টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

গ্যাস শেডিংয়ের কবলে চট্টগ্রামের ৫ লাখ গ্রাহক

ইব্রাহিম খলিল
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ (সিটিজি টাইমস)::  সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা তৈরীর জন্য হাতে দেয়াশলাই নিয়ে বসে আছে। কিন্তু চুলায় গ্যাস নেই। নাস্তা তো তৈরী হয়নি, রান্নাও বন্ধ। শেষে পরিবারের সকলকে নিয়ে হোটেলে গিয়ে খাবার খেয়েছেন বন্দরনগরী চট্টগ্রামের খুলশী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা কাজী মো. ইসহাক।

তিনি বলেন, এ অবস্থা শুধু আজ শুক্রবার নয়, প্রতিদিন। এ বেলা আছে তো, ওবেলা নেই। দুপুরে আছে তো রাতে নেই। গত কয়েক মাস ধরে চলছে এ অবস্থা। বিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ের মতো এখন গ্যাস শেডিংয়ের কবলে পড়ে যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি।

পূর্ব নাসিরাবাদের আল ফালাহ গলির বাসিন্দা বাবর উদ্দিন জহির বলেন, গ্যাস শেডিংয়ে কারনে সময়মতো নাস্তা ও ভাত-তরকারি রান্না করা কঠিন হয়ে উঠেছে। দুর্বিষহ হয়ে উঠছে নগরজীবন। গ্যাসের অভাব মাঝখানে কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও এখন চরম আকার ধারণ করেছে।

তিনি বলেন, আবাসিক খাতে গ্যাসের অসহনীয় সংকট সুরাহা করতে কেউ কোনরকম কাজ করছে না। উল্টো জনগণের সরকারের অনেকেই জনগণের এ সুবিধা নিয়েও আপত্তি তোলেন। যা সত্যিকার অর্থে বিস্ময়কর। এ ব্যাপারে নিরব ভুমিকা পালন করছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানীও।

গ্যাস সংকটে চট্টগ্রাম মহানগরীর বাসিন্দারা অতিষ্ঠ হয়ে বিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ের মতো গ্যাস শেডিংয়ের কথা বললেও তা বলতে নারাজ কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানীর কর্মকর্তারা। তবে তারা এটিকে রেশনিং পদ্ধতি
বলে মানছেন।

কর্ণফুলী গ্যাস কো¤পানির পদস্থ এক কর্মকর্তা স্বীকার করে বলেন, গ্যাস সংকটের কারনে রেশনিং পদ্ধতি অনুসরণ করা ছাড়া কোন উপায় নেই। ফলে একেক সময় একেক এলাকায় গ্যাস বিতরণ বন্ধ রাখা হচ্ছে। এতে নগরীর পাঁচ লাখেরও বেশি আবাসিক গ্রাহক গ্যাসের কষ্টে আছেন।

কর্ণফুলী গ্যাস কো¤পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আয়ুব খান চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে গ্যাস ফুরিয়ে আসছে। পর্যাপ্ত গ্যাস উত্তোলন না হওয়ায় এ সংকট সুরাহা করা অসম্ভব। এলএনজি আমদানি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কিছুই করার নেই।

অথচ চট্টগ্রামের গ্যাস বিপর্যয় মোকাবেলায় বাখরাবাদ থেকে আলাদা করে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কো¤পানি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু কর্ণফুলী গ্যাস কো¤পানি এখন বলছে তাদের কিছুই করার নেই। এলএনজি আমদানি শুরু না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস সংকট পিছু ছাড়বে না চট্টগ্রামের।

কর্ণফুলী গ্যাস কো¤পানির দেওয়া তথ্যমতে, চট্টগ্রামে গ্যাসের চাহিদা ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে কাফকো ও সিইউএফএল সার কারখানা দুটি ব্যবহার করে গড়ে একশ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাসের অভাবে এই দুটি সার কারখানা বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
এতে করে বর্তমানে চট্টগ্রামে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস হলে বাকি কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়। কিন্তু চট্টগ্রামে গড়ে গ্যাস দেয়া হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। ৫০ থেকে ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের অভাবে চট্টগ্রাম জুড়ে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে।

সূত্র জানায়, নগরীর শিল্প কারখানাগুলোতে গ্যাসের রেশনিং পদ্ধতি চলছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চালানো হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ। চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ খাতে গড়ে ১০৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সেখানে দেয়া হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনও প্রত্যাশিত হারে হচ্ছে না। তবুও শিল্প, আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের পুরোদমে গ্যাস দেয়া যাচ্ছে না। চট্টগ্রামের শিল্প কারখানাগুলোতে রেশনিং এর কথা শোনা যাচ্ছে বহুদিন ধরে। সিএনজি স্টেশনগুলোতে ছয়ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকে। এরপরও নগরীর বিস্তৃত এলাকায় বাসা বাড়িতে গ্যাস সংকট প্রতিদিনই চরমে উঠছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নগরীর খুলশী, নাসিরাবাদ, জালালাবাদ, বাকলিয়া, জামালখান, চকবাজার, চান্দগাঁও, রহমতগঞ্জ, ঘাট ফরহাদবেগ, আগ্রাবাদ, বেপারী পাড়া, বড় পুল, হালিশহর, পতেঙ্গা, ইপিজেডসহ সন্নিহিত অঞ্চলগুলোতে গ্যাস সংকট চরমে উঠেছে। প্রতিদিন ভোর থেকে গ্যাস চলে যায়। দুপুর দুইটা পর্যন্ত গ্যাসের দেখা মিলে না।

কোন কোন এলাকায় দুইটার পরে গ্যাস আসলেও কোন কোন এলাকায় তিনটার পরে গ্যাসের দেখা মিলে। নগরীতে গ্যাস সংকটে নাজুক অবস্থায় পড়েছেন সাধারণ মানুষ। তারা না পারছেন ঘরে রান্না করতে। না পারছেন হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে। সাধারণ গৃহিণীদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।

গ্যাসের অভাবে নগরীর বহু মানুষই কেরোসিনের চুলা কিনে নিয়েছেন। কেউ কেউ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। আবার অনেকেই বাসা বাড়ির আঙ্গিনায় বা ছাদে ইটের চুলা বানিয়ে রান্না সারছেন। সবকিছু মিলিয়ে গ্যাসের অভাবে নগরীর আবাসিক গ্রাহকদের ভোগান্তি অসহনীয় পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত