টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

বৈসাবি: পাহাড়ি পল্লীগুলোতে সাজ সাজ রব

চট্টগ্রাম, ১১ এপ্রিল ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের প্রধান সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’। ১৪ এপ্রিল ক্যায়াং দর্শন ও সমবেত প্রার্থনার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে এ উৎসব। উৎসবকে ঘিরে পাহাড়ি পল্লীগুলোর ঘরে ঘরে চলছে উৎসবের আমেজ। ইতিমধ্যে এলাকাভিত্তিক নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে উৎসবকে বরণ করে নেয়ার যাবতীয় আয়োজন। চলছে পাহাড়ি পল্লীগুলোতে সাজ সাজ রব। কেন্দ্রীয়ভাবে বান্দরবান সদর ও উপজেলা সদরসহ উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের পাড়াগুলোতে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ক্লাব ও সমিতির উদ্যোগে সাংগ্রাইং পোয়ে জলকেলি উৎসব পৃথকভাবে অনুষ্ঠিত হবে। উৎসবের দিনগুলোতে আনন্দে হয়ে উঠবে পাহাড়ি বাঙ্গালির সম্প্রীতির এক মিলনমেলা।

বান্দরবানের লামা উপজেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায় বর্ষবরণকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হিসেবে পালন করে। ১৯৮৫ সাল থেকে পাহাড়ে বসবাসরত বিভিন্ন সংগঠনের সম্মিলিত উদ্যোগে ‘বৈসাবি’ নামে এ উৎসব পালন করে আসছে। যা সময়ের ব্যবধানে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে ‘বৈসাবি’ শব্দটি জনপ্রিয় হয়ে উঠে। এ উৎসবকে সামনে রেখে উপজেলার হাটবাজারে কেনাকাটা ধুম পড়েছে। বিপনী বিতানগুলোতে পাহাড়িদের তরুণ-তরুণীদের উপচেপড়া ভিড়। ১৪ এপ্রিল শুরু হয়ে উৎসব শেষ হবে ১৭ এপ্রিল।

বর্ষবরণ ও বিদায় উৎসবকে ত্রিপুরা সম্প্রদায় ‘বৈসুক’, মারমা সম্প্রদায় ‘সাংগ্রাই’ এবং চাকমা সম্প্রদায় ‘বিজু’ নামে এ উৎসব পালন করেন। একত্রে ৩টি আদ্যাক্ষর নিয়ে বৈ-সা-বি বলে পাহাড়ে এই উৎসব পরিচিত। চৈত্রের শেষ দিনের আগের দিনকে বলা হয় ফুল বিজু। এদিনে ফুল দিয়ে ঘরবাড়ি সাজানো হয়। দ্বিতীয় দিন চৈত্র সংক্রান্ত ‘বৈসাবি’ অথবা মূল বিজু। এদিনকে উৎসবের প্রধান দিন ধরে নেয় চাকমারা। ত্রিপুরা ও মারমারা এদিন পালন করলেও তাদের জন্য ১ বৈশাখ হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ দিন। মূল বিজুর সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে ‘পাচন’ (অনেক রকমের শাকসবজি, ফলমূলের সমন্বয়ে রান্না করা তরকারি)।

এই পাচনে যে যত পদের সবজি মেশাতে পারবে তার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এদিন নতুন কাপড় পরে বাড়ি বাড়ি বেড়ানো, পাজন খাওয়া চাকমাদের আনন্দ উদযাপনের মূল আয়োজন।

চাকমাদের মধ্যে প্রচলিত আছে, বিজুর দিন কমপক্ষে পাঁচ বাড়িতে বেড়াতে হবে। এসব বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে পাজন খেলে পরবর্তী ৩ মাস কোন রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হবে না কেউ। পাচনের সঙ্গে ভাত থেকে তৈরি পানীয় অর্থাৎ দো-চুয়ানী (বাংলা মদ)। এই দো-চুয়ানী ছাড়া চাকমা সমাজে বিজু, বিয়ের অনুষ্ঠান কখনও সম্পন্ন হয়না। এই রীতি এখানে প্রচলিত। আর এই দিন বাংলা মদ খেতে কোন বাধা নেই। খাও দাও অনাবিল আনন্দে মেতে ওঠে। এটাই রীতি।

ত্রিপুরা সম্প্রদায় এদিন উদযাপন করে তাদের ঐতিহ্যবাহী বিশেষ নাচের মাধ্যমে। যার নাম ‘গড়াইয়্যা নৃত্য’। নারীপুরুষ সবাই এক সঙ্গে নাচে। এ নাচের বিশেষত্ব হচ্ছে, যে বাড়ি থেকে এ নাচ শুরু হবে সে বাড়িতেই এসে নাচ শেষ করতে হবে। ত্রিপুরাদের এই উৎসবকে ‘বৈসুক’ বলে। মারমা সম্প্রদায় ১ বৈশাখ পালন করে বর্ণিল জলকেলি বা পানি উৎসবের মধ্য দিয়ে। পুরনো বছরের সব দুঃখ হতাশাকে মুছে ফেলার জন্য জল ছিটানো উৎসব (পানি খেলা), যা মারমা সম্প্রদায়ের ‘সাংগ্রাই’ উৎসব নামে পরিচিত। অবশ্য আধুনিকতার ছোঁয়ায় চাকমাদের সাংগ্রাই উৎসবের নাম এখন ‘ওয়াটার ফেস্টিভ্যাল’ রাখা হয়েছে। নারীপুরুষ মারমা গানের তালে তালে একে অপরকে পানি ছিটিয়ে একে অপরকে জলে টুইটুম্বুর করে ভেজানোর প্রতিযোগিতা করেন। এই জলকেলির মাধ্যমে মারমা তরুণ-তরুণী একে অপরের মাঝে ভালোবাসার বিনিময় করেন।

একইভাবে ত্রিপুরা, বম, পাংখোয়া সম্প্রদায়গুলোও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নিজস্ব খাবারের আয়োজন করছে। বৈসাবি উৎসবকে ঘিরে পাড়ায় পাড়ায় নানা খেলাধুলার আয়োজন করা হয়েছে। এসব খেলার মধ্যে রয়েছে ঘিলাখেলা, নাদেরখেলা, বলিখেলা, ফোরখেলা, পুত্তিখেলা ও তুমুরো খেলা এবং তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে উপরে উঠা। আয়োজক ও জনপ্রতিনিধিদের মতে পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় এবার উৎসবমখুর পরিবেশে বৈসাবি পালনে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

লামা উপজেলা কেন্দ্রীয় ‘বৈসাবি’ উৎসব উদ্যাপন কমিটির আহবায়ক মংচাই মার্মা বলেন, পরিবেশ-পরিস্থিতি ভালো থাকায় এবারও উৎসবমখুর পরিবেশে বৈসাবি উদযাপিত হবে। বৈসাবিকে সামনে রেখে ১৪ এপ্রিল থেকে ৪ দিনের বর্ণাঢ্য কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ক্যায়াং দর্শন ও সমবেত প্রার্থনা, দড়ি টানাটানি, হাড়িভাঙ্গা, পিঠা তৈরি, ঐতিহ্যবাহী তৈলাক্ত বাঁশ আহরণ, পানি খেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান। শান্তিপূর্ণ বৈসাবি উৎসর পালনের মধ্য দিয়ে পাহাড়ি-বাঙ্গালীর মধ্যে শান্তিসম্প্রীতি ও ঐক্য আরো সুদৃঢ় হোক এই প্রত্যাশা এখন সকলের।

এ বিষয়ে লামা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, বৈসাবি উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে পালনের জন্য বৌদ্ধ কেয়াংগুলোতে আনসার ভিডিপি ও পুলিশ মোতায়েনসহ বিশেষ নজর রাখা হয়েছে।

মতামত