টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

ফটিকছড়িতে মৃত্যুপথযাত্রী এক পল্লী চিকিৎসকের করুণ কাহিনী

মৃত্যুর আগে সম্পত্তি পেয়ে ভুলে গেলেন উত্তরাধিকারীরা

মীর মাহফুজ আনাম
ফটিকছড়ি থেকে

চট্টগ্রাম, ১৪ মার্চ ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: নগরীর  একা চলাফেরা করতে অক্ষম তিনি। খাওয়া ধাওয়াতো দূরের কথা, তৃষ্ণায় কাতরালেও এক গ্লাস পানি তুলে দেবেন এমন কাওকেও পান না মাঝে মাঝে। প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিতে যথাস্থানে যাবেন তাতো কল্পনাও করতে পারেন না। উপযুক্ত চিকিৎসা ! সেইতো সোনার হরিণ। অথচ তিনিই সারাজীবন নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়ে গেছেন গ্রামবাসীকে। নিজের উপার্জিত অর্থে পাকা দালান তৈরী করলেও তা এখন তাঁর নেই। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া আর নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে ক্রয় করা অঢেল সম্পত্তিও এখন নেই নিজের নামে। উত্তরাধিকারীদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে স্বজ্ঞানে নিজেই সন্তান আর নাতীর নামে ‘নিরুপন’ করেছেন ভিটে মাটিসহ সব সম্পত্তি। যা জীবনের শেষভাগে এসে দাড়িয়েছে কাল হয়ে। এটি কোন কল্পকাহিনী নয়, এটি ফটিকছড়ি উপজেলার সমিতিরহাট ইউনিয়নের দক্ষিণ নিশ্চিন্তাপুর পল­ী চিকিৎসক শুধাংশু বিমল চৌধুরীর (৮০) বর্তমান জীবনচিত্র।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ ইমনের কাছ থেকে এমন তথ্য পাওয়ার ভিত্তিতে সরেজিনে গিয়ে তার সত্যতা পাওয়া যায়। ঘরের এক কোনায় বসে আছেন তিনি। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আর গণমাধ্যম কর্মী দেখে ঘর থেকে উঠানে আসতে চাইলেন। সেখানেই কথা হয় তার সাথে। প্যারালাইসেসে শরীর নূয়ে পড়লেও মুখে কথা বলেন সাবলিলভাবে।

তিনি জানালেন, পাকিস্তান শাসানমলে মেট্রিক পাশ করে এলএমএফ (পল্লী চিকিৎসক) প্রশিক্ষন নিয়ে ১৯৬৩ সাল থেকে সমিতিরহাট বাজারে চৌধুরী মেডিকেলে কিচিৎসা প্রদান করে আসছিলেন। দীর্ঘ ৪৭ বছর নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করে এলাকায় বেশ জনপ্রিয় পল­ী চিকিৎসক ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়তা ছিলেন তিনি। পরিবারে তিন পুত্র ও তিন কন্যা সন্তানের জনক। সকলকে পড়ালেখাও করিয়েছেন। মেয়েদের বিয়েও সম্পন্ন করেন। ১৯৯৯ সালে স্ত্রী ইহলোক ত্যাগ করেন। তার পরের বছর হঠাৎ তার বড় ছেলে ডা. তপন কুমার চৌধুরী অকালে মারা যান। তার সংসারে এক পুত্র সন্তান বিজন কুমার চৌধুরী রয়েছে। পিতার আগে পুত্র মারা যাওয়ায় সনাতন ধর্মীয় আইনে সে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ২০০২ সালের ১৭ জুন ৯০৮ নং কবলা মুলে এক নাতি, দুই পুত্র, তিন কন্যা সন্তানের মধ্যে ৫ একর ১৯ শতক সম্পত্তি রেজিষ্ট্রাট ”নিরুপন নামা” (ভাগ বন্টন) করে দেন। গত ৬ বছর পূর্র্বে হঠাৎ তিনি স্ট্রোক করে বসেন। চলেফেরা করতে অক্ষম হয়ে পড়েন। তখন সন্তানরা দূরে সরে যেতে থাকেন।

মেঝ ছেলে পল­ী চিকিৎসক রতন কুমার চৌধুরী মাঝে মাঝে তার সাধ্য মতো খোঁজ খবর রাখেন। তার স্ত্রী সন্তানরা থাকেন ভাড়া বাসায়। রতন কুমার চৌধুরীই সকালে ভাত রান্না করে বাবাকে খবার দিয়ে চলে যান কর্মস্থলে। সারাদিন বাবা থাকেন একা। চলাফেরায় অক্ষম বাবা সারাদিন পড়ে থাকেন একা। মাঝে মাঝে বাড়িতে আসলেও ছোট ছেলে বাবার দিকে এক পলক দেখেনও না। অথচ বাবার দোকান তিনি পরিচালনা করেন । যে নাতির জন্য নিজের সম্পত্তি বন্টন করেছিনে, সে মাকে নিয়ে শহরে ভাড়া বাসায় থাকেন । দাদার খবর সেও রাখে না।

শুধাংশু বিমল চৌধুরী বলেন, ‘সব চাইতে বেশি সম্পত্তি দিই ছোট ছেলে রনজন কুমার চৌধুরীকে। ফটিকছড়িতে এক একর ৬২ শতক এবং রাউজানে ২০ শতক। সে মোটেও খবর রাখেনা। আপনজনদের এমন অবহেলা দেখে মরে যেতে ইচ্ছে হয় । কেন যে সৃষ্টিকর্তা আমাকে বাঁচায় রাখলেন।’

সমিতিরহাট ইউপি চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ ইমন বলেন, উত্তরাধিকারীরা এমন নিষ্ঠুর আচরণ শুনতে ও মানতে কষ্ট লাগে। সামাজিক বৈঠকে তাদের কিছু সম্পত্তি বিক্রি করে তাদের বাবার চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ করার সিদ্ধান্ত হলেও তার সন্তানরা তা মানছে না।

চট্টগ্রাম জেলা সাব-জজ আদালতের আইনজীবি এড. নিরঞ্জণ নাথ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘দালিলিকভাবে সম্পত্তি নিরুপন নামা করলেই শেষ কথা নয়। যেহেতু সম্পত্তি নিরুপন নামা দাতা এখন্ োজীবিত, তার উত্তরাধীকারীগণ তার দেখভাল করছে না, তার জীবন ধারণ এবং চিকিৎসার জন্য অর্থের প্রয়োজন আছে। তিনি আদালতে এসে সে নিরুপন নামা বাতিল করতে পারেন। এবং ওই সম্পত্তি ক্রয় বিক্রয় করতে পারবেন।’
১৪.০৩.২০১৭

মতামত