টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মিতু হত্যার বছর পার, জট খুলেনি এখনো!

ইব্রাহিম খলিল
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ০৪ জুন ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার ৩৬৫ দিন পার হলো আজ। কিন্তু এ মামলার রহস্যের জট খোলেনি এখনো। সোর্স মুছা সিকাদারকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খাচ্ছে আলোচিত এ হত্যার ঘটনা। তাহলে কি মুছাকে না পাওয়া পর্যন্ত অধরাই থেকে যাবে মিতু হত্যা রহস্য। এমন জল্পনা-কল্পনা চট্টগ্রামের সচেতন মহলের।

তবে নগর পুলিশ কমিশনার মো. ইকবাল বাহার এ প্রসঙ্গে বলেন, হত্যাকান্ডের ঘটনায় জড়িতদের পরিচয় জানা গেছে। তবে মূল ব্যক্তি মুছাকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারিনি। মুছাকে পেলে খুনের নির্দেশদাতা কিংবা নেপথ্যের বিষয় জানা যেতো। মামলার ভবিষ্যত সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মুছাকে পলাতক দেখিয়ে এ মামলার অভিযোগপত্র দেওয়ার দিকে এগোচ্ছে পুলিশ।

তিনি বলেন, মিতু হত্যার সাথে জড়িত আটজনের মধ্যে রাশেদ ও নবী পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। ওয়াসিম, শাহজাহান, আনোয়ার ও ভোলা কারাগারে রয়েছে। ঘটনার ছয়দিনের মাথায় শাহজামান রবিন নামে আরো এক যুবককে নগরীর শীতল ঝর্ণা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরবর্তীতে তদন্তে খুনের ঘটনায় এখনো রবিনের স¤পৃক্ততা পাওয়া না গেলেও এক বছর ধরে কারাবন্দী রয়েছে রবিন। পুলিশের দাবি অনুযায়ী ঘটনার মূল হোতা কামরুল হক সিকদার মুছা ও সহযোগী কালু এখনো পলাতক।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. কামরুজ্জামান জানান, মুছা পলাতক রয়েছে। তাকে পাওয়া গেলে মিতু হত্যার রহস্য জানা যাবে। মুছাকে ধরতে ইতিমধ্যে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আমরা এখনও মুছাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করে যাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত যদি তাকে না পাওয়া যায় তাহলে তাকে বাদ দিয়েই অভিযোগপত্র দেওয়ার চিন্তা করতে হবে।

মুছা ধরা পড়লেই ঘটনার আসল রহস্য বের হবে -পুলিশ কর্মকর্তারা এ ধরণের কথা বলে আসলেও তাকে কিংবা ঘটনায় জড়িত কালুকে ধরার কোনও তোড়জোড় পুলিশের নেই। স্ত্রী পান্না আক্তারের দাবি, ঘটনার সতেরো দিনের মাথায় বন্দর এলাকা থেকে মুছাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মুছাকে পুলিশ পায়নি বলার বিষয়টি হাস্যকর।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ৫ জুন ভোরে ছেলেকে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার পথে নগরীর জিইসি মোড়ের ওআর নিজাম সড়কে নিজ সন্তানের সামনেই গুলি ও ছুরিকাঘাতে খুন করা হয় মাহমুদা খানম মিতুকে। ঘটনার পর খুনিদের তিনজন একটি মোটরসাইকেলে করে এবং অন্যরা হেঁটে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। শুরুতে পুলিশ এ ঘটনার সঙ্গে জঙ্গিদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তদন্ত শুরু করে।

কিন্তু হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের মালিকানার সূত্র ধরে ২০ দিনের মাথায় পুলিশ রাঙ্গুনিয়া থেকে ওয়াসিম, আনোয়ার ও শাহজাহানকে গ্রেপ্তার করে। তারা এ ঘটনায় জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করে আদালতে জবানবন্দি দেয় এবং জড়িত অন্যদের নাম উল্লেখ করে। এ ঘটনায় জড়িত নুরুন্নবী ও রাশেদ রাঙ্গুনিয়ার রাণীরহাট এলাকায় ইটের ভাটায় পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত হয়।

পুলিশ হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত একটি পিস্তল নগরীর কালামিয়া বাজার এলাকার একটি রিকশার গ্যারেজ থেকে উদ্ধার করে। গ্রেপ্তার করে অস্ত্রের মালিক ও যুবলীগ নেতা এহতেশামুল হক ভোলা এবং তার সহযোগী মনির হোসেনকে। মনির জামিনে বের হলেও ভোলা এখনো কারাগারে রয়েছে। অস্ত্রটি মিতু হত্যার ঘটনায় ব্যবহৃত হওয়ার ব্যাপারে ভোলা আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে।

গত একবছরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান মামলার বাদি বাবুল আক্তার ও নিহত মিতুর বাবা মায়ের সঙ্গেও একাধিকবার কথা বলেন। মিতুর বাবা সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন শুরুতে এ হত্যার সঙ্গে বাবুল আক্তার জড়িত নয় দাবি করলেও পরে দাবি করেন, বাবুলের পরকীয়া স¤পর্ক আছে এবং এ কারণে মিতু হত্যার সঙ্গে তার স¤পর্ক আছে।

গত বছরের ২৪ জুন ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশ বাবুল আক্তারকে ডেকে নিয়ে টানা ১৪ ঘন্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে। জানা যায়, ওইদিনই বাবুল আক্তার পুলিশের চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন বলে জানা যায়।

মুছাকে গ্রেপ্তার করা পুলিশকে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি স্ত্রী পান্নার

পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু খুনের ঘটনায় মূল হোতা হিসাবে অভিহিত কামরুল হক সিকদার মুছাকে পুলিশ খুঁজে পায়নি এক বছরেও। পুলিশের দাবি, মুছাকে পাওয়া গেলে মিলবে মিতু খুনের রহস্য।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. কামরুজ্জামান জানান, মিতু খুনের মূল হোতা মুছা এখনো পলাতক। তাকে পাওয়া গেলেই খুনের রহস্য কিংবা নির্দেশদাতা কে তা জানা যাবে।

কিন্তু মুছা পলাতক তা মানতে রাজী নন তার স্ত্রী। মুঠোফোনে পান্না আক্তার বলেন, একজন পুলিশ সুপারের স্ত্রী খুন হলো। আর সেই খুনের মুল আসামি মুছা। অথচ তাকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ বিষয়টি কেমন জানি হাস্যকর।

পান্না বলেন, ঘটনার সতেরো দিনের মাথায় (২০১৬ সালের ২২ জুন) বন্দরের বাসার নীচ থেকে মুছাকে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশের যে কর্মকর্তা মুছাকে আটক করেছে তার সাথে আমার কথা কাটাকাটিও হয়েছে। উক্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে আমি চিনি এবং তাঁর নামও জানি। এ পুলিশকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে মুছা কোথায় জানা যাবে। মুছাকে পেলে পুলিশের ভাষ্যমতে মিত‚ হত্যার জটও খুলতে পারে।

পান্না আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মুছাকে ধরে নিয়ে যাওয়া ওই পুলিশ কর্মকর্তা এখন কোথায়। তাকে কেন জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে না। মুছাকে কেন হাজির করা হচ্ছে না। মুছাকে হাজির না করার পেছনে বড় ধরনের নাটক রয়েছে বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।

পান্না বলেন, ভোলার সাথে মুছার বালির ব্যবসা ছিল। কালামিয়া বাজারের ভাড়া বাসায় আমরা থাকতাম। মিতু খুনের ঘটনার পরদিনও মুছা কালামিয়া বাজারের বাসায় ছিল। দুইদিন পর বন্দর এলাকায় নবীর বাসায় যাই আমরা। সেখান থেকে পুলিশ তাকে আটক করেছে। মিতু খুনের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে যাদের আটক করেছে সবাইকে পুলিশ হাজির করেছে শুধু মুছা ছাড়া। আমি এখনো আশায় বুক বেঁধে আছি মুছা একদিন ফিরে আসবে।

পুলিশ সুপার বাবুল আকতারের স্ত্রী মাহমুদা খাতুন মিতু হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত সন্দেহভাজন মূল খুনি কামরুল ইসলাম মুছা সিকদার রাঙ্গুনিয়ার রাজানগর ইউনিয়নের রাণীরহাট এলাকার খোয়াইল্ল্যার পাড়ার মৃত শাহ আলম সিকদারের তৃতীয় পুত্র। তারা ৬ ভাই ৩ বোনের মধ্যে তৃতীয় পুত্র মুছা সিকদার মাত্র অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করা যৌবনের শুরুতে চলে যায় সৌদি আরবে।

সেখানে দীর্ঘদিন থাকার পর সুবিধা করতে না পেরে ২০০০ সালের শুরুর দিকে দেশে চলে আসে। বিয়ে করে আপন চাচা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবল ফারুখ সিকদারের মেয়ে পান্না সিকদারকে। পারিবারিকভাবে মুসলিম লীগ ঘরানার মুছা সিকদার ২০০১ সালে চার দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির ক্যাডারদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে।

মূলত প্রয়াত বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর হাত ধরেই তার উত্থান ঘটে। তৎকালীন হাটহাজারী সার্কেলের এএসপি জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর মুছা সিকদারকে সোর্স হিসেবে ব্যবহার করতেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তখন পুলিশের অভিযানে রাঙ্গুনিয়ায় বেশ কয়েকটি ক্রসফায়ারে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে রয়েছে জামাল হাজারী, আলো জসিম, উপজেলা সদর ইছাখালীর ক্যারাটি সেলিম, চন্দ্রঘোনার সেলুসহ বেশ কয়েকটি ক্রসফায়ারের ঘটনা মুছা সিকদারের ইশারায় ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

হাটহাজারী সার্কেল থেকে জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর বদলি হয়ে যাবার পর এ যাবতকালে যারাই এসেছেন সবার সাথেই সোর্স হিসেবে কাজ করেছে মুছা সিকদার। সে অনুযায়ী বাবুল আকতার এএসপি হিসেবে হাটহাজারী সার্কেলে আসার পর তাঁর সাথে পরিচয় ঘটে মুছার।

বাবুল আকতার দীর্ঘদিন হাটহাজারী সার্কেলের এসএসপির দায়িত্ব পালনকালে মুছা সিকদার সোর্স হিসেবে কাজ করেছে। ১/১১ এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর মুছা সিকদার সেনাবাহিনীর হাতে অস্ত্রসহ আটক হয়। ২০০৯ সালে আ.লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে মুছা সিকদার এলাকা ছেড়ে পালিয়ে চট্টগ্রাম শহরের কালামিয়া বাজার এলাকায় আস্তানা গড়ে তোলে।

মতামত