টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মিরসরাইয়ে জঙ্গি আস্তানা: ‘ভাড়াটিয়া আতংকে রয়েছেন বাড়ি মালিকরা’

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি 

চট্টগ্রাম, ০৯ মার্চ ২০১৭ (সিটিজি টাইমস): চট্টগ্রামের মিরসরাই পৌরসভার ভোগনিয়া এলাকার রিদওয়ান ভবনে অভিযানে গ্রেনেড বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় মিরসরাই থানায় মামলা দায়ের করা হয়ছে।

বুধবার (০৮ মার্চ) দিনগত রাতে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক শহিদুল বাশার বাদি হয়ে মিরসরাই থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় আটককৃত জঙ্গি মাহমুদুল হাসান ও জসিমসহ ৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ২০-২৫ জনকে আসামী করা হয়। মামলায় বাড়ির মালিক রেদোয়ানকে সন্দেহভাজন আসামী করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে অন্য আসামীদের নাম প্রকাশে অপারগতা প্রকাশ করেছে পুলিশ। এদিকে আটক জঙ্গি মাহমুদুল হাসানকে ৭দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।

মিরসরাই পৌরসদরে সন্ধান পাওয়া জঙ্গি আস্তানার দোতলা ভবন রিদোওয়ান মঞ্জিলের মালিক রিদওয়ানুল হককে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে মিরসরাই থানা পুলিশ। বুধবার (৮ মার্চ) রাতে তাকে আটক করা হয়। রিদওয়ান বিএনপির সাবেক একজন নেতা। তিনি মিরসরাই পৌরসভা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন।

রিদওয়ান বলেন, একসময় বিএনপির রাজনীতি করতাম। ২০১৩ সালে আমার আবুতোরাব প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজে পড়ুয়া ছেলে বড়তাকিয়ায় বাস চাপায় মারা যাওয়ার পর আমি রাজনীতি থেকে সরে আসি। সন্তানের মৃত্যুর পর স্ত্রী ও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। মাস দুয়েক আগে স্ত্রীর সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।

রিদোওয়ান আরো জানান, মিরসরাই পৌরসভার পূর্ব মিরসরাই গোভনীয়ার তার দোতলা বাড়িতে ৮ টি ইউনিট রয়েছে। তার মধ্যে ১ টি ইউনিটে তিনি এবং তার দুই সন্তান থাকেন। বাকি ৭ ইউনিট ভাড়া দেওয়া হয়। দোতলা ভবনের নীচতলা ফেব্রুয়ারি মাসে মাহমুদুল হাসান নিচের দুইটি ইউনিট ভাড়া নেন। তিনি কাপড় ব্যবসায়ী পরিচয়ে উঠেছিলেন। একটি ইউনিটে ওর বোন, ভগ্নিপতি ও ভাগ্নি উঠেছিল। আরেকটি ইউনিটে চলতি মার্চ মাসে তার পরিবার ওঠার কথা ছিল।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা বলেন, বাড়ির মালিক রেদোয়ানকে সন্ত্রাস ধমন আইনে আটক করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সে পুলিশকে ভাড়াটিয়ার তথ্য সরবরাহ না করে দায়িত্ব অবহেলার পরিচয় দিয়েছেন। আমরা আরো খতিয়ে দেখতেছি জঙ্গি সংশ্লিষ্টতায় তার পৃষ্টপোষকাতা করেছেন কিনা।

এদিকে ভাড়াটিয়াদের নিয়ে আতংকে রয়েছেন বাড়ির মালিকরা। প্রতিদিন নতুন নতুন ভাড়াটিয়া বাড়িতে উঠছেন। পরিচয়পত্র নিলেও তা অনেক সময় ভুয়া দেখা যাচ্ছে। এখন বাড়ি ভাড়া নিয়ে মহা টেনশনে রয়েছেন তারা।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ৯ হাজার টাকা ভাড়ায় নেয়া ওই বাড়িতে কয়েকদিন পর থাকতে শুরু করে কথিত কামাল উদ্দিনের শ্যালক মাহমুদ। এরপর পরিবারের সবাই মিলে গড়ে তোলে জঙ্গি আস্তানা। দিনের বেলায় ঘরের পুরুষ সদস্যরা বাহিরে থাকলেও সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে আলো নিভিয়ে চলতো বোমা তৈরিসহ নানারকম ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম।

পুলিশ জানায়, কথিত কামাল উদ্দিনের প্রকৃত নাম জসীম আর মাহমুদের প্রকৃত নাম মাহমুদুল হাসান। তারা সম্পর্কে শ্যালক ভগ্নিপতি। তারা দুইজনই গত মঙ্গলবার চান্দিনায় পুলিশ চেকপোস্টে তল্লাসির সময় ধরা পড়ে। পরে তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী তাদের সাথে ওই বাড়িতে থাকা এক নারীকেও আটক করা হয়েছে। মূলত তারা জঙ্গি কার্যক্রমের সুবিধার্থে ছদ্মনাম ও পরিচয়ে বিভিন্ন জায়গায় বাসাভাড়া নিয়ে থাকতো।

রিদোয়ান মঞ্জিল নামের ওই বাড়ির কাজের ভুয়া হাসনার (ছদ্মনাম) সাথে কথা বলে জানা যায়, জঙ্গিরা যে ঘরে থাকতো ওই ঘরের দরজা কখনো খোলা দেখা যায়নি। সবসময় সন্ধ্যায় আলো নিভানো থাকতো।

হাসনা জানান, ‘শুনেছি গত মাসের এক তারিখ (১ ফেব্রুয়ারি ) থেকে নিচের তলায় একটি ফ্যামিলি বাসা ভাড়া নিয়েছে। তাদের একটি ছোট বাচ্চাও আছে। তবে ঘরের মহিলা এবং বাচ্চাটিকে কখনো বাহির হতে দেখিনি।’ প্রতিবেশী নুরুল হক জানান, ‘ঘরটি ভাড়া নেয়া ছেলেগুলোকে দেখতে খুব ভদ্র মনে হতো। তারা যে জঙ্গি আমরা সামান্যও টের পাইনি।’

বাড়ির মালিক রেদোয়ান জানান, ‘গত ফেব্রুয়ারি থেকে বাড়ির নিচতলার দুটি কক্ষ ভাড়া দেই। ভাড়াটিয়া কামাল স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকবেন বলে আমার থেকে ভাড়া নেয়। মাসে তারা ৯ হাজার টাকা ভাড়া দেয়ার কথা। ফেব্রুয়ারি মাসের ভাড়াও তারা দেয়নি। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে কামাল ও তার স্ত্রী সন্তানকে বাসায় না দেখে তার শ্যালক মাহমুদের কাছে ঘর ভাড়া ও গ্যাস বিদ্যুৎ বিলে চাইতে গেলে সে জানায় আগামী বৃহস্পতিবার (গতকাল) দিয়ে দিবে। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে পুলিশ এসে আমাকে ওই ঘরে থাকা ভাড়াটিয়াদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে আমি পুলিশের কাছে পরিচয়পত্র জমা দেই।’

উল্লেখ্য, দীর্ঘসময় ধরে চট্টগ্রামের প্রবেশপথ মিরসরাই অঞ্চলে একাধিক জঙ্গি সংগঠনের তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। ২০০৭ সালে এখানকার কয়লার গহীন পাহাড়ে সন্ধান মেলে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার অস্ত্রভান্ডার। ২০১১ সালে তালবাড়ীয়া এলাকার একটি পাহাড়ে মেলে রহস্যজনক তিনটি ব্যাংকার। তার এক বছর পর ২০১২ সালে মহামায়া লেকের পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে সন্ধান মেলে আরো একটি বাংকারের।

মিরসরাই সার্কেলের এএসপি ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুর রহমান জানান, জঙ্গি আস্তানায় পাওয়া আলামত গুলো কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সদস্যরা তদন্ত করছেন। ইতিমধ্যে মিরসরাই পৌরসভার এলাকার সকল কাউন্সিলরের মাধ্যমে পৌর এলাকায় সকল ভাড়াটিয়ার তথ্য সরবরাহ ও সকল আগন্তুকদের বিষয়ে কাউন্সিলরদের ব্যাপক খোঁজ খবর রাখতে বলা হয়েছিল।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত