টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

প্রতারণার নতুন কৌশল!

চট্টগ্রাম, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ (সিটিজি টাইমস)::  প্রযুক্তির এই যুগে বিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিষ্কার যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে ঠিক তেমনি আবার নানা রকম নতুন নতুন সমস্যারও সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বর্তমান বিশ্বের মানুষ মোবাইল ফোনের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, তারা এখন আর শুধু যোগাযোগের জন্যই এই ডিভাইসটি ব্যবহার করছে না। এটি দিয়েই তারা সেরে ফেলছেন গ্যাস, পানি, বিদ্যুতের বিলসহ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের যাবতীয় কাজ।

কিন্তু দুঃখের কথা হলো এই ডিভাইসটি দিয়েই বর্তমানে প্রতারক চক্ররা তাদের প্রতারণার জাল বিস্তার করছে প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে। তারা মোবাইল ফোন নম্বর নকল করে প্রতারণা করছে সাধারণ মানুষের সাথে। বিশেষ এক ধরনের সফটওয়্যার ও অ্যাপসের মাধ্যমে মোবাইল ফোন নম্বর নকল করার এ পদ্ধতিকে বলা হয় ‘ক্লোনিং’।

মন্ত্রী, এমপিসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন নম্বর নকল করে প্রতারণার বেশ কিছু ঘটনা ধরাও পড়েছে। তবে এরই মধ্যে অপরাধীরা পাল্টে ফেলেছে প্রতারণার কৌশল। এবার তারা নিয়ে এসেছে স্পুফিং নামের আরেক পদ্ধতি, যার মাধ্যমে প্রতারকচক্রের কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন আইডি (পরিচয়) হাইড (গোপন) রাখা যায়। তবে স্পুফিংয়ের মাধ্যমে প্রতারণার ঘটনাও নজরে এসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করা গেছে একটি বড় চক্রকে। গত বুধবার রাতে রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে সংঘবদ্ধ এ প্রতারকচক্রের ৯ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

তদন্তসংশ্লিষ্ট র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, সারা দেশে প্রতারকচক্রের অন্তত অর্ধশত সদস্য রয়েছে। তারা নতুন কৌশলে মানুষকে ফাঁদে ফেলে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। তারা মত্স্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ নম্বরের ‘ইয়েস কার্ড’ অ্যাপের মাধ্যমে কল স্পুফিং করে। এ সফটওয়্যারের মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তির মোবাইল ফোন নম্বর হুবহু নকল করে কাউকে ফোন করা যায়। এ কৌশল ব্যবহার করে ৪০ সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে অন্তত ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার তথ্য পেয়েছে র‌্যাব।

মোবাইল ফোনের সিম ক্লোনিং বা স্পুফিং বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, ‘মোবাইল ফোন অপারেটররা এ বিষয়ে নিজ উদ্যোগে কাজ করছে। দুটি অপারেটর তাদের নিজস্ব নম্বরের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে সফল হয়েছে বলে জানিয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে শতভাগ কার্যকর কোনো পন্থা না পাওয়া পর্যন্ত তা গ্রহণ করা যাচ্ছে না।’

র‌্যাব ও পুলিশের একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, গত দুই বছরে মন্ত্রী, এমপি, সচিব, আইজিপি, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোনের সিম ক্লোন করে অর্থাৎ হুবহু একই নম্বর থেকে কল করে বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি, বদলি, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।

গতকাল সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত বুধবার রাতে রাজধানীর উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রতারকচক্রের মূল হোতা আশরাফুল ইসলাম ওরফে আপেলসহ ৯ জনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৪-এর একটি দল। গ্রেফতার করা অন্যরা হলো আপেলের সহযোগী মাহমুদুল হাসান ওরফে হাসান ওরফে হূদয় চৌধুরী ওরফে রবিন (১৯), রাকিবুল ইসলাম (২৩), মহিদুল ইসলাম ওরফে মিলন (২০), আবু কাউছার সাবু (১৯), নাজমুল হাসান (১৯), আমানউল্লাহ আমান (২৮), সাগর হোসাইন ওরফে সাগর (২৬) ও বিল্লাল হোসেন ওরফে বিল্লালকে (২১)। তাদের কাছ থেকে ২২টি মোবাইল ফোনসেট, ৫৩টি সিম, আটটি বিকাশ সিম, দুটি ল্যাপটপ, চারটি সিপিইউ, পাঁচটি মনিটর, একটি মডেম এবং নগদ ১৭ হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের সার্ভারে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের হটলাইন নম্বর ১৬২১৬ এবং মোবাইল ফোন কম্পানির কাস্টমার সার্ভিস নম্বর ১২১ ও ১২৩ স্পুফিং করার তথ্য পাওয়া গেছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেন, ‘বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম রেজিস্ট্রেশনের ফলে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ কমেছে। এর পরও আমরা কিছু অভিযোগ পাচ্ছি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নানাজনকে নানা ধরনের হুমকি দেয়া এবং চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। মূলত এ ধরনের অপরাধ করা হচ্ছে কম্পিউটারাইজড প্রযুক্তি স্পুফিংয়ের মাধ্যমে। এটি বায়োমেট্রিক পদ্ধতির কোনো ত্রুটি নয়। ’

তিনি আরও বলেন, ‘যখনই এ ধরনের কোনো কল গ্রাহকরা পাবেন তখন কথা বলা শেষে সঙ্গে সঙ্গে সেই নম্বরে কল ব্যাক করবেন। তাহলে ওই প্রান্ত থেকে যিনি ফোন ধরবেন তার সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যাবে তিনি আসল অপরাধী কি না।’

গোয়েন্দাদের মতে, কারো মোবাইল ফোনে যদি একজনের নম্বর সেভ করা থাকে, পরবর্তী সময়ে প্রতারক অন্য অপারেটরের একই ডিজিটের নম্বর দিয়ে তাকে কল করলে সেভ করা নম্বরটি স্ক্রিনে দেখাবে। পরিচিত কোনো নম্বর থেকে মিসড কল পাওয়ার পর সেই নম্বরে কলব্যাক করলে সিম ক্লোনিংয়ের শিকার হতে হয়। এ ক্ষেত্রেও বিশেষ একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে। সিম ক্লোনিং হলে মোবাইল ফোনের সিম ও মেমোরি কার্ডে থাকা তথ্য-উপাত্তও চুরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, ক্লোনিং ও স্পুফিং অপরাধীদের দ্রুত খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে প্রতিটি ব্যাটালিয়নকে ট্র্যাকার মেশিন দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ ধরনের শক্তিশালী ট্র্যাকারের মাধ্যমেই ধরা পড়েছে প্রতারকচক্র।

মতামত