টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

ঘূর্নিঝড় মোরার আঘাতে লন্ডভন্ড সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য

দুঃসহ স্মৃতি ভুলতে পারছে না দ্বীপের বাসিন্দারা

ইমাম খাইর
কক্সবাজার ব্যুরো

চট্টগ্রাম, ০৩ জুন ২০১৭ (সিটিজি টাইমস): ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাতে সবসৌন্দর্যই নষ্ট হয়ে গেছে প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের। ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে বসতঘর ও পুরনো স্থাপনা। বসতঘর হারিয়ে অনেকে এখন নিঃস্ব।

চরম খাদ্য সংকটে পড়েছে ক্ষতিগ্রস্তরা। গ্রামে গ্রামে চলছে আহাজারী। কারো বাড়ীর চাউনি, কারো ঘেরা বেড়া, কারো সম্পুর্ন বাড়ী বিধ্বস্ত। গাছপালা ভেঙ্গে উপড়ে পড়ে আছে। ঘূর্নিঝড় পরবর্তী ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। অনেক জায়গায় ফটোসেশন সর্বস্ব ত্রাণ দেয়া হচ্ছে- অভিযোগ ক্ষতিগ্রস্তদের।

সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা আবদুর রহিম জানিয়েছেন, ১৩০ থেকে ১৩৫ কিলোমিটার গতিবেগে আঘাত হানা এ ঘূর্ণিঝড়ে পুরো দ্বীপই এখন লন্ডভন্ড । ঝড়ের বাতাসে উড়ে গেছে বসত-বাড়ির পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়। ১৯৯১ সালের পর এ মোরা ঘূর্ণিঝড়কে স্মরনাতীতকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্থানীয়রা।

যে নয়নাভিরাম সৌন্দর্য দেখার জন্য পর্যটকরা প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন ছুটে যেতেন এখন তার কিছুই নেই। ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাতে লন্ডভন্ড পুরো দ্বীপ এলাকা। চারিদিকে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতের ক্ষত চিহ্ন। বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে দোকান-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সব কিছুই এখন ধংসস্তুপ। ঘূর্ণিঝড় ভোর ছয়টায় সেন্টমার্টিনে আঘাত হানলেও সাড়ে চারটা থেকে এখানে চলে প্রকৃতির রুদ্ররোষ।

নৌ বাহিনী সেন্টমার্টিন ফরোয়ার্ড বেইজের ইনচার্জ লে. কমান্ডার আল আমিন বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোরা যখন সেন্টমার্টিনে আঘাত করে তখন বুঝতে পারছিলাম না কি হতে যাচ্ছে, কি হবে? বিচ্ছিন্ন এ দ্বীপে চারদিকে শুধু প্রচন্ড বাতাস আর বাতাস। ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হচ্ছে, ঘরের ছাউনীর টিন উড়ে গিয়ে গাছে পড়ছে আর বাতাসে গাছপালা উপড়ে পড়ছে। এ যেন ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হচ্ছে পুরো দ্বীপ। তখন সিদ্ধান্তহীনতা ভুগছিলাম দ্বীপের মানুষগুলোকে কিভাবে বাঁচানো যাবে।

চারদিন পেরিয়ে গেলেও ঘূর্ণিঝড় মোরা নিয়ে আতংক কাটছে না সেন্টমার্টিনের বাসিন্দাদের। সকাল ১০টা পর্যন্ত টানা সাড়ে ৫ ঘন্টার এ ঘূর্ণিঝড় স্থানীয়দের কাছে ছিলো চরম দুঃস্বপ্নের মতো। কাগজের মতো দূরে ছিটকে পড়েছে টিনের চালা। শুধু তাই নয়। বালুর নিচে ডুবে গেছে অনেক নৌকা।

দ্বীপের বাসিন্দা খোরশেদ আলম বলেন, এর আগে আরো অনেক ঘূর্ণিঝড় সেন্টমার্টিন দ্বীপে আঘাত হেনেছে। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র মত আঘাত আমার জীবনে আর দেখেনি। এটি স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ছিল সেন্টমার্টিন দ্বীপের জন্য।

মরিয়ম খাতুন বলেন, যখন ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে শুরু করে তখন বাচ্ছা নিয়ে ছুটছিলাম আশ্রয় কেন্দ্রের দিকে। হঠাৎ একটি গাছ পড়লে অল্পের জন্য বাচ্ছা আর আমি বেঁচে যাই। যে ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেছে তাতে মনে হচ্ছিল হল দ্বীপের সবাই মারা পড়ব।

ঘূর্ণিঝড়ে বসতবাড়ি হারিয়ে অনেকটা অসহায় অবস্থায় খোলা আকাশের নিচে দিন কাটছে সেন্টমার্টিনের বাসিন্দাদের। অনেকেই প্লাস্টিকের ছাউনি দিয়ে বাসার চালা দিলেও বাকিরা তাও পারছে না। যোগাযোগ ব্যবস্থা দূর্গম হওয়ায় পাওয়া যাচ্ছে না প্রয়োজনীয় নির্মান সামগ্রী। নেই পর্যাপ্ত ত্রান সহায়তা।

দ্বীপের বাসিন্দা শুক্কুর আলী বলেন, ঘরবাড়ি হারিয়ে এখন বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছি। কোন রকম খেয়ে না খেয়ে খুব কষ্ট দিন চলছে।

রমজান আলী, ইয়াছিন ও রহিমা খাতুন বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে যা ত্রাণ সামগ্রী দিচ্ছে তাতে খুব কষ্ট করে দিন চলছে। এখন আমাদের খাদ্য সামগ্রীর চেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে ঘর। কারণ মাঝে মাঝে বৃষ্টি হচ্ছে, এতে আমাদের খোলা আকাশের নিচে থাকতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। যদি সরকার আমাদের ঘর-বাড়িগুলো নির্মাণের ব্যবস্থা করে দেয় তাহলে আমাদের মাথা গুজার ঠাঁই হবে।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুর আহমদ জানান, ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাতে দ্বীপের ৭০ শতাংশ ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ফলে এখানকার বাসিন্দারা এখন খুবই কষ্টে দিনযাপন করছে। ফলে দ্বীপের বাসিন্দাদের জন্য আরও ত্রাণ সামগ্রী বৃদ্ধি এবং ঘর নির্মাণে সরকারি সহায়তা একান্ত প্রয়োজন।

দেশের সর্বদক্ষিনের ইউনিয়ন প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। ৮ বর্গ কিলোমিটারের এ দ্বীপে স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা সাড়ে আট হাজারের বেশি। মূলত টেকনাফ থেকেই অনেক চড়াই-উৎরাই পাড় হয়ে ইঞ্জিন চালিত নৌকা নিয়ে ১৫ নটিক্যাল মাইল দূরের সেন্টমার্টিন যেতে হয়।

মতামত