টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

হালখাতা: প্রযুক্তির উন্নয়নে জৌলুস হারাতে বসেছে ঐতিহ্য

চট্টগ্রাম, ১০ এপ্রিল ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: বৈশাখ মাস বিশেষত পহেলা বৈশাখের সাথে সম্পৃক্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হালখাতা তার ঐহিত্য হারাতে বসেছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে হালখাতার আবেদন কমে আসছে। নতুন বছরে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নতুন করে গতি আনার লক্ষ্যে ব্যবসায়ী সমাজ তাদের খরিদদারদের জন্য হালখাতা নামে একটি সামাজিক মিলন মেলার আয়োজন করেন।

এ মিলন মেলায় খরিদদাররা আগ্রহের সঙ্গে যোগ দিয়ে পুরনো বাটি টাকা পুরো বা আংশিক শোধ করেন। ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা থাকে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে একটি ভালো দিনের সূচনার। তাই দোকানে দোকানে বাহারি ফুল আর ফেস্টুনের সাজসজ্জা হয়। ব্যানারে সাঁটানো থাকে ‘শুভ নববর্ষ, শুভ হালখাতা’। নতুন পোশাক আর হিসাবের নতুন খাতা খুলে ভোক্তাদের জন্য দোকানিো অধীর অপেক্ষা করেন। পুরাতন বছরের বকেয়া পরিশোধের পর মিষ্টিমুখ। একে অন্যকে জড়িয়ে কোলাকুলি।

তবে বাঙালির চিরচেনা মিলনমেলার উৎসব হালখাতা উদযাপনের এমন দৃশ্য আজ আর নেই বললেই চলে। প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি ও পারস্পরিক আস্থার সংকটে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ উৎসব অনেকটাই যেন রং হারিয়েছে। একই সাথে সরকার নির্ধারিত বাংলা বর্ষপঞ্জি ও সনাতনি পাঁজির পার্থক্যের কারণেও দেশজুড়ে অনেকটাই জৌলুস হারিয়েছে হালখাতার উৎসব। তবে উৎসব মেজাজে না থাকলেও হালখাতার চল এখনো কিছুটা টিকে আছে গ্রামীণ জনপদে।

হালখাতার মানে হলো নতুন বছর শুরু। শুরু নতুন একটি খাতা খোলা, হিসাব-নিকাশ হালনাগাদ করা। তবে দোকানগুলোতে আগের মতো এ চিত্রের দেখা এখন মেলে না। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার হাতে লেখা খাতা থেকে অনেককে নিষ্কৃতি দিয়েছে। ১০ থেকে ১৫ বছর আগেও আড়ত ও দোকানগুলোতে হালখাতার যে জাঁকজমক অনুষ্ঠান দেখা যেত, তা এখন আর নেই।

আগে ব্যবসায়ীরা মুখের কথায় বিশ্বাস করে লাখ লাখ টাকা বাকি দিতেন। তার বেশিরভাগই উসুল হতো হালখাতার দিনে। এখন লেনদেনটা অনেকে ব্যাংকের মাধ্যমে চুকিয়ে নেন। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পাল্টে গেছে আয়োজনের ধরন। সেই দিন আর নেই। নেই সেই হালখাতা উৎসবও। অথচ সর্বজনীন উৎসব হিসেবে ‘হালখাতা’ ছিল বাংলা নববর্ষের প্রাণ।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, হিন্দু সৌরপঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারোটি মাস অনেক আগে থেকেই পালিত হত। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হত গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হত। এর পরে মুঘল সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। আর এর সাথে শুরু হয় বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া।

মোগল আমল থেকেই পয়লা বৈশাখে অনুষ্ঠান করা হতো। প্রজারা চৈত্র মাসের শেষ পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করতেন এবং পয়লা বৈশাখে জমিদাররা প্রজাদের মিষ্টি মুখ করানোর পাশাপাশি আনন্দ উৎসব করতেন। এ ছাড়া ব্যবসায়ী ও দোকানদার পয়লা বৈশাখে ‘হালখাতা’ করতেন। কিন্তু ডিজিটালের ভিড়ে বাঙালির ঐতিহ্য হালখাতা যেন দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যর এই প্রাণের হালখাতা উৎসব যেন আজ আধুনিক যুগের অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তির পৃথিবীর কাছে ধোপে টিকতে পারছে না।

ব্যবসায়ীরা জানান, অধিকাংশই নতুন খাতা শুরু করেন নিজ নিজ সৃষ্টিকর্তার নামে। হিন্দুরা পয়সায় সিঁদুর মেখে নতুন খাতায় ছাপ দিয়ে থাকেন। এরপর শুরু করেন নতুন বছরের লেনদেনের হিসাব। হালখাতা শুধু হিসাবের নতুন খাতা খোলার বিষয়ই নয়, পাওনা আদায়ের পাশাপাশি ক্রেতাদের আপ্যায়নের বিষয়টিও জড়িয়ে আছে। অথচ চিরচেনা হাতে লেখা খাতার ব্যবহার বেশি একটা দেখা যায়নি। দোকানে কম্পিউটার বা মোবাইলের মাধ্যমে পণ্য বেচাকেনার হিসাব রাখা হচ্ছে। ফলে ক্যাশিয়ারের পাশে থাকা চিরচেনা লাল কাগজে মোড়ানো হিসাবের হালখাতার বইটিও যেন আর তেমন চোখে পড়ে না। এছাড়াও হালখাতা অনুষ্ঠানের আগ্রহ নেই নতুন প্রজন্মের ব্যবসায়ীদের কাছে। তাই বাংলা বছর শেষে, দোকানে দোকানে যে হালখাতার অনুষ্ঠান হতো তাও যেন আজ হারিয়ে যাচ্ছে।

খিলগাঁওয়ের মুদি দোকানী ইমতিয়াজ ইকরাম বলেন, একসময় হালখাতা আমাদের বড় উৎসব হলেও এখন যেন সব হারিয়ে গেছে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এখনকার ক্রেতারা নগদের পরিবর্তে চেকে লেনদেন করেন। মাল কেনার জন্য এক শ্রেণীর ক্রেতা এখন আর দোকানে আসেন না। মোবাইলেই পণ্যের অর্ডার দেন। মাল পাঠিয়ে দেয়ার পর ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করেন। ফলে হালখাতায় পুরনো ঐতিহ্য আর দেখা যায় না।

তবে তিনি বলেন, হালখাতার আবেদন আগের চেয়ে অনেক কমেছে এটা ঠিক, তবে একেবারে ফুরিয়ে গেছে এটা বলা যাবে না। হালখাতায় হিসেব নিকেষ হয়তো বন্ধ আছে, কিন্তু রেওয়াজটা রয়ে গেছে।

হালখাতার বড় পরিসরে আগের উৎসব ঐতিহ্য এবং বর্তমানে এর পরিসর কমে আসা বিষয় নিয়ে প্রবীণ স্বর্ণ ব্যবসায়ী গণেশ হাওলাদার বলেন, আগে হালখাতা উৎসব অন্য রকম একটা আনন্দ ছিলো। যার যার সাধ্য মত কার্ড ছাপানো হতো আর কার্ডে লেখা থাকতো এলাহী ভরসা, আর হিন্দুরা তাদের কাডের্র ওপর লিখতো শ্রীশ্রী সিদ্ধিদাতা গণেশায় নমঃ, শুভহালখাতা। ব্যাপক পরিসরে উৎসব আনন্দে হালখাতা পালন করা হতো। কিন্ত বর্তমানে চাকরিজীবী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীরা প্রায় সবাই ইংরেজি মাসের ওপর ভিত্তি করে আয় ব্যয় করেন। নগদ বিক্রি অথবা বাকি লেনদেন সবই হয় ইংরেজি মাসের ওপর ভিত্তি করে। তাই ধীরে ধীরে পহেলা বৈশাখে হালখাতা প্রথা হারিয়ে যাচ্ছে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত