টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চামড়াশিল্প বাঁচাতে চট্টগ্রামে বিশাল ইটিপি প্ল্যান্ট

চট্টগ্রাম, ১৭ এপ্রিল ২০১৭ (সিটিজি টাইমস)::  চামড়া ব্যবসায় হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে যাচ্ছে বন্দরনগরী চট্টগ্রম। এই লক্ষ্যে ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ইফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) বাস্তবায়নসহ নতুন আঙ্গিকে রিফ লেদার নামে একটি প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরুর অপেক্ষায়। আগামী মাসেই কালুরঘাট শিল্প এলাকার এ কারখানায় দেশের সবচেয়ে বড় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ইটিপি প্ল্যান্ট পুরোদমে চালু হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে চামড়া ব্যবসার সাথে জড়িত ২৫ হাজার মানুষ আবারো কর্মচঞ্চল হবেন এ ব্যবসাকে ঘিরে।

রিফ লেদার লিমিটেড নামের এ প্রতিষ্ঠানে মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে পরীক্ষামূলক ইটিপি চালু হলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের সার্টিফিকেট নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু হবে একমাস পর। পুরোদমে কারখানায় কাজ হলে প্রতিমাসে ১০ লাখ বর্গফুট চামড়া প্রক্রিয়াজাত হবে অত্যাধুনিক এই কারখানায়। প্রত্যক্ষভাবে কারখানায় কর্মসংস্থান হবে তিন শতাধিক লোকের।

ইটিপি বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চট্টগ্রামে এ প্রথম। একইসাথে একক শিল্প প্রতিষ্ঠানে এতবড় ইটিপি দেশেও প্রথম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কারখানা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণ ‘ইকো ফ্রেন্ডলি’ ও আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ কারখানা করার কাজ শুরু হয় ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে। প্রায় শত কোটি টাকা বাজেটের এই প্রকল্পে ইটিপি বাস্তবায়নসহ সার্বিক কাজে এই পর্যন্ত প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অত্যাধুনিক জুতার কারখানাসহ ১০ তলা ভবনের পরিপূর্ণ প্রকল্প শেষ করতে বাকি টাকা ব্যয় করা হবে। প্রকল্প পুরো বাস্তবায়ন হলে এটাই হবে চট্টগ্রামে এ সেক্টরের বড় কারখানা। এতে চামড়া শিল্পে জাগরণ সৃষ্টি হবে।

সরকারিভাবে গড়ে উঠা ঢাকার সাভারের কারখানাগুলোতেও শতভাগ ইটিপি বাস্তবায়ন এখন প্রশ্নের মুখে। ঢাকায় ইটিপি বাস্তবায়নের মাধ্যমে হাজারিবাগের ট্যানারি কারাখানাগুলোকে পরিবেশসম্মত করার বিষয়টি হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। এক ধরনের অস্থিরতা চলছে ট্যানারি শিল্পে। এ অবস্থায় চট্টগ্রামেই চালু হচ্ছে ইটিপিনির্ভর চামড়া শিল্প। কারখানাটি চালু হলে চট্টগ্রামের চামড়া ব্যবসায়ীদের আর ঢাকার উপর নির্ভর করতে হবে না।

সূত্র মতে, চামড়া নিয়ে কয়েক বছর থেকেই অস্থিরতা চলছে চট্টগ্রামে। এখানে পরিবেশসম্মত কোন কারখানা না থাকায় চট্টগ্রামের চামড়া ব্যবসায়ীদেরকে ঢাকার ব্যবসায়ীদের দিকে তাকিয়ে থাকতে হত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ অবস্থার অবসান হবে রিফ লেদারে ইটিপি চালুর প্রেক্ষিতে।

এ বিষয়ে রিফ লেদারের পরিচালক (অপারেশন এন্ড সেলস) মোহাম্মদ মোখলেসুর রহমান জানান, শতভাগ পরিবেশ উপযোগী করে কারখানা নির্মাণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে চীন, জাপানসহ বিদেশি ক্রেতারা কারখানা পরিদর্শন করে আমাদের সঙ্গে ব্যবসা করতে বেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। এছাড়া ভালো ব্রান্ডের দেশীয় কারখানা মালিকদের কাছে এখানকার চামড়ার কদর রয়েছে আগে থেকেই। পুরোদমে কারখানার কাজ শুরু হলে চট্টগ্রামের স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আড়তদার থেকে চামড়া সংগ্রহ শুরু হবে। এতে গত কয়েক বছর চামড়া শিল্পে যে অচলাবস্থা ছিল তা আর থাকবে না।

চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তড়ার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি মুসলিম উদ্দিন বলেন, একের পর এক চট্টগ্রামে ট্যানারিগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত কয়েক বছর এই শিল্পে স্থবিরতা বিরাজ করছিল। ওই সময় বাধ্য হয়ে ঢাকার ট্যানারিগুলোর কাছে কম দামে ও বাকিতে চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে। গত বছরের চামড়া বিক্রির অনেক টাকা আমরা এখনো পাইনি। আগের চেয়ে আরো বড় আঙ্গিকে রিফ লেদার চালুর মাধ্যমে চট্টগ্রামের চামড়া শিল্পে নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে বলে আশা করছি। মদিনা ট্যানারিতে ইটিপি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। এটা চট্টগ্রামের চামড়া ব্যবসায়ীদের জন্য আশার আলো।

ইটিপি না থাকায় দুই বছর আগে ২০১৫ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সর্বশেষ দুটি ট্যানারি রিফ লেদার ও মদিনা ট্যানারি কারখানা বন্ধ করে দেয়। ফলে কাঁচা চামড়া বিক্রিতে বিপাকে পড়েন চট্টগ্রামের চামড়া ব্যবসায়ীরা।

জানা গেছে, বর্জ্য শোধানাগার না থাকায় পরিবেশদূষণের দায়ে সর্বশেষ ২০১৫ সালে অবশিষ্ট দুটি (মদিনা ট্যানারি ও রিফ লেদার) ট্যানারিও বন্ধ হয়ে যায়। ট্যানারিগুলো কোরবানির ঈদের সময় ছাড়াও সারা বছর চামড়া কেনার ফলে চট্টগ্রামের চামড়া ব্যবসায়ীরা নগদ টাকা পেতেন।

কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের বক্তব্য ছিল, প্রতিষ্ঠান দুটি চামড়া না কেনায় ঢাকার ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। গত দুই বছরের চামড়া বিক্রির টাকা এখনো পাওনা রয়েছে অনেক ব্যবসায়ীর। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন চামড়া ব্যবসার সাথে জড়িত খুচরা ব্যবসায়ী, কেমিক্যাল ব্যবসায়ী ও লবণ ব্যবসায়ীসহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ২৫ হাজার পরিবার।

এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক আজাদুর রহমান মল্লিক বলেন, বিষাক্ত বর্জ্যে পরিবেশদূষণের দায়ে আমরা ট্যানারি দুটি বন্ধ করে দিয়েছিলাম। এছাড়া আমাদের কোন উপায়ও ছিল না। এর মধ্যে রিফ লেদার অত্যাধুনিক একটি ইটিপি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি পরিশোধিত বর্জ্যের টেস্ট রিপোর্ট পেতে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে আবেদন করেছে। খুব শিগগিরই পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেয়া হবে। এর মাধ্যমে আমরা চামড়া ব্যবসাকে পরিবেশ সম্মতভাবে করার ক্ষেত্রে একটি নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসতে পারব।

চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ২০০টি চামড়ার গুদাম রয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। প্রতি বছর শুধু কোরবানির ঈদেই চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে পাঁচ লাখেরও বেশি গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগলের চামড়া সংগ্রহ হয়। এছাড়া প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১০ হাজার মহিষ ও গরুর চামড়া এবং আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার ছাগলের চামড়া সংগ্রহ হয় চট্টগ্রাম অঞ্চলে।

ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে উৎপাদিত কাঁচা চামড়ার মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ হয় চট্টগ্রামে। বছরের পর বছর চট্টগ্রামের ২২টি ট্যানারি এসব কাঁচা চামড়া কিনে তা সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতসহ রপ্তানিতে নিয়োজিত ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার নিম্মমুখী দর ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকতে না পেরে লোকসানে পড়ে ২০১০ সালের মধ্যে প্রায় ২০টি ট্যানারি বন্ধ হয়ে পড়ে। এতে চট্টগ্রামের কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা নির্ভরশীল হয়ে পড়ে উল্লিখিত দুই প্রতিষ্ঠানের উপর। কেননা চট্টগ্রামের মোট চামড়ার প্রায় ৭০ শতাংশ কিনে নিতো এই দুটি কারখানা। কিন্তু ইটিপি বাস্তবায়ন না করায় উল্লিখিত দুই ট্যানারিও বন্ধ করে দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত