টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রামে চোখ রাঙাচ্ছে ঘুর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস, ঘুমাচ্ছে পাউবো

প্রধান প্রতিবেদক
সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ০৫ মে ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: গ্রীস্মের শুরুতে ভারী বর্ষণ ও জোয়ারে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার উপকুলীয় এলাকাসমূহ। আরও বর্ষণ ও জলোচ্ছ্বাসের আগাম সতর্কবার্তা রয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তরে। অথচ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষার কোন উপায় নেই উপকূলবাসীর।

উপকুলবাসীরা জানান, চট্টগ্রাম মহানগরসহ উপকুলীয় এলাকা রক্ষাবাঁধগুলোর সবকটিই ঝুঁকিপূর্ণ। সামান্য বৃষ্টি ও সাগরের স্বাভাবিক জোয়ারেও বেড়িবাঁধ ডিঙিয়ে তলিয়ে যাচ্ছে উপকুলীয় এলাকা। এ অবস্থায় চলতি মৌসুমে ভয়াবহ ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কার মধ্যে চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন উপকুলবাসীরা।

উপকুলবাসীদের অভিযোগ, উপকুল রক্ষাবাঁধগুলো সংস্কার ও সংরক্ষণে কোন উদ্যোগ নেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো)। এ নিয়ে যোগাযোগ করতে গিয়ে দেখা গেল সত্যিই; উপকুল নিয়ে কোন চিন্তাই নেই পাউবোর চট্টগ্রামের কর্মকর্তাদের।

পাউবো চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী বিদ্যুৎ কুমার দাশ এ প্রসঙ্গে আলাপকালে বলেন, জেলার উপক‚লীয় তীরবর্তী এলাকা আনোয়ারা, বাঁশখালী, পটিয়া, সীতাকুন্ড, সাতকানিয়া, চন্দনাইশসহ আরও কয়েকটি এলাকায় বেড়িবাঁধ হুমকির মুখে। একই সঙ্গে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে চট্টগ্রাম শহর রক্ষা বাঁধ। কিন্তু বরাদ্দ না পেলে এসব বাঁধের কাজ করব কিভাবে?।

তিনি বলেন, বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের জন্য প্রকল্পগুলো মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। এতে আমাদের কিছুই করার নেই। আমাদের কাজ আমরা করেছি তাই আমরা নিশ্চিন্ত। তবে ছোটখাটো বরাদ্দ আসলে তা জোড়াতালি দিয়ে কাজ করছি।

পাউবো সূত্র জানায়, ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর ২০১০ সালে উপকুলীয় ফোল্ডার নং ৬২ (পতেঙ্গা), ৬৩/১ (আনোয়ারা), ও ৬৩/১(বি) সংক্রান্ত আনোয়ারা ও পটিয়ার বাঁধ মেরামত ও ৬৮ কিলোমিটার নদীর তীর সংরক্ষণের কাজের জন্য একটা পুনর্বাসন প্রকল্প তৈরি করে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠায় পাউবো।

২৯১ কোটি টাকার প্রস্তাবিত এ প্রকল্প যাচাই-বাছাই শেষে ২৭৫ কোটি টাকায় নির্ধারিত হয়ে প্রকল্পটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো এ প্রকল্প প্রস্তাব পাস হবে এরকম কোনো খবর নেই পাউবোর কাছে।

সূত্র জানায়, ১৯৬৫ সালে চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকা পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত ২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধটি নির্মাণ করা হয়। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর ৯৩ সাল থেকে ৯৬ সালের মধ্যে বেড়িবাঁধটি সিইআরপি নামে একটি প্রকল্পের আওতায় ৯০কোটি টাকা ব্যয়ে ব্যাপক আকারে সংস্কার করা হয়। পতেঙ্গার নেভাল একাডেমি থেকে পরবর্তী এক কিলোমিটার পর্যন্ত সী-ওয়াল নির্মাণ করে মেরামত করা হয়। এরপর পতেঙ্গার হোসনে আহমদপাড়া থেকে সীতাকুন্ডের ফৌজদারহাট পর্যন্ত এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য ব্যয় হয়েছে ৩০ কোটি টাকা। এছাড়া বাকি ১০ কোটি টাকা পতেঙ্গা থেকে খেজুরতলা পর্যন্ত চার দশমিক ২৪ কিলোমিটার সাগর পাড়ে পাথরের ব¬ক বসানো, ১৬টি ¯øুইচগেট নির্মাণ এবং সামগ্রিক খাতে খরচ করা হয়েছে।

এরমধ্যে গত বছর পাউবোর জরিপে বেড়িবাঁধের হোসেন আহমদপাড়া, আনন্দবাজার এবং খেজুরতলাকে সবচেয়ে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এছাড়া মুসলিমাবাদ থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত আরও বিভিন্ন অংশে ফাটল থাকলেও এ ফাটল কিংবা ভাঙন তেমন বিপজ্জনক নয় বলে মনে করছে পাউবো।

এছাড়া জেলার উপকুলীয় এলাকাগুলোর মধ্যে পশ্চিম পটিয়া (কর্ণফুলী থানা)র চরপাথরঘাটা, চরলক্ষ্যা, শিকলবাহা, জুলধা ও বড়উঠান, আনোয়ারা উপজেলার গহিরা, রায়পুর, বারশত ইউনিয়ন, জুঁইদন্ডি, বরুমছড়া, বারখাইন, হাইলধর, বাঁশখালী উপজেলার ছনুয়া, গন্ডামারা, সরল, খানখানাবাদ, বাহারছড়া, কাথারিয়া, পুঁইছড়ি, শেখেরখীল, শীলকুপ, চাম্বল, পুকুরিয়া, সাধনপুর ও কালীপুর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে এসব এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এতে বাড়ি-ঘর হারিয়ে অনেকে নিঃস্ব হয়ে যায়। চট্টগ্রাম নগরীর নিকটতম এ এলাকায় দীর্ঘ ২২ বছরেও ঘূর্ণিঝড়ে মোকাবিলায় কার্যকর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। নির্মাণ করা হয়নি বেড়িবাঁধ। কিছু কিছু এলাকায় দুই-একটি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হলেও তা জনসংখ্যার তুলনায় অপ্রতুল। আবার অধিকাংশই ব্যবহারের অনুপযোগী।

উপকুলবাসীদের অনেকে জানান, প্রতিবছরই ২৯ এপ্রিল তাদের নতুন করে ভাবায়। এদিন ম্যারিএন নামক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় লন্ডভন্ড করে দেয় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার পুরো উপক‚ল। লাশের পরে লাশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল চারদিকে। বিস্তীর্ণ অঞ্চল পরিণত হয়েছিলো ধ্বংসস্তু‚পে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এতবড় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি এদেশের মানুষ এর আগে আর কখনো হয়নি।

১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিল রাতে বাংলাদেশে-র দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত চট্টগ্রাম উপক‚লে আঘাত হানা এ ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়টির বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২৫০ কিমি। ঘূর্ণিঝড় এবং তার প্রভাবে সৃষ্ট ৬ মিটার (২০ ফুট) উঁচু জলোচ্ছ্বাসে আনুমানিক ১ লাখ ৩৮ হাজার জন মানুষ নিহত এবং প্রায় এক কোটি মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে।

২৯এপ্রিলের মতো বড় কোনো ঘটনা যদি আবার ঘটে, এমন চিন্তা মনে আসতেই আঁৎকে উঠে উপকুলবাসী। তাই চট্টগ্রাম নগরীসহ জেলার উপক‚লীয় এলাকাগুলো ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে শিগগিরই বেড়িবাঁধ সংস্কার ও পুন:নির্মাণের দাবি তাদের।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মো. ফরিদ উদ্দিন জানান, চলতি মৌসুমে ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা রয়েছে। ফলে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে উপক‚লবাসী। বড় ধরনের প্রাণহানী ও ক্ষতির আগেই উপকুল রক্ষাবাঁধগুলো সংস্কার প্রয়োজন।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামে বড় ধরনের জলোচ্ছ্বাসে মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়বে চট্টগ্রাম বন্দর ও বন্দরের বিভিন্ন স্থাপনা, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বিভিন্ন বেসরকারি আইসিডি, চট্টগ্রাম ইপিজেড, কর্ণফুলী ইপিজেড, ইস্টার্ন রিফাইনারি, বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কো¤পানির ডিপো, নৌ ও বিমানবাহিনীর স্থাপনা, সাইলো জেটি, খাদ্য গুদাম, ইস্টার্ন ক্যাবলস এর কারখানার মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

এছাড়া নগরীতে উপক‚লীয় অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে, ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী, ১০ নম্বর উত্তর কাট্টলী, ৩৬ নম্বর গোসাইলডাঙ্গা, ৩৭ নম্বর উত্তর-মধ্যম হালিশহর, ৩৮ নম্বর দক্ষিণ-মধ্যম হালিশহর, ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর, ৪০ নম্বর উত্তর পতেঙ্গা (একাংশ) এবং ৪১ নম্বর উত্তর পতেঙ্গা (বাকি অংশ)।

পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত মোট ২৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ২২ কিলোমিটারই বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বাঁধের বিভিন্ন অংশ ভেঙে যাওয়া এবং কিছু অংশ একেবারে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে বড় ধরনের ঝড়-জলোচ্ছ্বাস হলে নগরীর অধিকাংশ এলাকা তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বলে জানান স্থানীয়রা।

মতামত