য হলেন: শাহ সুলতান রুমী (র), বাবা আদম শহীদ (র), শাহ সুলতান বলখী (র), শাহ নিয়ামতুল­াহ বুতশেকন (র), শাহ মখদুম রূপোশ (র), শেখ ফরিদউদ্দিন শক্করগঞ্জ (র), মখদুম শাহ দৌলা শহীদ (র) প্রমুখ। এঁরা গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। বিভিন্ন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন বলেও কথিত হয়। এঁদের অসাধারণ জ্ঞান, বাগ্মিতা ও মানবপ্রেমের কারণে এদেশের সাধারণ মানুষ সুফিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এভাবে ক্রমশ বঙ্গদেশে সুফিবাদ প্রসার লাভ করে। ১২০৪-০৫ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজী কর্তৃক বাংলাদেশ বিহিত হলে ইসলামের শরিয়ত ও মারিফত উভয় ধারার প্রচার ও প্রসার তীব্রতার হয়। শাসকশ্রেণির সঙ্গে বহু পীর-দরবেশ এদেশে আগমন করে ইসলাম প্রচারে মনোনিবেশ করেন। মুসলিম বিজয়োত্তর যে কয়জন সুফি-দরবেশ ইসলাম ও সুফিবাদ প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তাঁদের মধ্যে শেখ জালালুদ্দিন তাব্রিজি (র), শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা (র), শাহ ফরিদউদ্দীন (র.) প্রমুখ উলে­খযোগ্য। এঁরা সুফিবাদের আধ্যাত্মিক তত্ত¡ চমৎকারভাবে তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে ব্যাপকভাবে প্রচারিত করেন, ফলে এ বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে এই মতবাদ প্রসার লাভ করে। সুফি সাধকদের আগমনের পূর্বে বঙ্গদেশ হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের বসবাস করত। এই দুই ধর্মের গুরু-সাধকগণ আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে দীক্ষা দান করতেন। সুফিগণ ইসলামের মহা সত্যের প্রতি মানুষকে আহবান করেছেন প্রেমের মাধ্যমে। মানবপ্রেম তথা সৃষ্টির প্রতি প্রেমের মাধ্যমে স্রষ্টার প্রেমার্জন সুফিবাদের মূল আদর্শ। সুফিগণ নিজেদের আদর্শ জীবন এবং সুফিবাদের প্রেম-ভ্রাতৃত্ব-সাম্যের মধুর বাণী প্রচার করে জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে এদেশের সাধারণ মানুষের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ কিংবদন্তি পুরুষে পরিণত হয়েছেন। অনেকের মাজার-মাকবারা আছে, যেগুলির প্রতি আজও সব শ্রেণির মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করে। পবিত্র ও পুণ্যস্থান বিবেচনায় এমন কি কেউ কেউ দোয়া-দরুদ পাঠসহ নিয়মিত জিয়ারত করে ও পার্থিব কামনা-বাসনায় মানত করে। সৃষ্টির প্রতি প্রেমের মাধ্যমে স্রষ্টার প্রেমার্জন সুফিবাদের এই আদর্শের দ্বারা বৈষ্ণবধর্ম, লৌকিক, মরমীবাদ, বাউল ধর্মমত ও অন্যান্য ভক্তিবাদ কমবেশি প্রভাবিত হয়। সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনেও সুফিবাদের প্রভাব লক্ষ করা হয়। যেমন নদী ও সমুদ্রপথে যাতায়াতের সময় মাঝিরা বদর পীরের নাম স্মরণ করে। শুধু তাই নয়, নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে শহরের যানবাহনে পর্যন্ত বিভিন্ন পীর-আউলিয়ার নাম লেখা থাকে। লৌকিক ধারার মুর্শিদি-মারফতি গান, মাইজভাণ্ডারী গান, গাজীর গান, গাজীকালু চম্পাবতী কাব্য ও অন্যান্য মরমী সাহিত্য ও মাদার পীর ও সোনা পীরের মাগনের গান ইত্যাদি বিভিন্ন পীর-দরবেশকে কেন্দ্র করে রচিত। এভাবে বাংলায় মানুষের ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বৈষয়িক জীবনের নানা ক্ষেত্র সুফিবাদের প্রভাব অক্ষুণœ রয়েছে।

লেখক: বিশিষ্ট লেখক, গবেষক, প্রাবন্ধিক ও গণমাধ্যমকর্মী। ই-মেইল: rana.nm15@yahoo.com

মতামত