টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া হলো না ইফতির

এস এম ইব্রাহিম খলিল
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ২৮ জানুয়ারি ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):  হাসপাতালের বিছানায় মেয়ের লাশের পাশে বসে অঝোরে কাঁদছেন মা নাসিমা আকতার। কাঁদছেন বাবা আবদুল মোতালেব চৌধুরীও। মা বাকরুদ্ধ হলেও বাবা বিলাপ করে বলছেন, মা তুই এসএসসি পরীক্ষা দিবি না। না এসএসসি পরীক্ষা আর দেওয়া হলো একমাত্র মেয়ে ইফতির।

গ্যাস বিস্ফোরণে অগ্নিদ্বগ্ধ হওয়ার ২০ ঘন্টার মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তনিমা আফরিন ইফতি। ইফতি নগরীর কুসুম কুমারী সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী। বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইফতি, জানালেন তার গৃহশিক্ষক নুরুল আবছার।

গতকাল শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে কনকনে শীতের হাওয়ায় গরম কম্বল মুড়ি দিয়ে ইফতি ও বড় ভাই আরিফ যখন আয়েশী ঘুমে ছিলেন। ঠিক তখনই দফায় দফায় অজানা বিস্ফোরণ। ঘুম ভেঙে চোখ খুলে গরম কম্বল সরিয়ে নিতেই আগুনের ফুলকিতে দ্বগ্ধ হন ভাই-বোন। ছোটভাই আসিফকে ওই সময় কম্বল মুড়িয়ে রাখেন আরিফ। এরপরও সামান্য দ্বগ্ধ হন আসিফ। আর আগুনের যন্ত্রণায় মেঝেতে কাতরাচ্ছিলেন ৭০ বছর বয়সি দাদি ছমুদা খাতুন।

আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানোর আগে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন দগ্ধ আরিফুল ইসলম আরিফ। তিনি বলেন, প্রতিবেশীরা ছুটে এসে বোন ইফতিকে শুশ্রুষা করলেও ছোট ভাই আসিফ ও আমি আগুনে পুড়তে থাকা দাদির শরীরে পানি ঢালতে থাকি। এরমধ্যে প্রতিবেশীরা আমাদের হাসপাতালে নিয়ে যান।

আরিফ আরও বলেন, ভাগ্যিস মা ও বাবা আগের দিন রাতে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ায় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পান। কিন্তু মা নাসিমা আকতার চোখের জলে বুক ভাসিয়ে বলছেন, আমি থাকলে এ দুর্ঘটনা হত না। আমার একমাত্র মেয়ে ইফতি ও শ্বাশুড়িকে হারাতে হত না। আমার ছেলেও বাচবে কি না আল্লাহই জানেন।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক অধ্যাপক এস খালেদ জানান, ছমুদা খাতুন ও ইফতি শরীর শতভাগ পুড়েছে। ফলে দ্বগ্ধ হওয়ার ২০ ঘন্টার মধ্যে (শুক্রবার দিবাগত রাত ২টার দিকে) মারা যান ছমুদা খাতুন ও ইফতি। এছাড়া আরিফের শরীরও প্রায় ২৫ ভাগ দ্বগ্ধ হয়েছে। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক। তাই উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আরিফ সাদার্ন ইউনিভার্সটি থেকে এমবিএ ডিগ্রি নিয়ে প্যাকেজিং ব্যবসায় নিয়োজিত বলে জানান তার বাবা আবদুল মোতালেব।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া থানার দেওয়ানবাজার এলাকার আরাবিয়া খাইরিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার মালিকানাধীন ৬ তলা ভবনে শুক্রবার ভোর ৫টায় বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এ সময় কয়েকটি বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনা যায়।

বিস্ফোরণে বাসার দেওয়াল উড়ে গেছে। ঘরের জিনিসপত্র পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। জানালার কাঁচ টুকরো টুকরো হয়ে ঝরে পড়েছে। পুড়ে গেছে ওই ঘরের যাবতীয় আসবাবপত্র। দেওয়াল ও কাচের টুকরোর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাশের আরও কয়েকটি ভবন।

আহত পাশের ভবনের চারতলার বাসিন্দা সৈয়দ মাহমুদুল হকও (৫০) বলেন, ঘুমের মধ্যে ছিলাম। বিকট আওয়াজে ঘুম ভাঙে। তড়িঘড়ি করে ঘুম থেকে উঠে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে আসি। এসময় দেখি, চারপাশে ধোঁয়াচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে।

আর এ বিস্ফোরণ নিয়ে স্থানীয় লোকজনের মনে নাশকতার আশঙ্কা উঁকি দিলেও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মোস্তান হুসাইন সাংবাদিকদের বলেছেন, ভবনে তল্লাশি চালিয়ে নাশকতার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। গ্যাস বিস্ফোরণের কারনে এ বিস্ফোরণ হতে পারে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত