টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

যেভাবে ‘অপারেশন অ্যাসল্ট-১৬’

চট্টগ্রাম, ১৬  মার্চ ২০১৭ (সিটিজি টাইমস)::  চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার প্রেমতলায় ‘ছায়ানীড়’ নামের বাড়িতে জঙ্গিবিরোধী অভিযান শেষ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

অপারেশন অ্যাসল্ট-১৬ নামের এই অভিযানে এক নারীসহ নিহত হয়েছে চার জঙ্গি। এদের মধ্যে দুইজন নিহত হয়েছে আত্মঘাতি বোমায়। জঙ্গি আস্তানায় বিপুলসংখ্যক বোমা ও বিস্ফোরক দ্রব্য পাওয়া গেছে।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি শফিকুল ইসলাম অভিযানের সমাপ্তি ঘটেছে বলে জানান। ঘটনাস্থলে শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, জঙ্গিদের আস্তানায় আটকে থাকা ২০ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে অভিযানকালে পুলিশের সোয়াত শাখার দুই সদস্যসহ চার পুলিশ আহত হয়েছে। তাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

যেভাবে জঙ্গিদের শনাক্ত ও অভিযান : মূলত একজন বাড়ির মালিকের সাহসিকতা ও বিচক্ষণতায় সীতাকুণ্ডে দুটি জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়া যায়। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি উপজেলার লামার বাজার আমিরাবাদ এলাকায় ‘সাধন কুটির’ নামের একটি বাড়িতে বাসা ভাড়া নেয় শিশুসহ এক দম্পতি।

পুলিশের নিয়ম অনুযায়ী বাড়ির মালিক ভাড়াটিয়ার তথ্য ফরম পূরণ করে আইডি কার্ড দিতে বললে ওই ভাড়াটিয়া একটি আইডি কার্ডের ফটোকপি দেন। কিন্তু বাড়ির মালিকের এই আইডি কার্ড নিয়ে সন্দেহ হলে ইন্টারনেটের দোকানে গিয়ে সার্চ দিয়ে দেখেন কার্ডটি ভুয়া।

এর মধ্যে একদিন ওই ভাড়া বাসায় পানির কল মেরামত করতে যান মালিকের বাড়ির এক দারোয়ান। তিনি সেখানে সার্কিটসহ বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম দেখতে পেয়ে মালিককে জানান। এর পর বাড়ির মালিক পুলিশকে খবর দেন। মূলত এর পরই জঙ্গি আস্তানার সন্ধান এবং অভিযানের সূচনা।

সীতাকুণ্ড থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইফতেখার হোসেন বলেন, ‘সাধন কুটির নামের বাড়ির মালিক সুভাষের মাধ্যমে তথ্য পেয়ে আমরা প্রথমে ওই বাড়িতে অভিযান চালাই। এ সময় বাড়িতে থাকা এক নারী আত্মঘাতি বোমা বিস্ফোরণের চেষ্টা চালায়। তবে পুলিশের বিচক্ষণতায় সেই বাসা থেকে এক শিশু সন্তানসহ জঙ্গি দম্পতিকে আটক করা হয়। এরপর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সীতাকুণ্ডে কলেজ রোডের প্রেমতলায় ‘ছায়ানীড়’ নামের অপর একটি বাড়িতে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়া যায়। পুলিশ এরপর ছায়ানীড়ে অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নেয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘বুধবার বিকেল তিনটার দিকে ছায়ানীড় ভবনে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশের একটি দল অভিযান চালাতে গেলে বাড়ির ভিতর থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। এতে সীতাকুণ্ড থানার ওসি (তদন্ত) মোজাম্মেল হকসহ দুই পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে খবর দেয়া হয় জেলা পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা, ডিআইজি শফিকুল ইসলামকে।

সন্ধ্যার মধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছান পুলিশ সুপার ও ডিআইজি। সবার সম্মিলিত সিদ্ধান্তে অভিযান চালানোর জন্য যোগ দেয় পুলিশের সোয়াত টিম ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সদস্যরা। চট্টগ্রাম থেকে নিয়ে যাওয়া হয় সাঁজোয়া যান। এর পর রাতে অভিযানের প্রস্তুতি নেয়া হলেও গ্রামবাসীর নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সকালে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সকালে ‘অপারেশন অ্যাসল্ট-১৬’ : ছায়ানীড় নামের বাড়িটি আগের দিন বিকেল থেকে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ঘিরে রাখার পর বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে অভিযান শুরু করে সমন্বিত বাহিনী। এর আগে জঙ্গি সদস্যদের আত্মসমর্পণ করতে মাইকে বার বার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু জঙ্গিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ডাকে সাড়া না দিয়ে ভেতরে অবস্থান করে।

সকাল সোয়া ৬টার দিকে অভিযান শুরু হওয়ার পর জঙ্গিদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক গোলাগুলি হয়। অভিযান শুরুর পর প্রথম দিকে সোয়াত টিমের দুই সদস্য আহত হন। তাদের চট্টগ্রাম সিএমএইচ- এ ভর্তি করা হয়। সকাল ৭টার দিকে বাড়ির ভিতরে বিকট শব্দে বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ওই বাড়ির ছাদের অনেকখানি উড়ে যায়। বাড়ির মধ্যে জঙ্গিরা আত্মঘাতি বিস্ফোরণ ঘটালে দুজন নিহত হয়। এছাড়া পুলিশের গুলিতে মারা যায় দুজন। এর পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সদস্যরা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে এবং ব্যাপক তল্লাশি চালায়।

ঢাকা থেকে আসা কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক জহির উদ্দিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে জানান, জঙ্গিবিরোধী অভিযান এখন শেষ। ভেতরে থাকা জঙ্গিদের কাছে শক্তিশালী বোমা ছিল, যা অপারেশনের সময় তারা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। এই অভিযানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর দুই শতাধিক সদস্য অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে সোয়াত বাহিনী, কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ, চট্টগ্রাম নগর পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট ও র‌্যাব।

সফল অভিযান : সীতাকুণ্ডে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত হয়েছে চারজন। আটক করা হয়েছে শিশুসন্তানসহ এক দম্পতিকে। এরা সবাই জেএমবির সদস্য এবং বড় ধরনের নাশকতার প্রস্তুতি নিয়ে সেখানে অবস্থান করছিল বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি শফিকুল ইসলাম।

ডিআইজি আরো জানান, অভিযান শুরুর সময় সকালে জঙ্গিরা নিজেরাই শক্তিশালী গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতি হামলা চালায়। এর পরপরই সোয়াত কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, র‌্যাব ও পুলিশের সম্বন্বয়ে গঠিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী যৌথ বাহিনী অপারেশন শুরু করে। তিনি বলেন, ‘আজ যেহেতু ১৬ মার্চ তাই এ অপারেশনের নামকরণ করা হয়েছে ‘অপারেশন অ্যাসল্ট-১৬’।’

অভিযানকালে জঙ্গিদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরপরই ভবনের বিভিন্ন ফ্ল্যাটে আটকে থাকা অন্যদের বের করে আনা হয়েছে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায়। তাদের বের করে আনা হয় জানালার গ্রিল কেটে, পিছনের দরজা ভেঙে এবং বেলকনি দিয়ে।

ডিআইজি শফিকুল ইসলাম আরো জানান, অপারেশন শেষ হলেও কাজ এখনও চলছে। ভিতরে বোমা ডিসপোজাল টিম কাজ করছে। সেখানে জঙ্গিদের বিপুল সংখ্যক শক্তিশালি গ্রেনেড ও বিস্ফোরক রয়েছে। এসব নিষ্ক্রিয় করার কাজ চলছে।’

ঘটনাস্থলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ঢাকার অতিরিক্ত উপ কমিশনার আব্দুল মান্নান সাংবাদিকদের বলেন, ‘সফলভাবে অভিযান শেষ করা গেছে। সময় নিয়ে ভেবে চিন্তে এবং ব্যাপক প্রস্তুতি থাকায় সাধারণ লোকের কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।’

মতামত