টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

জীবন যুদ্ধে হার না মানা ৩৫তম বিসিএসে উত্তিন্ন কবিরের কথা

করিম শাহ
রামগড় (খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধি

চট্টগ্রাম, ০৪ মার্চ ২০১৭ (সিটিজি টাইমস)::জীবন যুদ্ধে হার না মানা প্রত্যান্ত গ্রামীন পরিবারে বেড়ে উঠা পিতাহারা দরিদ্র পরিবারের এক মেধাবী ছেলের গল্প বলবো আজ! সবপ্রতিকুলতাকে পরাজিত করে চরম আত্মবিশ^াস, শ্রম ও ধৈর্য্যকে পুঁজি করে ৩৫তম বিসিএস (শিক্ষা ইংরেজী বিষয়ে) উর্ত্তিন্ন হয়েছেন চট্টগ্রাম জেলার ভুজপুর থানার বাগান বাজার ইউনিয়নের (রামগড় উপজেলার পাশ^বর্তী) প্রত্যান্ত গ্রাম চিকনের খিল এলাকার কবির হোসেন (২৮)।

তাঁর সফল্যার পেছনকার রহস্যের অনুসন্ধান করতেই জানা গেলে মা মানিক জান বিবির প্রেরণা ও কষ্টের ফলাফলা যে কত সুন্দর ও নির্মল হতে পারে। তার জলন্ত প্রমাণ কবির হোসেন ও তার বড় ভাই নুর নবী। বড় ভাই নুর নবী ২০১১ সালে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে প্রথম স্থান নিয়ে মাষ্টার্স শেষ করে স্কলারশিপ পেয়ে আমেরিকা যান সেখানে একটি বেসরকারী বিশ^বিদ্যালয় থেকে সপ্টওয়ারে ইঞ্জিনিয়ার কোর্স সম্পন্ন করে বর্তমানে আমেরিকার একটি বেসরকারী কোম্পানীতে চাকুরী করছেন।

কবির হোসেনের সফলতার পেছনে রয়েছে এক মর্মশী জীবন কাহীনি। কতটা শ্রম ও ধৈর্য্য একটা মানুষের স্বপ্ন পূরণের সহায়ক তার উজ¦ল দৃষ্টান্ত কবির হোসেন। তিনি ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় থেকে ইংরেজী বিভাগ থেকে ১১০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাষ্টার্স পরীক্ষা অংশ নিয়ে ৩.০৯ গ্রেড পেয়ে ২য় স্থান অধিকার করেন। তিনি বলেন, সেই অনার্স থেকে বিসিএস নিয়ে ভাবতাম আর মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নিতে থাকি অবশেষে অনেক চড়াই উতরাই শেষে সেই স্বপ্নটা ধরা দেয়। আমার মা আমার সবচেয়ে বড় প্রেরণা। সহযোগীতা করেছেন বড় ভাইয়েরা। মাঝে মাঝে কষ্ট অভাব অনটনে ভেঙ্গে পড়তে দেখলে মা সান্তনা দিতেন রাতে পড়তে বসলে প্রায় সময় কাঁন্নায় দুই চোখ ভিজে যেতো মা এসেও কাঁদতেন পরে সন্তানা দিতেন। অধম্য ইচ্ছা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিতেন। তাই ইচ্ছা করি যতবার উর্ত্তিন্ন হবো না ততবার বিসিএস পরীক্ষা দেবো। একবার না হয় একবারতো হবেই। এভাবে বিসিএস সম্পর্কে তাঁর চিন্তার কথা জানালেন কবির হোসেন। গত ২মার্চ তাঁর পাশ^বর্তী গ্রাম রামগড়ের ওয়াইফাপাড়ায় সামাজিক সংগঠন ফিউচার ফাউন্ডেশনের মাহফিলে তাঁকে গুনীজন সম্মাননা ক্রেস্ট প্রাধান করা হয়।

কবির হোসেনের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাঁর শৈশবের করুন ভাবে বেড়ে উঠার কাহীনি। ৫ ভাই ও ৪ বোনসহ ১১ সদস্যের দরিদ্র কৃষক পরিবারের ২৬ জুন ১৯৮৯ সালে তাঁর জন্ম। জন্মস্থান চিকনের খীল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ২০০০ সালে ১মস্থান নিয়ে ৫ম শ্রেনী পাশ করে ২০০১ সালে ভর্তি হন একই ইউনিয়নের বাগান বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ে। এই বিদ্যালয়ে ২০০৩ পর্যন্ত ৮ম শ্রেণীতে পড়া লেখা করেন এখানে ৭ম শ্রেণীতে ভর্তির সময় অর্থ অভাবে বন্ধ হয়ে যায় তাঁর লেখাপড়া অনেক দেনদরবার ও সহযোগীতায় আবার শুরু হয় পড়ালেখা। ২০০৯ সাল কবিরের পরিবারে নেমে আসে অন্ধাকার। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে কবিরের জীবন। কারণ দরিদ্র পরিবারের একমাত্র চালিকা শক্তি বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সংসারের দায়িত্ব নেন স্থানিয় ইউনিয়নের রাইটার বড় ভাই আবুল হাশেম যার নুন আনতে পান্তা পুরায় অবস্থা। কবিরের দায়িত্বে নেন চট্টগ্রামে সামান্য বেতনে গার্মেন্সে কর্মরত মেঝ ভাই আবুল কাশেম। কবির তাঁর মাসহ চলে যান চট্টগ্রামে ভর্তি হন চট্টগ্রাম প্রবর্তক বিদ্যাপিঠ স্কুলে এখান থেকে ব্যবসায় শিক্ষায় ২০০৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৫৬ পেয়ে উত্তিন্ন হন। দ্বাদশ শ্রেনী ভর্তি পরীক্ষা দেন চট্টগ্রামের হাজী মোহাম্মদ মহসীন কলেজে এই কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তিন্ন হলেও অর্থ অভাবে ভর্তি হতে পারেননি। ২০০৬ সালে চলে যান কুমিল্লার আলহাজ¦ নূর মিয়া ডিগ্রি কলেজে এখানে দ্বাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হন কারণ এখানে থাকা ও পড়ালেখা করতে টাকা না লাগলেও খাওয়ার জন্যে লজিং ও টিউশনি করতে হয় আর এ টিউশনি বাবার মৃত্যুর পর শুরু করতে হয়েছে। এ কলেজ থেকে ২০০৮ সালে ব্যবসায় শিক্ষায় জিপিএ ৪.৯০ পেয়ে উত্তিন্ন হলে অনার্সে ভর্তির জন্য ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ে খ ইউনিটে ৪০ হাজার প্রার্থীর বিপরীতে ভর্তি পরীক্ষায় লড়াই করে ৯৬তম মেধাস্থান নিয়ে চবিতে ভর্তি হন। ভাগ্য ইংরেজী বিষয় নিয়ে ভর্তি হয়ে ২০১৩ ব্যাচে ১২০ জনের মধ্যে জিপিএ ২.৭৪ পেয়ে ৮মতম মেধাস্থানে অনার্স শেষ করেন। পরের বছর একই বিষয়ে ১১০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২য়স্থান নিয়ে চবি থেকে মাষ্টার্স শেষ করেন।

আগামীর বিসিএস যাদের স্বপ্ন তাঁদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সমসাময়ীক বিষয়ের পাশাপাশি নিয়মিত পত্রপত্রিকা পড়া, বিগত সালের প্রশ্নগুলি বারবার পড়া ও উত্তর দেয়া। তিনি দৃড় কন্ঠে তিনটি কথা বলেন, পৃথীবীর যে কোন জায়গায় সফল হওয়া যায় পরিশ্রম, ধর্য্য এবং সততা থাকলে। নতুন দায়িত্বের ব্যাপারে বলেন, শিগ্রই কাজে যোগ দেয়ার গেজেট প্রকাশ হবে। কাজের ক্ষেত্রে অবশ্যই সততা ও নিষ্ঠাকে গুরুত্ব দেবেন।

মতামত