টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চাক্তাই খালের আবর্জনাই যেন জলাবদ্ধতার বড় বাঁধ!

প্রধান প্রতিবেদক
সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ০৯ মে ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: দখল দূষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম নগরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম চাক্তাই খাল। খালটির ভেতরের আবর্জনাই যেন বড় বাঁধ নগরীর জলাবদ্ধতার জন্য। সরানো উদ্যোগ নেই এই খালের আবর্জনার ভাগাড়। উচ্ছেদও হচ্ছে না দখলদার।

জানা যায়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে চাক্তাই খালের দখলদারদের তালিকা করেছিল। এরপর দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও দখলদার উচ্ছেদে এখনো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ৪৮ ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এই খালের জায়গা দখল করে আছে। দখলদারেরা খালের প্রায় ২০ হাজার বর্গফুট জায়গা দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেছে। এর মধ্যে সিটি করপোরেশনের একটি ভবনও রয়েছে। অথচ চাক্তাইসহ নগরের খাল ও নালা-নর্দমার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের (চসিক)।

চসিকের প্রধান প্রকৌশলী লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, চাক্তাই খালের মূল সমস্যা হচ্ছে দখল। অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের কারণে অনেক স্থানে খাল সংকুচিত হয়েছে। এতে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে রাজস্ব বিভাগের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করেছে প্রকৌশল বিভাগ।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবদুল জলিল বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী দখলদারদের তালিকা তৈরি করা হয়। তালিকাটি আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা হবে।

স্থানীয়রা জানান, নগরীর শুলকবহর, চকবাজার, দক্ষিণ বাকলিয়া, পশ্চিম বাকলিয়া, দেওয়ানবাজার ও বকশিরহাট ওয়ার্ডের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এই খালটি। বৃষ্টি ও জোয়ারে খালের উপচে পড়া পানিতে তলিয়ে যায় এসব ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকা। এতে খালের দুই পাশে থাকা বসতঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে যায়। নষ্ট হয় পণ্যসামগ্রী ও বসতঘরের নানা জিনিসপত্র। আর দুর্ভোগ তো আছেই।

চকবাজার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সাইয়েদ গোলাম হায়দার বলেন, আরএস জরিপ অনুযায়ী চাক্তাই খাল যেভাবে থাকার কথা, সেভাবে নেই। খালের জায়গা দখল করে অনেকেই স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। তাই শুধু খনন কার্যক্রম করেই জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধান হবে না। এ জন্য বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুর নিচে ওয়াসাসহ সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানের তিনটি পাইপ রয়েছে। বারইপাড়া ও চকবাজার থেকে খাল দিয়ে আসা ময়লা-আবর্জনা সেখানে আটকে যাচ্ছে। প্রতিদিনই জমতে জমতে সেখানে ময়লার এমন স্তর পড়েছে, যেখানে লোকজন অনায়াসে হেঁটে যেতে পারছে। আর এই আবর্জনাই এখন নগরীর জলাবদ্ধতার জন্য বড় বাঁধ হয়ে দাড়িয়েছে।

মাস্টারপোল এলাকায় চাক্তাই খালের পাশে গড়ে উঠেছে একটি বস্তি। সেখানে প্রায় ৬০ পরিবারের বসবাস। এই বস্তির বাসিন্দা লতিফুর রহমান ও আনোয়ারা বেগম বলেন, জোয়ার আর বৃষ্টি হলেই খালের পানি ঘরে চলে আসে। এতে ঘরের খাট-বিছানাপত্র ভিজে যায়। ঘুমাতে কষ্ট হয়। আর শিশুদের নিয়ে কষ্টের সীমা থাকে না।

সিটি করপোরেশনের তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী আনোয়ার হোছাইন বলেন, মাস্টারপোল এলাকায় খালের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার ও খননকাজ শুরু হয়েছে। দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ইয়াছিন চৌধুরী বলেন, খালের মাস্টারপোল এলাকায় খালের ভেতর দিয়ে গেছে ওয়াসার পানি ও কর্ণফুলী গ্যাসের দুটি পাইপলাইন। আবর্জনা এসব পাইপে আটকে যাচ্ছে। পাইপ সরানোর জন্য দুটি সংস্থার সঙ্গে কথা বলা হবে।

চসিক সূত্র জানায়, ছয় কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের চাক্তাই খালের প্রস্থ এলাকাভেদে ২০ থেকে ৭০ ফুট। নগরের বহদ্দারহাট থেকে শুরু হওয়া এই খাল কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে মিশেছে। করপোরেশনের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাক্তাই খাল খননে ২০১১-১২ অর্থবছরে খরচ হয়েছে ২ কোটি ৪২ লাখ টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। গত অর্থবছরে (২০১৫-১৬) ব্যয় হয়েছে ৪ কোটি ৬ লাখ টাকা।

চসিকের প্রধান প্রকৌশলী লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডবিøউএম) প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাক্তাই খাল থেকে ১ লাখ ঘনমিটার মাটি উত্তোলন করা হলে খালের ৭০ শতাংশ নাব্যতা ফিরে আসবে। এই মৌসুমে ৫০ হাজার ঘনমিটার মাটি অপসারণ করা হবে।

এ প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ জেরিনা হোসেন বলেন, খনন ও অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে চাক্তাই খাল জলাবদ্ধতা নিরসনে পুরোপুরি ভূমিকা রাখতে পারবে না। এ জন্য বহদ্দারহাটের সংযোগস্থল থেকে বারইপাড়া হয়ে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খননের যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

মতামত