টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

ষাটোর্ধ্ব রুপেন দাসের ছুটে চলা

ইব্রাহিম খলিল
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ১৯ মে ২০১৭ (সিটিজি টাইমস)::: কাঁধে ব্যাগ, মাথায় টুপি। উপরন্তু আছে ঝুঁকি। তবুও প্রতিদিন ছুটে চলেন রুপেন দাস (৬৫)। চট্টগ্রামের ফিশারী ঘাটের বিস্তীর্ণ এলাকায় এ বয়সে ছুটতে গিয়ে অনেকের নজর কেড়েছেন তিনি। শুধু তাই নয়, যাদের জন্য ছুটে চলা তাদের অনেকেই সম্মান ও শ্রদ্ধা করেন রুপেন দাসকে।

সম্প্রতি নগরীর ব্যস্ততম পথ ধরে চলার পথে দেখা হয় রুপেন দাসের। কথা প্রসঙ্গে বৃদ্ধ বলায় রূষ্ট হন তিনি। তবে তা বুঝা গেল, তার কথায়। তিনি বলেন, ৬৫ বছর হলেও আমি বৃদ্ধ নই। আমি ১৭ বছরের টগবগে যুবক।

চলনে বলনেও দেখা গেল তাই। বয়সের চাপ চেহারায় থাকলেও বৃদ্ধের মতো কুঁেজা নন একটুও। গতিতেও যেন দুরন্ত-দুর্বার। কথায় নেই খিটখিটে ভাব। সুন্দর সাবলীলভাবে তিনি বলে গেলেন বৃদ্ধের বিপরীত বাক্যগুলো।

রুপেন দাস বলেন, যে বয়সে সবার চাকরি ছাড়ার নিয়ম তখনো আমি সদর্পে চাকরি করছি গ্রামীণফোনের ডিস্ট্রিবিউটর প্রাইম কমিউনিকেশন-১ এর সেলস এক্সিকিউটিভ পদে। প্রতিদিন সফলভাবে পুরণ করি ডিস্ট্রিবিউটরের দেওয়া টার্গেট।

তিনি বলেন, আমার কর্মস্থল ফিশারীঘাট এলাকায় প্রতিদিন ৫০টি সেলস সেন্টার ভিজিট করি আমি। এতে গ্রামীণফোনের রিচার্জ, সিম, স্ক্র্যাচকার্ড, ইন্টারনেট মোডেমসহ অফারগুলো বিক্রয় করি। কোনো সময় দেওয়া টার্গেট আমি মিস করিনি।

এ ব্যাপারে ফিশারী ঘাটের সেলস সেন্টারের এক বিক্রেতা বলেন, রুপেন বাবু খুবই ভদ্র। তিনি প্রতিদিন মাথায় গ্রামীণফোনের টুপি আর কাঁধে ব্যাগ নিয়ে চলে আসেন আমাদের কাছে। গ্রামীণ ফোনের রিচার্জ লোড, সিম, স্ক্র্যাচ কার্ডসহ নানা প্রোডাক্ট বিক্রয়ের পাশাপাশি নতুন নতুন প্রোডাক্ট ও অফারগুলো সম্পর্কে আমাদের বুঝিয়ে দেন। ফলে ব্যবসা চালাতে সহজ হয় আমাদের জন্য।

তিনি বলেন, রুপেন বাবু কোন কাজে রাগ করেন না। সময় দেন পর্যাপ্ত। সুন্দর ও সাবলীল ভাষায় কথা বলেন। তিনি আমাদের খুবই প্রিয়। আমাদের সুখ-দু:খের সাথী তিনি। তাঁকে আমরা অনেক সম্মান ও শ্রদ্ধা করি। এ বয়সে তাঁর কায়িক শ্রম ও সাহস আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়।

জানতে চাইলে রুপেন দাস বলেন, ২০০৩ সালে গ্রামীণফোনের ডিস্ট্রিবিউসন অফিসে সেলস এক্সিকিউটিভ পদে কাজ শুরু আমার। তখন আমার বয়স ৫০। যে বয়সে চাকরি পাওয়ার চিন্তাই আসার কথা নয় কারোই। সেই বয়স থেকে চাকরি করেও ব্যর্থতার গ্লানি ছুঁতে পারেনি আমাকে। বরং টার্গেট পুরণের সফলতা আমাকে দিয়েছে চাকরির স্থায়িত্ব, মর্যাদা ও উন্নতি।

রুপেন দাস বলেন, এর আগে সিএন্ডএফ এজেন্টে চাকরি করে আমি সফলতা পাইনি। ফলে মাত্র আড়াই বছর চাকরির পর রাঙামাটি পার্বত্য জেলার শুভলং-বরকলে বাবার ব্যবসা শুরু করি। ব্যবসায় কিছুটা উন্নতি করলেও শান্তিবাহিনী নামক পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা আমার পুরো এক ট্রাক আমদানি করা ব্যবসায়ীক পণ্য লুট করে। এতে সর্বশান্ত হয়ে পড়ি। সংসারে তখন দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে সরষে ফুল দেখছিলাম। হঠাৎ আমার এক নিকট আত্মীয়ের কাছে সন্ধান পেয়ে সেলস এক্সিকিউটিভ হিসেবে চাকরির জন্য যোগাযোগ করি গ্রামীণফোন ডিস্ট্রিবিউটরে। আমার মনে সাহস থাকলেও বয়সের বিষয়টা; আমাকে ভাবিয়ে তুলে। তারা বয়সের বিষয়টা উপেক্ষা করে আমাকে চাকরিটা দিবে কিনা। শেষ পর্যন্ত চাকরিটা হয়ে গেল ।

কাজে আমি ভাল করার চেষ্টা করি। কাজ দেখে খুশি হন তারা। সেই থেকে আমাকে আর পিছন ফিরে থাকাতে হয়নি। ঘরের জানালা দিয়ে ক্রমেই পালাতে শুরু করল সংসারের কষ্ঠটাও। দুই সন্তানের পড়ালেখার খরচ চালিয়ে বেশ চলছিল সংসারটা। গত কয়েকমাস আগে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বড় ছেলে সুরজিত দাস বায়িং হাউজের চাকরিতে যোগ দিয়েছে। ছোট ছেলে শুভজিৎ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে।

তিনি বলেন, যে বয়সে মানুষ কোনো চাকরির আশা করে না। সে বয়সে গ্রামীণফোনের সেলস এক্সিকিউটিভ পদে চাকরি করে আমি নিশ্চিত দুরাবস্থার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি। এ জন্য আমি গ্রামীণফোন ও ডিস্ট্রিবিউটরের কাছে কৃতজ্ঞ।

প্রশ্নের জবাবে রুপেন দাস বলেন, গ্রামীণফোন আমাকে বেচে থাকার সুযোগ দিয়েছে। যতদিন সক্ষম হবো আমৃত্যু গ্রামীণফোনের সাথে থাকবো। গ্রামীণফোন ছেড়ে অন্য কোথাও আমি কাজ করতে যাব না।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গ্রামীণফোনের হেড অব এক্সটারনাল কমিউনিকেশনস সৈয়দ তালাত কামাল বলেন, গ্রামীণফোনের কারনে রুপেন দাসের মতো লোক কাজের ক্ষেত্র খোঁজে পেয়েছে; এটা কম নয়। কাজ করে যদি রুপেন দাস ভাল থাকেন, তাহলে সেটাই হবে গ্রামীণ ফোনের বড় অর্জন।

উল্লেখ্য, রুপেন দাস চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার গুজরা গ্রামের মৃত সুখেন্দু বিকাশ দাসের ছেলে। তিনি বর্তমানে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে নগরীর কোতোয়ালী থানার আলকরণ এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছেন। সম্প্রতি তার মাতৃবিয়োগের কথা জানান রুপেন দাস।

মতামত