টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

বজুলল কবিরের চোখে-মুখে রিপেয়ার বাংলাদেশের স্বপ্ন

ইব্রাহিম খলিল
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস

চট্টগ্রাম, ০৬ এপ্রিল ২০১৭ (সিটিজি টাইমস)::  তিনি একজন সরকারি কর্মকর্তা। যাদের হাত-পা আইনে বাঁধা। কিন্তু সব কিছুকে ছাপিয়ে রিপেয়ার বাংলাদেশের স্বপ্ন তাঁর চোখে-মুখে। তিনি আর কেউ নন কর অঞ্চল-১ চট্টগ্রামের অতিরিক্ত কর কমিশনার জনাব মো. বজলুল কবির ভূঞা। খুব বেশি না হলেও সুধীজনদের কাছে পরিচিত মুখ তিনি। যাও হয়েছে মানুষের কল্যাণে কাজের কারণেই।

নিজেকে পরিচিতি করতে খুব একটা আগ্রহীও নন তিনি। তিনি বুঝেন শুধু মানব কল্যাণে কিছু করা। কেন তা জানতে চট্টগ্রামের প্রথম অনলাইন নিউজ পোর্টাল সিটিজি টাইমস ডটকম এর পক্ষ থেকে গতকাল বুধবার কর অঞ্চল-১ চট্টগ্রাম কার্যালয়ে তাঁর মুখোমুখি হয়েছিলাম।

প্রায় ঘন্টাব্যাপী কথোপকোথনের শুরুটা ছিল সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আইনি বাঁধা নিয়ে। তিনি বলেন, সরকারি কর্মঘন্টা শেষে তো কেউ হাত গুটিয়ে বসে থাকেন না। পরিবারসহ নিজেদের ব্যক্তিগত কাজ সব কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই করেন। আর তাছাড়া সরকার তো নিষেধ করেনি জনহিতকর কোন কাজ করতে। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে সরকার আমাকে দিয়ে যা করাচ্ছেন তাও জনকল্যাণে। এ অবস্থায় সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে যদি আমি কোন কাজ করি তা দোষের?

তিনি বলেন, সরকার দেশ ও জাতি গঠণে নিরলস শ্রম দিচ্ছে। যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে সরকারের একার দায়িত্ব নয়। প্রত্যেক নাগরিকের উচিত এ কাজে অংশগ্রহণ করা। তাহলে সহজেই উন্নত জাতি ও দেশে পরিণত হবো আমরা। তাই সরকারের পাশাপাশি রিপেয়ার বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি আমি।

সেটা কি এবং কিভাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন সড়কে অসংখ্য গর্ত রয়েছে। নিজ উদ্যোগে আয়ের সামান্য কিছু টাকা খরচ করে যদি সে গর্ত ভরাট করা হয় তাতে কি সড়কটি রিপেয়ার হয় না। এভাবে দেশের সচেতর নাগরিক যারা নিজ দায়বদ্ধতা থেকে যদি এভাবে কিছু করে তাহলে বাংলাদেশ রিপেয়ার হবেই।

তিনি বলেন, আমরা যারা দেশের সাধারণ মানুষের টেক্সের টাকায় পড়ালেখা করেছি। তারা এদেশের সেই মানুষগুলোর কাছে ঋণী। ঋণ শোধে কিছু করার প্রত্যয়ই হচ্ছে দায়বদ্ধতা।

শুরুটা যেভাবে :
২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসের শুরুর দিকে সস্ত্রীক ব্যাক্তিগত গাড়ি নিয়ে রাজধানীর কুড়িল ফ্লাইওভার (উড়াল সড়ক) দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলি এবং পিছনে যেতে বলি। কথা শুনে আমার স্ত্রী হতভম্ব। তবুও অনুরোধ রাখতে অনেক কষ্টে ১৫-২০ ফুট পেছনে গেলেই দেখতে পাই একটি কুকুরের নাড়িভুড়ি রাস্তায় পড়ে আছে। তার উপর দিয়ে গাড়িগুলো যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। এতে কুকুরের পা, লেজ, মাথা ও নাড়িভুড়ি বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। স্ত্রীকে বললাম এটি এখান থেকে সরাতে হবে। তাতে তিনি চুপ থাকলেও অসম্মতি প্রকাশ করেনি। ড্রাইভারকে বললাম কয়েকজন শ্রমিক দেখে; নিয়ে এসো। প্রথমে তিনজন শ্রমিক নিয়ে আসে ড্রাইভার। তারা কুকুরের নাড়িভুড়ি সরানোর কাজ শুরু করে। ততক্ষণে দেখলাম ময়লা আবর্জনায় ভরে গেছে পুরো কুড়িল ফ্লাইওভার। ভাবতে লাগলাম প্রধানমন্ত্রীর উদ্ধোধনের পর এই ফ্লাইওভার বোধ হয় আর পরিষ্কার হয়নি। তখন তিন শ্রমিকের সাথে কথা বলে নিয়ে আসা হলো আর ৬ শ্রমিক। মোট ৯ শ্রমিককে দিয়ে ৫ দিন ধরে কাজ করে পরিষ্কার করা হলো কুড়িল ফ্লাইওভার। যেখান থেকে ট্রাকে করে ২৭ ট্রাক ময়লা সরিয়ে নেয়া হলো। ঝকঝকে তকতকে হলো কুড়িল ফ্লাইওভার। যা দেখে খুশি হলো স্থানীয় সচেতন লোকজন। এতে ২৪ হাজার টাকার মতো খরচ হলো বললেন তিনি। তাও ব্যয় সম্পর্কে একাধিকবার প্রশ্ন করার পর।

তিনি বলেন, এ নিয়ে চিন্তার এক পর্যায়ে আমার মনে জন্ম নিলো রিপেয়ার বাংলাদেশের। ঠিক ওই সালের ২২ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি একাউন্ট খুলে রিপেয়ার বাংলাদেশের লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম নিয়ে পোস্ট দিতেই ব্যাপক সাড়া। আমাকে যারা চেনেন, বিশেষ করে ছাত্রজীবনের বন্ধু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য মেধাবী ছাত্র আমার পোস্টে কমেন্টস দিয়ে সাধুবাদ ও সমর্থন জানিয়ে সংগঠণ করার পরামর্শ দেন। এতে সদস্য হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন তারা। সে থেকে শুরু হলো পথচলা। গঠণ করা হলো রিপেয়ার বাংলাদেশ সংগঠন।

তিনি বলেন, আমি যেহেতু চট্টগ্রাম শহরে অবস্থান করি সেহেতু চট্টগ্রাম শহরে অবস্থানকারী বন্ধু ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশকিছু শিক্ষার্থী আমাকে বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ ধরণের একটি ক্লীন অভিযান চালানোর। তাতে রাজী হয়ে গেলাম। বিষয়টি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিলাম।

শুরু হলো ক্লীন অপরাশেন-১

সেদিন ছিল ২০১৬ সালের ২৭ জানুয়ারি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু করি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন অভিযান। চমেক হাসপাতালের পরিচালক ও চিকিৎসকদের অনেকে তাৎক্ষনিকভাবে অংশ নেয় এ অভিযানে। সারাদিন হাসপাতালের সড়ক থেকে গলিপথসহ পুরো ক্যাম্পাস পরিস্কার করা হয়। যেখান থেকে বেরিয়ে আসে ৫ টনেরও বেশি আবর্জনা। আবর্জনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রায় ১৫ শ্রমিক নিয়োজিত করা হয়।

প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শ্রমিকদের বেতন, চবি শিক্ষার্থীদের সামান্য নাস্তা পরিবেশন করা হয়। এতে ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা খরচ হয়। এরমধ্যে আমার টাকা খরচ হয় তিন-চার হাজারের মতো। বাকী টাকা হাসপাতালের একজন সিনিয়র চিকিৎসক স্বপ্রণোদীত হয়ে দেন ৫ হাজার টাকা। তেমনি আমার বন্ধু ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তণ ছাত্রদের অনেকে এতে খরচ যুগিয়েছেন। এতে অনুপ্রাণীত হই আমি।

ফলে সংগঠনের সদস্যদের প্রস্তাবে ক্লীন অপারেশন-২ পরিচালনা করা হয় চট্টগ্রাম মহানগরীর সিডিএ আবাসিক এলাকায়।

এ অভিযানের বর্ণনা জানতে চোখ আগামিকাল রাখুন অনলাইন নিউজ পোর্টাল সিটিজি টাইমসে।

মতামত