টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

‘কি হবে আমাদের পাঁচ বোনের ?’

আরব-আমিরাতে নিহতদের পরিবারগুলো অন্ধকারে

মীর মাহফুজ আনাম
ফটিকছড়ি থেকে

চট্টগ্রাম, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):  পুরো নাম মো. আব্দুর রহিম (৪২)। তিনি ফটিকছড়ি উপজেলার দক্ষিণ পাইন্দং গ্রামের মীর আহম্মদের একমাত্র সন্তান। সারা জীবন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে আসছিলেন তিনি। কখনো দিন মজুরী, কখনো ঠিলা থেকে কাঠ এনে তা বাজারে বিক্রি করতেন । তা দিয়ে বাবা-মা, স্ত্রী আর পাঁচ কন্যা সন্তানের দু‘বেলা ভাতের সাথে তাদের পড়ালেখার খরচও জুগিয়েছিলেন। সহায় সম্ভল বলতে ভিটে মাঠি আর নড়বড়ে কুঁড়ে ঘরটি। পরিবারে সুখ শান্তি আর আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে ধার দেনা করে সাত বছর পূর্বে পাড়ি দিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরাতে। সেখানে কখনো নির্মাণ শ্রমিকের কাজ কখনো যে কাজ পাওয়া যেত তা করেই পার করেছেন বিগত ছয় বছর। এক বছর পূর্বে দেশে এসে স্ত্রী সন্তানদের সাথে কিছু সময় কাটিয়ে ফিরে যান আবারো মরুর দেশে। বাড়ি থেকে যাওয়ার পর তিনি ভিসাহীন হয়ে পড়েন। গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে সাতটায় কাজে যোগ দিতে গিয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। তার মৃত্যুর সংবাদটি পেয়ে তার পরিবারসহ পুরো গ্রাম শোকে স্তব্ধ।

আজ সরেজিমেন নিহতের বাড়ি গিয়ে দেখা যায় আব্দুর রহিমের বৃদ্ধ বাবা-মা আর রয়েছে পাঁচ কন্যা সন্তান। বড় মেয়ে বিবাহিত; বাকীরা সবাই বিভিন্ন শ্রেনীতে পড়ালেখা করে। তারা কোনভাবেই বাবার চলে যাওয়া মানতে পারছে না। তার কন্যা সন্তানদের আহাজারিতে উপস্থিত সকলের চোখে পানি ঝরছে। আত্মীয় স্বজনরা তাদের সান্তনা দিতে ব্যস্ত।

গত ব্ছর এস.এস সি পাস করা মেয়ে জনি আকতার বোনদের জড়িয়ে ধরে বিলাপ করে করে বলছে, আমাদেরতো কোন ভাইও নেই, কি হবে আমাদের পাঁচ বোনের ? আমাদেরকে কে দেখবে এখন ? আমার বাবা আমাদের ছেড়ে যেতে পারে না, এখনো আমার বাবার মৃত্যুর বয়স হয়নি। তোমরা আমার বাবাকে ফিরিয়ে দাও।

নিহত আব্দুর রহিমের পরিবার সূত্রে জানা যায়, ভিসা না থাকায় লাশ দেশে নিয়ে আসতে অনেকটা জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে আবু তাহের নামক তার এক চাচাতো ভাই লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার পক্রিয়া করছেন।

আলমগীরের পাঠানো টাকা পাওয়ার আগেই সংবাদ পেল মৃত্যুর !


ঘটনায় নিহত অপরজন মো. আলমগীর (৪৫)। তিনি উপজেলার ফটিকছড়ি পৌরসভাধীন ধুরং জব্বারিয়া স্কুল সংলগ্ন কাউন্সিলর জসিমের বাড়ির মৃত ফজলে রাব্বি চৌধুরীর দ্বিতীয় পুত্র। তিনি বিগত ২০ বছর যাবৎ সেখানে বসবাস করে আসছিলেন। আলমগীর সেখানে ঠিকাদারি করতেন। দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার গাড়ির চালকও ছিলেন তিনি।

সরেজমিনে তার বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, ৭ ও ৪ বছরের দুই কন্যা ও ১ বছরের এক শিশুপুত্র রয়েছে তার। বড় মেয়ে নিশা আকতার দ্বিতীয় শ্রেনীর ছাত্রী। সে নিজেও এখনো বুঝতে পারছেনা ‘বাবা নামক বটবৃক্ষ যে তার হারিয়ে ফেলেছে।’ বাড়িতে লোকভর্তি দেখে সে হতবাক। ছোট ভাইকে কুলে নিয়ে বসে আছে সে।

মারা যাওয়ার আগের রাতে স্ত্রী-কন্যাদের সাথে ভিডিও কলে কথা হয়েছে নিহত আলমগীরের। এমনকি মারা যাওয়ার পূর্বের দিন সংসারের খরচ বাবদ ১০ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। বিধিবাম তার পাঠানো টাকা বাড়িতে না পাওয়ার আগেই পাওয়া গেল তার মৃত্যুর সংবাদ।

আলমগীরের স্ত্রী সাকি আকতার বলেন, ‘তিন অবুঝ সন্তান নিয়ে এখন আমি কোথায় যাব ? স্বামীর যা আয় হতো তা দিয়ে কোনভাবে সংসার চলতো। টাকার অভাবে ঘরটিও ভালো করে নির্মাণ করতে পারেনি। আমার তিন সন্তানের ভবিষ্যত এখন অন্ধকারের মুখে।’

উলে­খ্য, গতকাল মঙ্গলবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্থানীয় সময় সকাল সাতটায় রাস আল খাইমাহ’র খুজাম এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। একটি প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খুটির সাথে ধাক্কা লেগে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনায় আরো তিনজন বাংলাদেশী আহত হন।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত