টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

নাছির-মহিউদ্দিনের বিরোধ এখন প্রকাশ্যে

চট্টগ্রাম, ১১ এপ্রিল ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রাক্তন সিটি মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন এখন অনেকটা মুখোমুখি অবস্থানে।

মহিউদ্দিন চৌধুরী গতকাল সোমবার লালদীঘির মাঠে বড় সমাবেশ ডেকে নিজ দল ও নিজ কমিটির সাধারণ সম্পাদককে রীতিমত তুলোধুনো করেছেন। অথর্ব মেয়র ও খুনি উপাধী দিয়ে আ জ ম নাছিরকে দলের মধ্যে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।

পক্ষান্তরে মহিউদ্দিন চৌধুরীর বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেছেন, এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী মনের অন্তর্জ্বালা মেটানোর জন্য আমার বিরুদ্ধে এমন বক্তব্য দিচ্ছেন। তিনি আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করে নিজে স্বরূপ আত্মপ্রকাশ করেছেন।

চট্টগ্রামের নগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ এই দুই নেতার বিরোধ দীর্ঘদিনের। গত প্রায় ১০ বছরের বেশি সময় ধরে দুই নেতার মধ্যে বিরোধ থাকলেও এভাবে তা কখনো প্রকাশ্যে আসেনি। এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী যখন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ছিলেন তখনও আ জ ম নাছিরের সঙ্গে বিরোধ ছিল। বর্তমানে আ জ ম নাছির দলীয় মনোনয়ন নিয়ে মেয়র হওয়ার পর এই বিরোধ অনেকটা তীব্র এবং প্রকট হয়ে ওঠে।

গত এক বছরে চট্টগ্রাম নগরীর যেকোনো স্থানে যতগুলো দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ছাত্রলীগ, যুবলীগ বা সহযোগী সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে সবগুলোই হয়েছে আ জ ম নাছির গ্রুপ এবং মহিউদ্দিন চৌধুরী গ্রুপের মধ্যে।

এমন বিরোধের মধ্যে গত শনিবার চট্টগ্রাম নগরীর চশমাহিলের বাড়িতে নাতনির আকিকা অনুষ্ঠানে মহিউদ্দিন চৌধুরী নাছিরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলেন। এদিন নিজ বাড়ির ড্রয়িং রুমে বসেই মহিউদ্দিন সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘কথা একটাই, অযোগ্য-অথর্ব লোক চট্টগ্রামবাসী চায় না। দীর্ঘদিন ধরে আমি মহানগর আওয়ামী লীগকে তৈরি করেছি। চট্টগ্রামে রাজনীতির ক্ষেত্র তৈরি করেছি। আজ যা ইচ্ছা তা-ই করে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার চক্রান্ত করছে। আমি বঙ্গবন্ধুর কর্মী। অন্যায়কে জীবনে প্রশ্রয় দিই-নাই। আগামীতে যারা অন্যায় করবে, দলের ক্ষতি করবে, তাদেরকে ছাড় দেব না। সে আমার ছেলে হোক কিংবা দলের কোনো কর্মী হোক। তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই রুখে দাঁড়াব। ’

এরপর গতকাল সোমবার লালদিঘীর মাঠে সমাবেশ ডেকে আ জ ম নাছিরকে রীতিমতো তুলোধুনো করেন তিনি। নাছিরকে অযোগ্য অথর্ব মেয়র উল্লেখ করে তার অপসারণ চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব নিয়ে যাবেন বলে জানান।

দীর্ঘদিন ধরে দুজনের মধ্যে বিরোধ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে এই বিরোধ তীব্র হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানা যায়, চট্টগ্রামের আউটার স্টেডিয়ামে চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থা (সিজেকেএস) সুইমিংপুল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন আ জ ম নাছির। এ বিষয়ে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অভিযোগ হল সুইমিংপুলের নামে অতিরিক্ত জায়গা নিয়ে ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছেন সিজেকেএস সাধারণ সম্পাদক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন।

এ ছাড়া সম্প্রতি শেষ হওয়া বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) চট্টগ্রাম শাখার নির্বাচনে মহিউদ্দিন চৌধুরী একটি প্যানেলের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু তার সমর্থিত প্যানেলের ভরাডুবি হয়। বিজয়ী হয় নাছিরের সমর্থিত প্যানেল।

অন্যদিকে নাছির ও মহিউদ্দিন চৌধুরীর মধ্যে সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন একটি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও তীব্র বিরোধ রয়েছে। প্রাক্তন মেয়র এম মনজুর আলমের মেয়াদ পর্যন্ত মহিউদ্দিন চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ন্ত্রণ করতেন। তিনি যা বলতেন তাই কার্যকর হতো। ট্রাস্টি বোর্ডের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রাক্তন মেয়র ওই বোর্ডের সদস্য হবেন এমন একটি ধারার কল্যাণে মহিউদ্দিন বোর্ডে ছিলেন। কিন্তু মনজুর আলমের পর নাছির মেয়র নির্বাচিত হলে প্রাক্তন মেয়র হিসেবে মহিউদ্দিনের পরিবর্তে মনজুর আলম বোর্ডের সদস্য হিসেবে মনোনীত হওয়ার কথা। এতে মহিউদ্দিন যথানিয়মে বাদ পড়ে যান। এই নিয়ে বিবাদের জেরে শেষ পর্যন্ত মহিউদ্দিন প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা করেন। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।

এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে নাছির উদ্দিন বলেন, সিটি করপোরেশনের জায়গায়, সিটি করপোরেশনের অর্থায়নে এই বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা হয়েছে। তাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক সিটি করপোরেশন।

এদিকে প্রকাশ্যে জনসভায় অপসারণ দাবিসহ নানা অভিযোগ তুলে মহিউদ্দিন চৌধুরীর বক্তব্য প্রসঙ্গে নাছির উদ্দিন বলেন, সোমবারের লালদিঘীর সমাবেশের মাধ্যমে মহিউদ্দিন চৌধুরী স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেছেন। এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী দীর্ঘ ১৭ বছর মেয়র হিসেবে দায়িত্বপালনকালে চট্টগ্রাম শহরকে জঞ্জালের শহরে পরিণত করেছেন। আমি দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র এক বছর আট মাস। এরই মাঝে বিলবোর্ডের জঞ্জাল অপসারণ করেছি। ডোর-টু-ডোর আবর্জনা সংগ্রহের মাধ্যমে শহরকে দুর্গন্ধ ও আবর্জনামুক্ত করার কাজ শুরু করেছি।’

তিনি বলেন, মহিউদ্দিন চৌধুরী এই শহরে খাল-নালা এবং ফুটপাত দখলের সংস্কৃতি চালু করেছেন। তিনিই খাল-নালার ওপর বিশ্ববিদ্যালয় এবং মার্কেট নির্মাণ করেছেন। যত বাধাই আসুক, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন। নগরবাসী এই দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিয়েছেন। নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে এই শহরকে জঞ্জাল এবং দুর্গন্ধমুক্ত গ্রিন ও ক্লিন সিটিতে পরিণত করবো।

মতামত