টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

১২৫৫ লাইটারেজ জাহাজ এখন ভাসমান গুদাম

চট্টগ্রাম, ০৯ এপ্রিল ২০১৭ (সিটিজি টাইমস)::গুদাম ভাড়া থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পাওয়ার জন্য সুযোগ পেলেই আমদানিকারকরা অনুমোদন ছাড়াই লাইটারেজ জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করে। প্রাপ্ত হিসেব মতে এই মুহূর্তে প্রায় চৌদ্দ লাখ টন পণ্য নিয়ে ১২৫৫টি লাইটারেজ জাহাজ ভাসমান গুদাম হিসেবে দেশের বিভিন্ন নদীতে ভাসছে।

এসব জাহাজে শত শত কোটি টাকার পণ্য রয়েছে। গুদাম ভাড়া কমিয়ে আনতেই এসব জাহাজকে ভাসমান গুদাম বানানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এক একটি জাহাজ সর্বোচ্চ চল্লিশ দিন থেকে সর্বনিম্ন বিশ দিন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে নদীতে ভাসছে।

সময়মতো জাহাজগুলো থেকে পণ্য খালাস না করায় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আমদানিকৃত পণ্য বোঝাই মাদার ভ্যাসেলের অবস্থানকাল বেড়ে যাচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী লাইটারেজ জাহাজ না পাওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে জাহাজ জট তৈরি হচ্ছে। বিষয়টিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক উল্লেখ করে বলা হয়, স্বাভাবিকভাবে একটি জাহাজ যেখানে ১৫ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করে সেকেন্ড ট্রিপের জন্য প্রস্তুত হওয়ার কথা, সেখানে চল্লিশ দিন ধরে ভাসমান গুদাম হয়ে থাকায় অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন খাতে স্বাভাবিক উৎপাদনশীলতা ব্যাহত হচ্ছে। একই সময়ে ১২৫৫টি লাইটারেজ জাহাজ ভাসমান গুদাম হয়ে উঠার ঘটনা নজিরবিহীন বলেও উল্লেখ করা হয়।

দেশের আমদানি বাণিজ্যের আশি শতাংশেরও বেশি পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এসব পণ্য নিয়ে আসা বড় বড় মাদার ভ্যাসেল সরাসরি জেটিতে বার্থিং নিতে পারে না। বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থান করে এসব জাহাজ পণ্য খালাস করে। কোন কোন জাহাজ বহির্নোঙরে সমুদয় পণ্য খালাস করে আবারো বিদেশের পথ ধরে। আবার কোন কোন জাহাজ বহির্নোঙরে কিছু পণ্য খালাস করে জাহাজের ড্রাফট কমিয়ে বন্দরের জেটিতে প্রবেশ করে।

বন্দরের জেটিতে বার্থিং নেয়া জাহাজের ওভারসাইট থেকেও বিপুল পরিমাণ পণ্য খালাস করা হয়। বহির্নোঙর ও জেটিতে অবস্থানকারী জাহাজের ওভারসাইট থেকে কেবলমাত্র লাইটারেজ জাহাজেই পণ্য খালাস করা হয়। বিপুল পরিমাণ সিমেন্ট ক্লিংকার ছাড়াও গম, সরিষা, সারসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়।

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে বন্দর চ্যানেলের নানা ঘাট এবং ঢাকা, মিরপুর, নগরবাড়ি, বাঘাবাড়ি, নোয়াপাড়া, খুলনা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্নস্থানে এসব জাহাজ পণ্য পরিবহন করে। চট্টগ্রামস্থ সিইউএফএল ও কাফকোর উৎপাদিত সারের একটি অংশও বিসিআইসির নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন জেলার গুদামে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পাঠানো হয়। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে প্রায় দেড় হাজার লাইটারেজ জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজের স্বাভাবিক চলাচলের উপর চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরসহ দেশের পণ্য পরিবহন নেটওয়ার্ক পুরোপুরি নির্ভর করে।

জাহাজ মালিকদের সংগঠন ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের (ডব্লিউটিসি) তত্ত্বাবধানে এসব জাহাজ চলাচল করে। ডব্লিউটিসি এজেন্টদের চাহিদা অনুযায়ী জাহাজ বরাদ্দ দেয়। এক একটি জাহাজ মাসে গড়ে দুই ট্রিপ পণ্য পরিবহন করার কথা। এই হিসেবে দেশে বিদ্যমান লাইটারেজ জাহাজের অন্তত সাড়ে পাঁচ কোটি টন পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু নানামুখী অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত এ খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

ডব্লিউটিসির এক হিসেবে দেখা যায়, দেশের ৪৮টি ঘাটে ১২৫৫টি লাইটারেজ জাহাজ ১৩ লাখ ৫৬ হাজার ৫৪৪ টন পণ্য নিয়ে ভাসছে। এসব জাহাজে স্ক্র্যাপ, টিএসপি, গম, ভুট্টা, পাথর, এমওপিসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য রয়েছে। এসব লাইটারেজ জাহাজের মধ্যে ১১০টি ভাসছে ত্রিশ দিনের বেশি। ২০০টি জাহাজ ৩৫দিনের বেশি। সরকারি ইউরিয়া সার নিয়ে ১১৫টি জাহাজ ভাসছে ৩০দিনের বেশি। ৯০টি ভাসমান গুদাম হিসেবে ২০দিন পার করেছে।

১২৫৫টি জাহাজকে ভাসমান গুদামে পরিণত করার পাশাপাশি ২০০টির মতো জাহাজ ডকে রয়েছে। এতে লাইটারেজ জাহাজ সংকট শুরু হয়েছে। এর জের ধরে বহির্নোঙরে অন্তত ৪০টি মাদার ভ্যাসেলে পণ্য খালাস ব্যাহত হচ্ছে। এতে জাহাজের অবস্থানকালও বেড়ে যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে ডব্লিউটিসির একজন কর্মকর্তা বলেন, লাইটারেজ জাহাজগুলোকে গুদাম বানানো না হলে পরিস্থিতি এত নাজুক হতো না। আমদানিকারকরা জাহাজকে গুদাম বানানোর ফলেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থার উত্তরণে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত