টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

যে ভুল স্লোগানে দেশের প্রাকৃতিক ও পরিবেশ আজ বিপন্ন

চট্টগ্রাম, ২৬ এপ্রিল ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: একটা ভুল স্লোগানের কারণে দেশের কৃষি, জীববৈচিত্রসহ সার্বিক পরিবেশ আজ বিপন্ন। স্লোগানটি হচ্ছে ‘বেশি করে গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান’। প্রকৃতপক্ষে স্লোগানটি হওয়া উচিত ছিল ‘বেশি করে দেশী গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান।’ কিন্তু দেশী গাছের কথা স্পষ্ট করে উল্লেখ না থাকার কারণে এদেশবাসী না বুঝেই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বিদেশী গাছ লাগিয়েছে আগ্রহের সাথে। আর এ ভুল স্লোগানের সুযোগ নিয়েছে দাতাগোষ্ঠীর গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী এক শ্রেণীর এনজিও। তারা জেনেবুঝেই এদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ক্ষতিকর এই গাছের মধ্যে ইউক্যালিপটাস অন্যতম। যে গাছটি এখন পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমাদের জলবায়ুর জন্য ইউক্যালিপটাস গাছ মোটেই উপযোগী নয়। কৃষিমন্ত্রী সম্প্রতি এ সম্পর্কে বলেন, ‘এতোদিন বিদেশি দাতা সংস্থার পরামর্শে সামাজিক বনায়নের নামে এ ধরনের গাছ লাগানো হয়েছে। এই গাছগুলোর নিচে অন্য কোনো গাছ জন্মায় না, এমনকি পাখিও বসে না। আকাশমণি গাছের রেনু নিঃশ্বাসের সঙ্গে শরীরে গেলে অ্যাজমা হয়। এর কাঠ জ্বালানি হিসেবে বা আসবাবপত্র তৈরিতে ব্যবহার করা যায় না।’

তিনি আরও বলেন; ‘দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন চরগুলোর মধ্যে যেগুলো টিকবে, সেগুলোতে সামাজিক বনায়ন করা হবে। ধানি জমির দুই পাশে ধইঞ্চা গাছ লাগানো হবে। এতে জমির পুষ্টি ও উর্বরাশক্তি বাড়বে। এনজিওরা সামাজিক বনায়নের নামে দেশের প্রধান সড়কগুলোর দুপাশ দখল করে আছে সাধারণ মানুষ এই জমিগুলো ব্যবহার করতে পারছে না।’

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সুন্দর পৃথিবীকে পরিবেশবান্ধব বাসযোগ্য রাখতে গাছের বিকল্প নেই। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য দেশের মোট ভূভাগের প্রায় ২৫ ভাগ বনভূমি দরকার। গাছ মানুষের বন্ধু ও পরিবেশের অন্যতম প্রধান উপকরণ। কিন্তু সব গাছ মানুষের জন্য উপকারী কিংবা পরিবেশবান্ধব নয়। মানুষের উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি করে রাক্ষুসি গাছ ইউক্যালিপটাস।

বাংলাদেশ ও ভারতে ইউক্যালিপ্টাস নীলগিরি বা নীলগিরি গাছ নামে পরিচিত। গাছটিতে অধিক পরিমাণে তেল থাকায় এটা বেশ দাহ্য এবং খোদ এর আবাসভূমি অস্ট্রেলিয়াতে একে অগ্নি সৃষ্টিকারী হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়।

গাছটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি প্রচুর পানি শোষণ করে| তাই শুকনো জমিতে ইউক্যালিপটাস গাছটি রোপন করার মানে নেই| অথচ দেশের প্রতিটি প্রান্তে এই গাছ সমানে লাগানো হচ্ছে। কিছু টাকা কামানোর ধান্ধায় অনেকে জমির আইলেও এ গাছ লাগাচ্ছে।

আমাদের দেশে এই গাছ লাগানোর কারণ হচ্ছে সল্প সময়ে কাঠ বানানোর জন্য। কিন্তু এই স্বল্প সময়ের লাভের জন্য দেশটিকে মরুভূমির দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে| তবে দেশের পার্বত্য অঞ্চলে এই গাছ লাগালে কাগজশিল্পের কিছু উপকার হয়ত করা যায়। এছাড়া আর কোনো জায়গায় এই গাছ লাগানোর কারণ নেই|

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সাধারণত গাছ নাইট্রোজেন গ্রহণ করে আর অক্সিজেন সরবরাহ করে পরিবেশ নির্মল ও প্রাণীকূলের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসে সহায়তা করে। অথচ ইউক্যালিপটাস গাছ অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং নাইট্রোজেন নির্গমন করে। তাছাড়া, এর পাতা ও ডালপালা অজৈব পদার্থের মত কাজ করে জমিকে অনুর্বর করে। ফলে ফসলের উৎপাদন কমে যায়।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন একটি পানিখেকো ইউক্যালিপটাস গাছ ৪০ থেকে ৫০ লিটার পানি শোষণ করে মাটিকে নিরস ও শুষ্ক করে ফেলে। এছাড়া মাটির নিচের গোড়ায় ২০-৩০ ফুট জায়গা নিয়ে চারদিকে থেকে গাছটি পানি শোষণ করে বলে অন্যান্য ফলদ গাছের ফলন ভালো হয় না। এই গাছে কোনো পাখি বাসা বাঁধে না। ইউক্যালিপটাস গাছের ফলের রেণু নিঃশ্বাসের সঙ্গে দেহে প্রবেশ করলে অ্যাজমা হয়। এমনকি যে বসতবাড়িতে অধিক পরিমাণে ইউক্যালিপটাস গাছ আছে সেসব বাড়ির শিশু ও বৃদ্ধদের শ্বাসকষ্ট হতে পারে। যে ফলের বাগানে এ গাছের সংখ্যা বেশি সেখানে ফল কম ধরতে পারে।

ডালপালা বিস্তার ছাড়াও গাছের মূল থাকে মাটির ১৫ মিটার গভীরে। গাছগুলো পানি ও খনিজ লবণ শোষণ ছাড়াও মাটির গভীর থেকে অতিরিক্ত পানি শোষণ করে ডালে জমা রাখে। ফলে যে স্থানে এ গাছ থাকে সেই স্থান হয়ে পড়ে পানিশূন্য ও অনুর্বর। এতে ওই অঞ্চলের পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অন্য প্রজাতির গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই গাছ মাটি পানিশূন্য ও অনুর্বর করে। ২০-৩০ বছর কোনো স্থানে গাছগুলো থাকলে সেখানে অপর প্রজাতির কোনো গাছ জন্মাতে পারে না। কারণ পাতার টক্সিক কেমিক্যাল মাটিতে থাকা নাইট্রোজেন পরমাণু ভেঙ্গে দিয়ে ছোট ছোট উদ্ভিদের খাদ্য তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করে। এতে মাটির পুষ্টি-প্রবাহও নষ্ট হয়। আর ওই গাছের পাতা পড়ে ছয় ইঞ্চি পর্যন্ত মাটির স্তর বিষাক্ত করে ফেলে। এতে ওই স্থানে ঘাস ও লতাপাতা জন্মাতে পারে না।

ইউক্যালিপটাস গাছ বিভিন্ন পোকামাকড় ও পাখিদের জন্য যথেষ্ট ক্ষতিকর। এই গাছ অতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করে বলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া আমাদের দেশের স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২০৩ সেন্টিমিটারের বেশি নয়। অথচ এ প্রজাতির গাছের জন্য স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৭০০-৮০০ সেন্টিমিটার দরকার। ফলে আশপাশের এলাকা সবসময় শুষ্ক থাকায় দাবানল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

পরিবেশ উপযোগী না হওয়ায় ২০০৮ সালে সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে দেশে ইউক্যালিপটাসের চারা উৎপাদন নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু কৃষকরা না জেনে ইউক্যালিপটাসের চারা বপন করছেন। এভাবেই গড়ে উঠেছে শত শত ইউক্যালিপটাসের বাগান। এতে হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ। নিষিদ্ধ গাছটির চারা উৎপাদনের সরকারি নিয়ম-নীতির কথা জানেন না স্থানীয় নার্সারি মালিকরা। অন্যান্য বনজ বা ফলদ চারার চেয়ে এই চারা উৎপাদনে ২ থেকে ৩ গুণ বেশি লাভ হয়। এই লোভে তারা বেশি করে চারা উৎপাদন করছেন আর সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে এসব নিষিদ্ধ চারা রোপণে উৎসাহিত করছেন। ফলে স্কুল-কলেজ-মাদরাসার, বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত, রাস্তা-ঘাটে, খেলার মাঠে, হাটবাজারসহ ফসলের মাঠজুড়ে অন্যান্য ফসলের সঙ্গে ব্যাপকভাবে শোভা পাচ্ছে ইউক্যালিপটাস গাছ। সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত হয়ে পড়েছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল হোসেন বলেন, বিতর্কিত ইউক্যালিপটাস গাছ নিয়ে আমাদের দেশে বৃহৎ পরিসরে সে রকম কোন গবেষণামূলক কাজ হয়নি। প্রথম পর্যায়ে সরকার নিজে এই গাছের জন্য সবাইকে উৎসাহ দিয়েছেন। কিন্তু এই গাছ প্রচুর পানি শোষণ করে বলে খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর নীচে অন্য কোন গাছ জন্মায় না বলে এই গাছ পরিবেশবান্ধব নয়।

মতামত