টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রামে ভেজাল যন্ত্রাংশে মাথা খারাপ হচ্ছে গাড়ির!

ইব্রাহিম খলিল
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ১২ মে ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: চট্টগ্রাম মহানগরীর দেওয়ানহাটে সড়কের মাঝে হঠাৎ আটকে গেল একটি বাস। ব্যস, দুইদিকে যানজট। চালক হেলপার অনেক চেস্টার পর ধাক্কা দিয়ে সরালো বাসটি। তাও সড়কের একাংশ বøক। আর এর আগে প্রায় একঘন্টা দুর্ভোগ পোহাতে হলো শতশত যানবাহন ও যাত্রীকে।

জানতে চাইলে বাসটির চালক মো. মাসুদ জানান, কি আর ভাই, গাড়ির যন্ত্রাংশে ভেজাল। এ জনই তো যখন-তখন যেখানে সেখানে মাথা খারাপ হয়ে যায় গাড়ির। এ সময় তিনি গাড়ি মেরামতের গ্যারেজে মিস্ত্রির সাথেও খুব বিশ্রী ভাষায় কথা বলছিলেন।

মাসুদ বলেন, গাড়ির মাল বদলায়লি ২ দিন গেল না, গাড়ি আবার খারাপ হয়ে গেছে। তুই ঠিক করলি টা কি? গাড়ি তো ঠেললেও চলে না। প্রায় ঘন্টাখানেকের মধ্যে তৈলাক্ত এক লোক হাতিয়ার নিয়ে এসে দেখা শুরু করল বাসটি। তিনি চালককে বললেন, চার নাম্বার যন্ত্রাংশ লাগাইলে গাড়ির মাথা খারাপ না হয়ে কি আমার মাথা খারাপ হইব?

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তৈলাক্ত ব্যক্তি আরিফুর রহমান বলেন, চট্টগ্রামে ভেজাল গাড়ি যন্ত্রাংশে সয়লাব হয়ে গেছে। একই রকম দেখতে কিন্তু একই না! আসল কো¤পানীর তৈরী যন্ত্রাংশের হুবহু নকল। এই নকলেও আছে কয়েক ধরনের নকল। সবচেয়ে ভালো নকল পণ্যকে বলা হয় দুই নাম্বার। আর এর পরেরগুলোকে বলা হয় তিন নাম্বার ও চার নাম্বার।

এসব নকল পণ্য কিনে প্রতিনিয়ত ঠকছেন ক্রেতারা। নকলের বাজারে আসল পণ্য চেনা কঠিন। নকল পণ্যগুলো কয়েকগুণ বেশি দামে কিনে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা। অনেক ক্ষেত্রে বিক্রেতাদের কৌশলের কাছে অসহায় হয়ে পড়ছেন ক্রেতারা।

এদিকে আসল পণ্যের মতো হুবহু দেখতে এই সকল পণ্য চীন থেকে আমদানি করা হলেও এগুলোর গায়ে লিখা থাকে মেড ইন জাপান, মেড ইন তাইওয়ান, মেড ইন কোরিয়া, মেড ইন ইতালী সহ আসল কো¤পানীর উৎপাদনের ঠিকানা।

বিক্রেতাদের দাবি, আমদানিকারকরা চীনা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে যে স্যা¤পল নিয়ে অর্ডার করে সেই অনুয়াযী পণ্য তৈরি করে দেন তারা। তাদের নির্মাণ শৈলী এতো নিখুঁত যে আসল পণ্যটিকে তখন নকল মনে হবে। তবে নকল পণ্যগুলো বাইরে থেকে যতই চকচক করুক এগুলো মানের দিক থেকে খুব খারাপ।

এদিকে এইসব নকল পণ্য বাজারে বিক্রয় করে এক শ্রেণীর আমদানীকারক ও ব্যবসায়ী কোটি কোটি টাকা অবৈধ ভাবে আয় করছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী ক্রেতাদের।

মুরাদপুরস্থ মটরপার্টসের একটি দোকানে ক্রয় করা একটি প্লাগ নিয়ে এসেছেন এক ক্রেতা। তিনি অন্য জায়গা থেকে প্লাগ গুলো কিনে ছিলেন ৮০০ টাকা করে। চারটি প্লাগ তার আর প্রয়োজন না হওয়ায় দোকানে সেগুলো দিয়ে অন্য কিছু কিনতে এসেছিলেন। দোকানী প্লাগগুলো দেখে বললেন এগুলো নকল পণ্য। দেখতে টয়োটা কো¤পানীর আসল প্লাগের মতো মনে হলেও এগুলো পুরো নকল। এর বাজার মূল্য সর্বোচ্চ ২০০ টাকা। আমার কাছে দিলে চারটি প্লাগ ৪০০ টাকায় রাখব! এসময় প্লাগ নিয়ে আসা লোকটি বললেন আমাকে আসল পণ্য বলে বিক্রয় করেছে! এ সময় দোকানী বললেন আসল নকল চেনা কঠিন।

নগরীর মুরাদপুরস্থ মুক্তা মটরসে গাড়ির জন্য প্রেসার প্লেট ও ক্ল্যাস প্লেট কিনতে এসেছে চালক ইকবাল। বিক্রেতা তাকে বললেন এশিয়া কো¤পানীর প্রেসার প্লেট ও ক্ল্যাস প্লেট আছে। সেটা দেখতে চাইলে বিক্রেতা বললেন দেখানো যাবে না। দাম বললেন ২ হাজার ৬শ টাকা। সুমন প্রেসার প্লেট দেখতে চাইলে বিক্রেতা বললেন সেটা দেখে কি করবেন। সুমন উত্তরে বললেন আসল না নকল সেটা দেখবো। বিক্রেতা বললেন আসল নকল আপনি বুঝবেন না। এগুলো সব চায়না মাল। দেখতে আসলের মতো।

একইদিন মুরাদপুরস্থ আরেকটি যন্ত্রাংশের দোকান সৈয়দ অটো পার্টসে প্রেসার প্লেট ও ক্ল্যাস প্লেট কিনতে যায় সুমন নামে এক চালক। এই দোকানে আসল ও নকল উভয় এশিয়ান কো¤পানীর প্রেসার প্লেট আছে। দুটো পণ্য দেখতে চাইলে বিক্রেতা বলেন কোনটা আসল আর কোনটা নকল সেটা আপনি বুঝবেন না। আপনি কি আসলটা নেবেন না নকলটা নেবেন সেটা আগে বলেন। দাম দুইটার দুই রকম।

এই সময় কবির আহমদ নামে এক ক্রেতার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, যন্ত্রাংশের বাজারে চলছে এক ধরণের নৈরাজ্য। এখানে প্রায় সব নকল পণ্য আসল বলে বিক্রয় হয়। ক্রেতাদের পক্ষে আসল নকল চেনা অসম্ভব। চিন থেকে আনা হচ্ছে নকল পণ্য, বাজারে অধিকাংশ পণ্য নকল। এই সব পণ্যের গায়ে কোন এমআরপি (সর্বোচ্চ বিক্রয় মূল্য) লেখা থাকে না। যার কারণে বিক্রেতাদের ইচ্ছা মত দাম নির্ধারণ হয়। ক্রেতারা এখানে অসহায়।

তিনি বলেন, সরকারের উচিত আসল ও নকল পণ্য চিহ্নিত করে দেয়া। এছাড়া এগুলোর আমদানী মূল্যের সাথে সামঞ্জস্য করে সর্বোচ্চ বিক্রয় মূল নির্ধারণ করে দেয়া।

মতামত