টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

বিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ের কবলে চট্টগ্রাম

ইব্রাহিম খলিল
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ০৪ এপ্রিল ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: গরমের শুরুতেই বিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে চট্টগ্রাম। গত কয়েকদিন ধরে বিদ্যুতের আসা-যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়ছেন নগরবাসী। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু না হওয়া এবং গরমের সাথে বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

গরম যতই বাড়বে বিদ্যুতের লোডশেডিং ক্রমান্বয়ে আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তারা।

পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রামে ৬০০-৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সরবরাহ করা হচ্ছে ৫০০-৫৫০ মেগাওয়াট। চাহিদার চেয়ে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে। আর এ সংকট সামাল দেয়া হচ্ছে লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে ।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে দিনে ১০০ থেকে ১২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লোডশেডিং করা হলেও রাতে আরও বেড়ে যায়। গরম বেশি পড়লে তা আরও বাড়তে শুরু করে। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে গরম বেড়ে গেলে এ লোডশেডিং বেড়ে ২০০ মেগাওয়াটে দাঁড়াতে পারে। সেক্ষেত্রে নগরবাসীর দুর্ভোগের মাত্রাও বাড়বে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লোডশেডিং এর কারণে প্রতিদিন নগরীর কোনো না কোনো এলাকা অন্ধকারে ডুবে থাকছে।এ কারণে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি এইচএসসি পরীক্ষার্থীরাও দুর্ভোগে পড়ছে। লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের অনেক এলাকায় ঘণ্টার নিয়মও মানা হচ্ছে না।

পিডিবি চট্টগ্রাম কার্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলা করতে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। নিয়মানুযায় লোডশেডিং কোনো এলাকায় সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার বেশি করা হচ্ছে না। গ্যাস নির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু হলে গরমে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে না বলে তিনি জানিয়েছেন।

তিনি জানান, রাউজান তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিকলবাহা ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। চালু রয়েছে শুধু শিকলবাহা ১৫০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট আর কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। শিকলবাহা বার্জ মাউন্টেড বিদ্যুৎ কেন্দ্রও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে।

অন্যদিকে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় শিকলবাহার দেড়শ মেগাওয়াটের পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টে উৎপাদন ঘাটতি হচ্ছে গড়ে ৭০ মেগাওয়াট। এছাড়া শিকলবাহার ৫৫ মেগাওয়াট রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রেও ঘাটতি হচ্ছে গড়ে ৩৫ মেগাওয়াট। বেসরকারি রিজেন্ট ও মালঞ্চ এই দুই বিদ্যুৎ কেন্দ্রেও গড়ে প্রায় ২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে।

গ্যাস নির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু না থাকায় পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট চালু রেখে চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা সচল রাখার চেষ্টা করছে বলে জানান জনসংযোগ কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান।

এদিকে সরকারি নিয়মানুয়ায়ী লোডশেডিংয়ের সময়সীমা ১ ঘণ্টা নির্ধারিত থাকলেও চট্টগ্রামের ২০টি ডিভিশনের সাড়ে তিন থেকে চার হাজার ফিডার লাইনে লোডশেডিংয়ের সময়সীমা মানা হচ্ছে না। কোনো কোনো ফিডার লাইনের এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ চলে গেলে ২ থেকে ৩ ঘণ্টায়ও আসছে না বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

চট্টগ্রাম চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা আবদুল গফুর জানান, গভীর রাত পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। আবার ঘুম থেকে উঠে দেখি বিদ্যুৎ নেই। সকাল ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ একটু চোখে দেখা যায়। দুপুর ২টা থেকে বিদ্যুৎ চোখে হারায়। একবার গেলে দুই ঘন্টায়ও আসে না। আসলে ৩০ মিনিটও বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। বেশিরভাগ সময় আসার ২-৩ মিনিটের মাথায় বিদ্যুৎ চলে যায়। বিদ্যুতের অভাবে গরমে চরম অস্বস্তিতে জীবন যাপন করছে মানুষ।

চট্টগ্রামের অন্যতম বিপনি বিতান শপিং কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ী মাহাবুব আলম জানান, বিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ে পুরো দোকান অন্ধকার থাকছে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য অচল হয়ে পড়েছে। খাতুনগঞ্জের আড়তদার বিছমিল্লাহ ট্রেডার্সের মালিক হারুন জানান, গত ৫-৬ দিন ধরে লোডশেডিংয়ে আড়তে কোটি টাকার কাঁচামাল পঁেচ নষ্ট হচ্ছে।

খাদ্য উৎপাদনকারী ‘ফুলকলির’ ব্যবস্থাপক আবদুস সবুর বলেন, বিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ে কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। মৌসুমি আবাসিক এলাকার বাসিন্দা হাজী সিরাজুল ইসলাম বলেন, গ্যাস নেই, পানি নেই, সেই সাথে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে দোজকের আজাব চলছে।

সাধারণের তথ্যমতে, আবাসিক এলাকা, মার্কেটের মতো ভদ্রলোকের এলাকা দেখে বিদ্যুতের লোডশেডিং করা হয় বেশি। কারন এসব এলাকার লোকজন চুপ থাকে। স্থানীয় উচ্ছৃঙ্খল লোকজনের এলাকাগুলোতে মারের ভয়ে লোডশেডিং কম করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কালুরঘাট সাবস্টেশনের সহকারী ব্যবস্থাপক সামশুল হুদা বলেন, যেসব এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না, তার কারণ লোডশেডিং নয়। ট্রিপ বন্ধ হওয়ার কারনে হচ্ছে। এর কারণ প্রত্যেক বিক্রয় বিতরণ বিভাগের আওতায় যে ট্রান্সফরমারগুলো রয়েছে তা ওভার লোডেড। নির্দিষ্ট সময়ের বেশি বিদ্যুৎ সংযোগ চালুর কারণে ওভারলোডেড ট্রান্সফরমারগুলোতে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যায়।

তিনি জানান, চট্টগ্রাম পিডিবি জোনের প্রায় প্রত্যেক বিতরণ বিভাগের ট্রান্সফরমারগুলো বিদ্যুৎ ধারণ ক্ষমতা ৩২ মেগাওয়াটের বেশি না। কিন্তু সেখানে চাহিদা থাকে ৩৮ মেগাওয়াট। তাই বাধ্য হয়েই এক ফিডারের সুইচবোর্ডে বন্ধ রেখে অন্য ফিডারের সুইচবোর্ড চালু করা হয়।

পিডিবি চট্টগ্রাম জোনের এক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ৬ মেগাওয়াট ওভারলোডেড ট্রান্সফরমারকে ঠান্ডা করতে দিনের এতগুলো সময় বিদ্যুৎ বন্ধ রাখার প্রয়োজন হয় না। মুলত সুইচ বোর্ডগুলো চলে টাকার উপরে। যেখানে টাকা পায় সেখানেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে অন্য ফিডারগুলো অন্ধকারে রাখে তারা।

# ইব্রাহিম খলিল, চট্টগ্রাম। ৪ এপ্রিল’১৭ ইং, মঙ্গলবার #

মতামত