টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

আটান্ন বছরের জীর্ণ ভবনে সরকারি আদিবাসী ছাত্রাবাস!

ইব্রাহিম খলিল
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ১৮ এপ্রিল ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: : বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির সমস্যা লেগেই আছে। এর সাথে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না করায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে একতলা ভবনটি। প্রায়ই খসে পড়ছে সিলিংয়ের ভাঙা অংশ।

চট্টগ্রামের পাথরঘাটার বান্ডেল রোডে অবস্থিত সরকারি আদিবাসী ছাত্রাবাসের এমন দুরাবস্থা। নামে সরকারি হলেও কোনো সেবা নেই এ ছাত্রাবাসে। এখানে নেই বৈধ কোন বিদ্যুৎ সংযোগ। প্রয়োজনের তাগিদে ছাত্ররাই চোরাইপথেই নিয়েছেন বিদ্যুৎ সংযোগ।

১৯৫৮ সালে নির্মিত এ ছাত্রাবাস ভবনে বর্তমানে প্রায় ২৫-৩০ জন আদিবাসী শিক্ষার্থী আছেন। যারা এখানে থেকেই লেখাপড়া করেন শহরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু চোরাইপথে বিকল্প বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে আতংকে দিন কাটছে তাদের।

নগরীর আন্দরকিল্লা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ১৬ নম্বর বান্ডেল রোডের মা ভবনের পাশেই অবস্থিত সরকারি আদিবাসী ছাত্রাবাস। শহরের বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধার কথা চিন্তা করে গড়ে তোলা হয় এ ছাত্রাবাস।

সরেজিমেন দেখা যায়, ছাত্রাবাসের একতলা ভবনে কমন রুমসহ মোট ৬টি কক্ষ রয়েছে। প্রতিটি কক্ষে ৪-৫ জন ছাত্র গাদাগাদি করে থাকে। এদের মধ্যে বেশিরভাই চট্টগ্রাম কলেজ, মহসীন কলেজ, সিটি কলেজ, বাকলিয়া কলেজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।

ছাত্ররা জানান, ছাত্রাবাসের পরিবেশ স্যাঁতসেঁতে। ভবনের ছাদ ও দেয়ালের বহু জায়গার পলেস্তারা খসে পড়ছে। কোনো কোনো দরজা-জানালা আধা ভাঙা বা পুরো ভাঙা অবস্থা। বৃষ্টি হলে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। চলে না মোটর। মেলে না পানি। দূরে অন্য কোথাও গিয়ে ¯œান করতে হয়।

ছাত্ররা আরও জানান, ছাত্রবাসে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই চার মাস ধরে। ছাত্রাবাসের পাশের একটি বৈদ্যুতিক লাইন থেকে বিকল্প ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া হয়েছে। গ্যাস সংযোগ আগে থেকে নেই। কেরোসিনের স্টোভ দিয়ে ছাত্ররা যে যার মতো করে খাওয়া-দাওয়া করছেন। রান্নাঘরও রয়েছে খোলা অবস্থায়। সরকারি কোনো সাহায্যও নেই।

গত বছর থেকে ছাত্রাবাসে অবস্থান করা কয়েকজন ছাত্র বলেন, আমরা দূর-দূরান্ত থেকে লেখাপড়া করার জন্য চট্টগ্রাম শহরে আসি। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে হোস্টেল না পেয়ে সুবিধার জন্য এ ছাত্রাবাসে উঠি। এখানেও আছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। কয়েক লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া। তাই লাইন কাটা। বিদ্যুৎ না থাকায় পড়ালেখা করতে সমস্যা হয়। গরমে এমনিতেই রুমে থাকা কষ্টকর। এর মধ্যেই মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়ালেখা করতে হয়।

ছাত্ররা অভিযোগ করেন, এখানে সরকারি কোন সাহায্য নেই। কমিটির মাধ্যমে ছাত্রাবাস পরিচালিত হলেও আদতে কমিটির কোনো কার্যকারিতা নেই। তারা ছাত্রাবাস দেখাশোনা করে না। সম্ভবত ১৯৯০ সালে ছাত্রাবাসের সংস্কার কাজ হয়েছিল। সে সময় কোনো ছাত্র ছিল না। ফলে অনেক টাকার বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়ে আছে। এ বকেয়া টাকা তো আমরা দিতে পারবো না।

বর্তমানে সরকারি আদিবাসী ছাত্রাবাসের তত্ত¡াবধায়কের দায়িত্ব পালন করছেন ইন্টুমনি তালুকদার। জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারি আদিবাসী ছাত্রাবাসের বিদ্যুৎ সমস্যা দীর্ঘদিনের। ২০০৬ সাল থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করি। কিন্তু এর আগ থেকেই বিদ্যুৎ বিল বকেয়া ছিল। বর্তমানে তা চক্রবৃদ্ধি হয়ে ১৩ লাখ টাকার মতো হয়ে গেছে। ছাত্রাবাস পরিচালনার জন্য ১১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি আছে। পরিচালনা কমিটির সভাপতি তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার এমএএন সিদ্দিক ও উপদেষ্টা পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন উপমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার ২০০৯ সালে ছাত্রাবাস পরিদর্শন করেছিলেন। ছাত্রদের দাবি-দাওয়া ও অভিযোগের ভিত্তিতে তখন তারা সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু তা আর হয়নি।

ইন্টুমনি তালুকদার জানান, দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রাবাস সংস্কার করা হয়নি। সরকারি কোনো ফান্ড আসে না। ছাত্রদের ফি থেকে ছাত্রাবাস পরিচালনা করা হয়। বর্তমান পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুরকে জানানোর পর তিনি বলে দিয়েছেন, পার্বত্য এলাকার বাইরে কোনো কাজ করতে পারবেন না।

বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বিক্রয় ও বিতরণ (পাথরঘাটা) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামাল হোসেন বলেন, ১৩ লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় সরকারি আদিবাসী ছাত্রাবাসের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতাল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বিদ্যুৎ বিল দেয়। তাদেরও বিদ্যুৎ বিল দিতে হবে। কে দেবে-সেটা আমরা বলতে পারি না। ১৩ লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় আমরা তিন-চার মাস আগে তাদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছি। বকেয়া বিল পেলে তাদের সংযোগ দেওয়া হবে।

মতামত