টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

অবৈধ অস্ত্র তৈরীর কাঁচামালের উৎস ‘জাহাজভাঙা শিল্প’

ইব্রাহিম খলিল
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস

চট্টগ্রাম, ১০ এপ্রিল ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: বঙ্গোপসাগরের তীরে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে গড়ে উঠা ‘জাহাজভাঙা শিল্প’ অবৈধ অস্ত্র তৈরীর কাঁচামালের উৎস। চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

গোয়েন্দা পুলিশ সূত্র জানায়, পরিত্যক্ত জাহাজ থেকে চাহিদামতো প্রয়োজনীয় লোহা, লোহা থেকে তৈরী হাতল ও ট্রিগার, পাইপ, স্ক্রু ও ¯িপ্রং সংগ্রহ করা হচ্ছে। এছাড়া ড্রিল মেশিন, লোহা কাটার বেøড ও তার কাটার যন্ত্র দিয়ে সহজেই তৈরী করছে অবৈধ অস্ত্র।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার মো. কামরুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, কক্সবাজারের মহেশখালী, বান্দরবানসহ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন পাহাড়ি জায়গায় গড়ে তোলা কয়েকটি অস্ত্র কারখানার কাঁচামালের জোগানদাতা এই জাহাজভাঙা শিল্প। যেখান থেকে সহজে স্বল্পমূল্যে অস্ত্র তৈরীর সরঞ্জাম সংগ্রহ করছে জঙ্গিরা।

তিনি বলেন, গত বছর কক্সবাজারের মহেশখালীর পাহাড়ে অস্ত্র কারখানার সন্ধান পাওয়া যায়। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এ সময় অভিযান চালিয়ে এ কারখানা থেকে বিপুল পরিমান অস্ত্র ও অস্ত্র তৈরীর সরঞ্জাম উদ্ধার করে। এ কারখানাটি সন্দেহভাজন জঙ্গিদের। অভিযানের সময় কারখানা থেকে দুই জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও অনেক জঙ্গিরা চলে যায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের পাঁচলাইশ থানার সেকেন্ড অফিসারের দায়িত্বে আছেন এসআই রাজু আহমেদ। মহেশখালীর পাহাড়ে অস্ত্র কারখানায় অভিযানে ছিলেন তিনি। তখন তিনি এসআই হিসেবে কর্মরত ছিলেন মহেশখালী থানায়।

অস্ত্রের কাঁচামালের উৎস স¤পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে রাজু আহমেদ বলেন, মহেশখালী থানায় থাকাকালীন তদন্ত করতে গিয়ে জেনেছি, অস্ত্র তৈরীতে ব্যবহার করা কাঁচামালগুলো সীতাকুন্ডের পরিত্যক্ত জাহাজ থেকে সংগ্রহ করা হয়। দাম কম হওয়ার কারণে সেখান থেকে অস্ত্র তৈরীর সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয় সবচেয়ে বেশী। যার কারণে মহেশখালীর পাহাড়ে তৈরী হওয়া অস্ত্রের উৎপাদন খরচও অনেক কম।

তিনি জানান, ভৌগোলিক কারণে কক্সবাজারের মহেশখালীতে সচল রয়েছে বেশ কিছু অস্ত্র কারখানা। এই এলাকায় রয়েছে অর্ধশতাধিক অস্ত্র কারিগর। অস্ত্রের অর্ডার পেলেই নিজস্ব কারখানায় অস্ত্র তৈরি করেন তারা। এছাড়া অর্ডার দিলে নির্দিষ্টস্থানে অস্ত্র পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থাও রেখেছেন অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। কয়েকটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব অস্ত্র পরবর্তীতে দেশজুড়ে জঙ্গিদের হাতে পৌছে যাচ্ছে। এমনকি হাতে পেয়ে যাচ্ছে রাজনৈতিক দলের অসাধু কর্মীরাও।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা এ প্রসঙ্গে বলেন, জাহাজভাঙা শিল্পের বিষয়ে গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারী রয়েছে। তবে এ শিল্প কারখানা তদারকি করে পরিবেশ অধিদপ্তর ও শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন। এখানে এমন কিছু বিষয় আছে, যেগুলো আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনা। এরপরও অপরাধ সংক্রান্ত হওয়ায় এ বিষয়ে খোঁজখবর নিতে আমি সীতাকুন্ড থানার ওসিকে নির্দেশ দেব।

প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে মাদক প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেভাবে সফলতা পাচ্ছে, সে তুলনায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারে সফলতা চোখে পড়ছে কম। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক কর্মীদের হাতে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র চলে যাওয়ার খবরও রয়েছে।

তিনি বলেন, গত ৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বাকলিয়া থানা এলাকায় প্রতিপক্ষের গুলিতে আহত হন নগর ছাত্রলীগের সদস্য তানজিরুল হক। এর আগেরদিন ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে পাঁচলাইশ থানা এলাকায় মো. জুয়েল নামের এক ব্যবসায়ী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ দুই ঘটনায় জড়িতরা আজ শুক্রবার পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়নি।

চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার যে বেড়েছে, তা পুলিশের হিসাবই বলে দিচ্ছে। চট্টগ্রাম নগর পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় ১৬০টি মামলায় ৩৭১ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। একই সময়ে ১০০টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়।

২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১০১টি ও গ্রেপ্তার হয়েছেন ২৫১ জন। আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার ৯৩টি। ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম নগরে উদ্ধার হয়েছে একটি রাইফেল, ১৮টি একনলা বন্দুক, চারটি ওয়ান শ্যূটার গান, ৪৪টি এলজি, ২০টি বিদেশী পিস্তল, দুটি দেশী পিস্তল, চারটি রিভলবার, একটি পাইপগান, তিনটি কাটা বন্দুক, একটি শর্টগান, একটি দুনলা বন্দুক ও একটি একে-২২ রাইফেল।

অভিযোগ রয়েছে, যে পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশী পরিমাণ অস্ত্র মজুদ আছে সন্ত্রাসীদের কাছে। এসব অস্ত্র ছিনতাই-চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে প্রতিনিয়ত ব্যবহার হচ্ছে।

সূত্র জানিয়েছে, বিদেশী অস্ত্রগুলোর কিছু অংশ ফেনী ও খাগড়াছড়ির সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে চট্টগ্রামে আসছে। এর বাইরে তিন পার্বত্য জেলার সন্ত্রাসী সংগঠন ও মায়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছ থেকেও অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহ করে আসছে চট্টগ্রামের অবৈধ অস্ত্রধারীরা।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (জনসংযোগ) আনোয়ার হোসেন বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অস্ত্র ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। সা¤প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকজন অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী, বহনকারী এবং ব্যবহারকারীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত